ব্রেস্ট ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি

ডা. আরমান রেজা চৌধুরী: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ব্রেস্ট ক্যানসার বা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী হলেও অল্পসংখ্যক পুরুষও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, বাংলাদেশে ক্যানসার-আক্রান্তের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে, যার মধ্যে স্তন ক্যানসার অন্যতম। স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সেই অনিয়মিত ও অতিরিক্ত কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিণ্ডে পরিণত হয়, যা থেকে ক্যানসারের সূত্রপাত। স্তন ক্যানসার ও প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলুন জেনে নেয়া যাক স্তন ক্যানসারে রেডিওথেরাপি বা বিকিরণ থেরাপি  

রেডিওথেরাপি বা বিকিরণ থেরাপি হচ্ছে উচ্চশক্তির এক্স-রে, প্রোটন বা অন্যান্য কণা ব্যবহার করে ক্যানসার কোষগুলোকে হত্যা করা। ক্যানসার কোষের মতো দ্রুত বর্ধনশীল কোষগুলো সাধারণ কোষের তুলনায় বিকিরণ থেরাপির প্রভাবের জন্য বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকে।

স্তন ক্যানসারের জন্য বিকিরণ থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা

১. ইবিআরটি (এক্সটার্নাল বিম রেডিওথেরাপি) বা বাহ্যিক বিকিরণ: একটি যন্ত্র রোগীর শরীরের বাইরে থেকে স্তন পর্যন্ত বিকিরণ পৌঁছে দেয়। এটি স্তন ক্যানসারের জন্য ব্যবহƒত সবচেয়ে সাধারণ বিকিরণ থেরাপি।

২. ইনটার্নাল রেডিওথেরাপি বা অভ্যন্তরীণ বিকিরণ (ব্র্যাকিথেরাপি): ক্যানসার অপসারণের জন্য সার্জারির পর অস্থায়ীভাবে রোগীর স্তনের ক্যানসার আক্রান্ত স্থানে একটি রেডিয়েশন বিতরণকারী বস্তু স্থাপন করা হয়।

প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে। অস্ত্রোপচারের পরে স্তন ক্যানসারের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমাতে রেডিয়েশন থেরাপি একটি কার্যকর উপায়। উপরন্তু এটি সাধারণত শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের কারণে সৃষ্ট লক্ষণগুলো সহজতর করতেও ব্যবহƒত হয় (মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসার)।

লাম্পেকটমির পর বিকিরণ: যদি স্তন ক্যানসার অপসারণের জন্য অপারেশন করা হয় এবং স্তনের টিস্যু অবশিষ্ট থাকে, তাকে লাম্পেকটমি বা ব্রেস্ট কনসার্ভেশন সার্জারি বা স্তন-সংরক্ষণের অস্ত্রোপচার বলা হয়। সেটি করার পর ক্যানসারের কোষগুলো মেরে ফেলার জন্য বিকিরণ সম্ভব। লাম্পেকটমির পর বিকিরণ করলে আক্রান্ত স্তনে ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। রেডিয়েশন থেরাপির সঙ্গে যুক্ত লাম্পেকটমি প্রায়ই ব্রেস্ট কনসার্ভেশন সার্জারি বা স্তন সংরক্ষণ থেরাপি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ধরনের চিকিৎসা স্তনের সব টিস্যু অপসারণ বা মাস্টেকটমির মতোই কার্যকর।

মাস্টেকটমির পর বিকিরণ: মাস্টেকটমির পরও বিকিরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অপারেশনের পূর্ববর্তী ক্যানসারের অবস্থা ও মাস্টেকটমি-পরবর্তী বায়প্সি রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহব্যাপী বিকিরণ চিকিৎসা বা রেডিওথেরাপি দেয়া হলেও এখন তার পাশাপাশি তিন সপ্তাহের মধ্যে এমনকি এক সপ্তাহে রেডিওথেরাপি দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। যদি স্তন ক্যানসার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে তাকে মেটাস্টাসিস বলা হয়। সেক্ষেত্রে ক্যানসারকে সংকুচিত করতে এবং ব্যথার মতো উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রেডিয়েশন থেরাপি ব্যবহার করা যেতে পারে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: বিকিরণ থেরাপি থেকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো চিকিৎসার ধরন এবং কোন টিস্যুগুলো বিকিরণ পাচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে নানাভাবে প্রকাশ পেতে পারে। সাধারণত বিকিরণ চিকিৎসার তৃতীয় সপ্তাহ থেকে কিংবা শেষের দিকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয়। স্তন ক্যানসারে বিকিরণ চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো হলোÑহালকা থেকে মাঝারি ক্লান্তি, ত্বকের জ্বালা (চুলকানি, লালভাব, খোসা বা ফোস্কা ইত্যাদি),

