আজকের পত্রিকা দিনের খবর প্রথম পাতা সর্বশেষ সংবাদ

ভয়াবহ কনটেইনার জটে পড়তে যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর!

করোনা ভাইরাসের প্রভাব

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: নভেল করোনাভাইরাস রোগের বিস্তার ঠেকাতে বন্ধ রাখা হয় সকল ধরণের বাণিজ্যিক ও শিল্পের গতিশীলতা। কিন্তু দেশের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে চালু ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন। এ সময়ে বন্দরের জেটিতে পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা স্বাভাবিক থাকলেও বন্দর ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার ডেলিভারি অস্বাভাবিকভাবে কমছে। এই কয়েকদিনে ইয়ার্ডে ধারণ ক্ষমতার কাছাকাছি কনটেইনার জমেছে। এভাবে চললে আগামীকাল বন্দরের ধারণক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে। এদিকে আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে সাধারণ ছুটির মেয়াদ। এতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বন্দরের পরিচালন কার্যক্রম। ফলে শিল্প ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরির শঙ্কা বন্দর ব্যবহারকারীদের।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনা ভাইরাসের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করছে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বাড়ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে জীবনমান ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে পণ্য ও কাচাঁমালের সরবরাহ ব্যবস্থা। বন্ধ হচ্ছে কারখানার উৎপাদন ও বিপণন। মার্চ মাসের শুরুতে বাংলাদেশে এ ভাইরাসের প্রার্দুভাব দেখা দেয়। আর এ রোগের বিস্তার ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে আগামী ৪ এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতাল, কাচাঁবাজার ও ওষুধের ছাড়া সকল ধরনের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ষোষণা করে সরকার। তবে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর ২৪ ঘন্টা চালু রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

কারণ এ বন্দর দিয়ে আমদানি ও রপ্তানির ৯২ শতাংশ বাণিজ্যিক কার্যক্রম হয়ে থাকে। এ সময়ে বন্দরের জেটিতে পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য উঠানামা স্বাভাবিক ছিল। তবে বন্দর ব্যবহারকারীরা প্রয়োজনীয় জনবল ও চাহিদা না থাকার কারণে বন্দর ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার ডেলিভারি গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। গত ছয়দিনে কনটেইনার ইর্য়াডে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কনটেইনার জমেছে। এ সময়ে বন্দর থেকে পণ্য সরবরাহ কমে গেছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২৩ মার্চ বন্দরের বিভিন্ন জেটি, বিশেষ বার্থ ও আউটার এনকারেজে ৬১টি জাহাজ থেকে কার্গো ও কনটেইনার খালাস করা হয়েছিল। আর ১৮টি জাহাজ থেকে কার্গো ও কনটেইনার খালাস হয়নি। একইদিনে বন্দর ইয়ার্ডে মোট কনটেইনার ছিল ৩৩ হাজার ১২০ টিইইউএস। আর আমদানি ও রপ্তানিবাহী জাহাজে মোট কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়েছিল ছয় হাজার ৪৩৮ টিইইউএস। একই সময়ে বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছিল দুই হাজার ৭৬৫ টিইইউএস।

অপরদিকে, ১লা এপ্রিল বুধবার দুপুর সাড়ে বারোটা পর্যন্ত বন্দরের বিভিন্ন জেটি, বিশেষ বার্থ ও আউটার এনকারেজে ৭১টি জাহাজ থেকে কার্গো ও কনটেইনার খালাস করা হয়েছিল। আর ২৬টি জাহাজ থেকে কার্গো ও কনটেইনার খালাস হয়নি। একইদিন বন্দর ইয়ার্ডে মোট কনটেইনার ছিল ৪৪ হাজার ৯২৬ টিইইউএস। আর আমদানি ও রপ্তানিবাহী জাহাজে মোট কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়েছিল ছয় হাজার ৩০৮ টিইইউএস। একই সময়ে বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়েছিল এক হাজার ৯০৫ একক কনটেইনার। অর্থাৎ চার হাজার ৪০৩টি কনটেইনার ইয়ার্ডে জমা থাকছে।

একইভাবে বন্ধ শুরুর আগের দিন অর্থাৎ ২৫ মার্চ ৪ হাজার ৯১১ একক কনটেইনার বন্দর থেকে ডেলিভারি হয়েছিল। ২৭ মার্চ ডেলিভারি হয়েছিল ১৪শ ২৩ একক, ২৮ মার্চ ৯০৬ একক, ২৯ মার্চ এক হাজার ২৮৬ একক, ৩০ মার্চ ডেলিভারি হয়েছে এক হাজার ৩৯৩ একক এবং ৩১ মার্চ এ হাজার ৭০৭ একক কনটেইনার। এছাড়া বেসরকারি ডিপোগুলোতে ১লা এপ্রিল বিকাল পর্যন্ত পণ্যবাহী কনটেইনার ছিল ৬১ হাজার ৫০০ টিইইউএস কনটেইনার এবং খালী কনটেইনার ছিল ৪২ হাজার ৮০০টিইইউএস।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, করোনাভাইরাস ঠেকাতে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি চলছে। ছুটির শুরু থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম সীমিত করেছে দেশের সব কাস্টম হাউজ, বাণিজ্যিক ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, সিএনএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্টরা। আর নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ ছিল দেশের ৯০ শতাংশেরও বেশি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। মহাসড়কে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলে কোনো বাধা নেই। ভোগ্যপণ্যের বড় আড়ৎগুলো খোলা রয়েছে।

