দিনের খবর প্রথম পাতা

ব্রাইটন হাসপাতালকে পথে বসিয়েছে আইপিডিসি

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন

জয়নাল আবেদিন: সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজধানীর হাতিরপুলের ব্রাইটন হাসপাতালের উদ্যোক্তাকে হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসি। এ কাজে প্রতিষ্ঠানটিকে সহযোগী করেছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড। চুক্তি অনুযায়ী গ্রাহককে পূর্ণ ঋণের অর্থ বুঝিয়ে না দিয়েই তার কাছ থেকে জামানতের পুরো অর্থ জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছে। ফলে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছেন হাসপাতালটির উদ্যোক্তা ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছেন এ উদ্যোক্তা। এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে।

ভুক্তভোগী গ্রাহক দাবি করেন, ২০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার জামানত নিয়েছে আইপিডিসি ও শাহজালাল ব্যাংক। কিন্তু গ্রাহককে ঋণ দেয়া হয়েছে মাত্র ১৫ কোটি। এতে বিপাকে পড়েন তিনি। অর্থাভাবে ঠিকমতো হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারায় খেলাপিতে পরিণত হন এ উদ্যোক্তা। এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হন ব্রাইটন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দাখিল করা আবেদনে ইফতেখার আহমেদ উল্লেখ করেন, আইপিডিসি ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ব্রাইটন হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রাইভেট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিকে রুগ্ণ ও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে পরিদর্শনে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্রাইটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখার আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমার ব্যবসা বন্ধের জন্য এই ষড়যন্ত্র করেছে আইপিডিসি ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। আদালত ও মামলা সামাল দেয়াই এখন আমার মূল কাজ। সারাদিন অন্য কোনো কাজ করতে পারি না। পুলিশি হয়রানির আতঙ্কে থাকি সব সময়। যখন তখন বাসায় ঢুকে হয়রানি করে পুলিশ। ৬০ কোটি টাকার সম্পদের বিপরীতে আমি ঋণ পেয়েছি মাত্র ১৫ কোটি টাকা। জামানত দেয়ার কারণে সম্পদগুলো আমি কাজেও লাগাতে পারছি না। ব্যবসাটি আমি আবার চালু করতে চাই। এ জন্য অর্থের প্রয়োজন। পাঁচ কোটি টাকা পেলেও আমি আবার কাজটা ধীরে ধীরে শুরু করতে পারতাম। কিন্তু সিআইবি প্রতিবেদনে খেলাপি গ্রাহক হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় নতুন ঋণও পাচ্ছি না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আইপিডিসি ও শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক যৌথভাবে ২০ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার কথা ছিল। এর বিপরীতে ২০ কোটি টাকা জামানত স্থায়ীভাবে গ্রহণ করে। কিন্তু একাধিক কিস্তিতে এ ঋণ গ্রাহকের কাছে হস্তান্তরের আশ্বাস দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ঋণের সম্পূর্ণ অর্থ পায়নি ব্রাইটন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর ফলে হাসপাতালটি খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনার জন্য দুই কিস্তিতে মোট ৯ কোটি টাকা ছাড় করে আইপিডিসি। পরে আরও ৮ কোটি টাকার তহবিল ব্যবস্থাপনার জন্য ৮ থেকে ১০ মাস সময় চাওয়া হয় ব্রাইটনের কাছে। প্রায় এক বছর পর শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখা থেকে সেই তহবিল সরবরাহ করা হয়। ঋণ চুক্তির চেয়ে ৩ কোটি টাকা কম পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে চলতি মূলধনের সংকট দেখা দেয়। এতে ঠিকমতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয় হাসপাতালটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইপিডিসি ও শাহ্জালাল ব্যাংকের নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধ করতে পারেনি ব্রাইটন। আইপিডিসি সময়মতো ঋণ ছাড় না করা এবং ঋণের অর্থ ৩ কোটি টাকা কম দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করায় অর্থ আদায়ে ২০০৯ সালে ব্রাইটেনের বিরুদ্ধে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে মামলা করে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। আর সময়মতো ঋণ না দেয়ায় ৮৮ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্রাইটন কর্তৃপক্ষ। সুদসহ প্রতিষ্ঠানটির কাছে ২০০৯ সাল পর্যন্ত আইপিডিসির পাওনা দাঁড়িয়েছিল ১৯ কোটি ৯১ লাখ ১৭ হাজার ১১৮ টাকা। অন্যদিকে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের আকার এখন ১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা (অনারোপিত সুদ বাদে)। মামলাগুলো এখনও বিচারাধীন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও ভিজিলেন্স বিভাগের ওই বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়, শাহ্জালাল ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখার গ্রাহকের (ব্রাইটন হাসপাতাল) আবেদন ছাড়াই বেআইনিভাবে ঋণের আসল টাকা ও মুনাফার বিভাজন ব্যতীত ঋণ হিসাবটি কারওয়ান বাজার শাখায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

ন্যয়বিচার পেতে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে মামলা করে ব্রাইটন। বিষয়টি পর্যালোচনা শেষে সিএমএম কোর্টের বিচার বিভাগীয় তদন্তে উল্লেখ করা হয়, ‘আসামিগণ (আইপিডিসি ও শাহ্জালাল ব্যাংক) পরস্পর যোগসাজশে অভিযোগকারীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’

এ বিষয়ে আইপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমিনুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘তাকে (ব্রাইটন) আমরা অনেক সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানটিকে ৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিলাম। বর্তমানে এর পরিমাণ বেড়ে ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ঋণগুলো এখন অবলোপনকৃত অবস্থায় রয়েছে। আদায় প্রক্রিয়া এখনও চলমান।’ ইফতেখার আহমেদের সব ধরনের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন আইপিডিসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

বিষয়টি সম্পর্কে জানার জন্য শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহিদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..