স্তন ফুলে যাওয়া, বাহুর নিচে লিম্ফ নোডগুলোর চিকিৎসা করা হলে বাহু ফুলে যাওয়া (লিম্ফডেমা) প্রভৃতি। তবে অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যায় বা কমে যায় এবং উন্নত পদ্ধতিতে চিকিৎসা গ্রহণ করলে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শঙ্কা কমে যায়।

চিকিৎসা ও চিকিৎসক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট একজন চিকিৎসক যিনি রেডিয়েশন দিয়ে ক্যানসারের চিকিৎসায় পারদর্শী। রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট রোগীর জন্য উপযুক্ত থেরাপি নির্ধারণ করেন, চিকিৎসার অগ্রগতি অনুসরণ করেন এবং প্রয়োজনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করেন। এছাড়া রেডিয়েশন অনকোলজি মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও ডোসিমেট্রিস্ট রেডিয়েশনের ডোজ এবং ডেলিভারি-সংক্রান্ত কাজ করেন। রেডিয়েশন টেকনোলজিস্ট বিকিরণ চিকিৎসার মেশিনের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা পরিচালনা করেন। একজন রেডিয়েশন অনকোলজি নার্স বা চিকিৎসক সহকারী চিকিৎসা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন এবং চিকিৎসার সময় স্বাস্থ্য পরিচালনা করতে সহায়তা করেন। কাজেই এটি একটি ‘টিম ওয়ার্ক’ এবং সবার অংশগ্রহণেই বিকিরণ চিকিৎসা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

আমাদের দেশে এখন অনেক হাসপাতালেই যেকোনো ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু করার আগে টিউমার বোর্ড আয়োজন করা হয়। ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে টিউমার বোর্ড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ এখানে একজন সার্জন, একজন রেডিওথেরাপিস্ট, একজন মেডিকেল অনকোলজিস্ট বা কেমোথেরাপিস্ট, হিস্টোপ্যাথলজিস্ট বা বায়োপ্সি রিপোর্টকারী, রেডিওলজিস্ট বা সিটি স্ক্যান (এমআরআই) রিপোর্টকারীসহ আরও অন্য সদস্যরা উপস্থিত থাকেন। রোগীর মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই এসবের মূল উদ্দেশ্য। টিউমার বোর্ডের চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় কখনও কখনও নিও-এডজুভেন্ট থেরাপি বা অপারেশনের আগে থেরাপির মাধ্যমে টিউমারকে ছোট করার পর অপারেশন করা হতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে শুরুতেই অপারেশন করে ফেলা হয়। অনেক সময় হরমোনথেরাপির মাধ্যমেও চিকিৎসা শুরু করা হয়। তবে হরমোনথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা শুরুর আগে অবশ্যই বায়োপ্সির পাশাপাশি ইমিউনো হিস্টোকেমিস্ট্রি করে হরমোন রিসেপ্টরের অবস্থা জেনে নিতে হয়। এভাবে রোগীর অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোনথেরাপি এবং কখনও কখনও ইমিউনোথেরাপির মাধ্যমে ক্যানসারের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির ফলস্বরূপ আমাদের দেশেই এখন স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সব ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রয়োজন শুধু সঠিক চিকিৎসক ও মানসম্মত হাসপাতাল বাছাই করা।

কনসালট্যান্ট, রেডিয়েশন অনকোলজি

এভারকেয়ার হসপিটাল, ঢাকা

বিষয় ➧

সর্বশেষ..