অপরদিকে, সাধারণ ছুটির পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের কাজ পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল আর পণ্য ডেলিভারিতে চট্টগ্রাম বন্দর সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ সময়ে কেবল রপ্তানি ও ইপিজেডের কার্যক্রম সচল রাখা, আমদানির ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জরুরি চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবাসামগ্রীর শুল্কায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল কাস্টম হাউজগুলো। ফলে জমতে থাকে কনটেইনার। তবে বন্দরের ডেলিভারি কার্যক্রম পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ৩০ মার্চ নতুন একটি অফিস আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সেখানে শিল্পের কাঁচামাল এবং সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমদানি পণ্যের শুল্কায়নে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে কাস্টম হাউজগুলোকে।

শিপিং এজেন্ট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ ছুটির মধ্যেও দিনে দুই ঘণ্টা অফিস খোলা রেখে কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদেশি শিপিং লাইনগুলোর দেশিয় এজেন্টরা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দুই ঘণ্টা খোলা রেখে যে ব্যাংকিং করছে তাতে এত পণ্য ডেলিভারি অর্ডার কাজ করা যাচ্ছে না। আর কাস্টমসও নির্ধারিত কিছু পণ্য শুল্কায়নের জন্য কাজ করছে। এই নিয়মের কারণে বন্দর থেকে পণ্য ছাড়করণ অনেক কমেছে। আগ্রহ কমেছে। অবশ্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সীমিত পরিসরে সব পণ্য শুল্কায়নের জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু সেটি কার্যকর হলেও তো কাস্টমসের লোকবল সংকটের পাশাপাশি সেবাগ্রহীতার আগ্রহ কম। যেহেতু সবকিছু বন্ধ আছে।

এ বিষয়ে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রি ও বন্দর ব্যবহারকারী ফোরামের সভাপতি মাহবুবুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, কাস্টমস ক্লিয়ারিং চালু থাকলেও আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্য, বিভিন্ন ফল-মূল ইত্যাদি বন্দর থেকে ছাড় করতে হলে এসব পণ্যের মধ্যে কোন প্রকার জীবানু আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য কোয়ারেন্টাইন এবং রেডিয়েশন পরীক্ষা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব পরীক্ষা চালু না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য আটকে আছে। এসব পণ্য ছাড় করণের লক্ষ্যে কোয়ারেন্টাইন ও রেডিয়েশন পরীক্ষা করার জন্য অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি।

তিনি বলেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তার লক্ষ্যে উল্লেখিত পরীক্ষা সম্পন্ন করে বন্দর থেকে ছাড়করণে সহায়তা করা প্রয়োজন। আর বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক আমদানিকারক তাদের আমদানিকৃত পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করতে পারছেন না। বিভিন্ন গ্রাহকের কাছ থেকে পাওনা অর্থ আদায় করা সম্ভব হচ্ছে না। সারাদেশে পণ্য পরিবহন অনেকাংশে বন্ধ থাকায় পণ্য সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এসব বিষয় বিবেচনাপূর্বক আমদানিকারকদের জন্য বর্ণিত সময়ে সমুদয় পোর্ট চার্জ, অফডক ও শিপিং এজেন্ট এর ওয়্যার ফেয়ার চার্জ মওকুফ করার জন্য বিশেষভাবে আবেদন জানাচ্ছি। পাশাপাশি বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের দায়ভার কিছুটা লাঘবে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত আমদানি পর্যায়ে সব ধরণের ভ্যাট অব্যাহতি প্রদানের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ও মুখপাত্র ওমর ফারুক শেয়ার বিজকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ, কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডেলিং স্বাভাবিক রয়েছে। তবে করোনার প্রভাবের কারণে বন্দর ব্যবহারকারীরা বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি নিচ্ছেন না। ফলে গত কয়েকদিনে কনটেইনার জমে বন্দরের ধারণাক্ষমতার কাছাকাছি হয়ে যাচ্ছে। এর জন্য আমরা কনটেইনার রাখার জন্য বিকল্প জায়গা খুজঁছি। ওভার ফ্লো ইয়ার্ডে দেড়-দুই হাজার ও অফডকগুলো তাদের ডিপোতে তিন হাজারের কনটেইনার নিয়ে গেলে কিছুটা রক্ষা হবে। এ ব্যাপারে আমরা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের প্রতিনিয়ত তাদের কনটেইনার নিয়ে যাওয়ার জন্য বলছি। কিন্তু তাদের অংশগ্রহণ খুবই কম।

উল্লেখ, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চলতি বছরের কনটেইনার ও পণ্যবাহী জাহাজ আসে ৩৫৭টি, ফেব্রুয়ারিতে আসে ৩৬৪টি। যা একই সময়ে গতবছরের জানুয়ারে জাহাজ এসেছিল ছিল ৩১৫ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২৯০টি। এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমদানি ও রপ্তানিবাহী মোট কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়েছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯৭৯ টিইইউস, ফেব্রুয়ারি ২ লাখ ৪১ হাজার ৯৪০ টিইইউস। আর ২৪ মার্চ পর্যন্ত ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৪৭ টিইইউস। যা গতবছরের জানুয়ারিতে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়েছিল ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪ টিইইউস, ফেব্রুয়ারি ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ টিইইউস এবং মার্চ মাসে ২ লাখ ৩৯ হাজার ১১৮ টিইইউস।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..