সারা বাংলা

ভরা মৌসুমেও ব্যবসা নেই লক্ষ্মীপুরে মেঘনার ইলিশঘাটে

জুনায়েদ আহম্মেদ, লক্ষ্মীপুর: ইলিশের ভরা মৌসুমেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনার ইলিশঘাটগুলোতে নেই প্রাণচাঞ্চল্য। ইলিশসহ অন্য মাছের তীব্র সংকটের কারণে এ পেশার সঙ্গে জড়িত মেঘনা উপকূলের অর্ধলক্ষাধিক জেলে, মহাজন, আড়তদার ও ব্যবসায়ী চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।
মেঘনা নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ না পাওয়ায় লক্ষ্মীপুরের ৩০টি মাছঘাট, ২৬টি বরফকল ও ১৫১টি মাছবাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমেছে। মাছঘাটগুলোতে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার ইলিশসহ নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কেনাবেচা হয়। কিন্তু মাছ সংকটের কারণে আষাঢ় মাসের শুরু থেকেই এসব ঘাটে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এ পেশার সঙ্গে জড়িতরা। নদীতে জাল ফেলে ইলিশ ধরা না পড়ায় এনজিওর ঋণের টাকা আর মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধের ভাবনায় জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে হতাশা। জেলে ও আড়তদাররা পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন।
লক্ষ্মীপুরের সবচেয়ে বড় মাছঘাট হচ্ছে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট মাছঘাট। এখানে ৪১টি বাক্সে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয়ে থাকে। কিন্তু চলতি বছর নদীভাঙন ও মাছ আহরণে টানা আট সপ্তাহ ও তিন সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নদীতে জেলেদের জালে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এ ঘাটে ব্যবসা কমেছে। এ ঘাটে দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এসে ভিড় করলেও কাক্সিক্ষত মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন।
সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট মাছঘাটে কথা হয় জেলে সায়েমের স্ত্রী কহিনুর বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, অভাবের তাড়নায় তিনি তার আট বছর বয়সের ছেলেকে নিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খেয়া নৌকায় করে মাছ ধরতে নদীতে নেমেছেন। তার স্বামী দাদন থেকে টাকা নেওয়ায় তা পরিশোধ করতে না পারায় বাধ্য হয়ে তারাও নদীতে নেমেছেন। কিন্তু সারা দিনে তারা সোয়া কেজি পোয়া মাছ ও আধা কেজি চিংড়ি মাছ পেয়েছেন। সারা দিনে যে পরিমাণ মাছ তিনি পেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি তার খরচ হয়েছে।
সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট মাছঘাটের কয়েকজন জেলে জানান, এ সময় ঘাটগুলোতে ইলিশের ছড়াছড়ি থাকার কথা থাকলেও এ বছর তা দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবছর এ সময়ে জেলেরা মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকলেও এবার তার চিত্র উল্টো। মেঘনায় জেলেদের জালে শুধু ইলিশই নয়, অন্য মাছও আশানুরূপ ধরা না পড়ায় তাদের মাঝে দেখা দিয়েছে হতাশা। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন তারা। সারা দিন নদীতে জাল ফেলে খরচের টাকাও উঠছে না। অনেকেই এনজিও, সমিতি, দাদন ও আড়তদারদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ইলিশ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করার কথা ভাবলেও ইলিশ না পাওয়ায় দেনা পরিশোধ করতে পারছেন না।
কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, কটরিয়া, লুধুয়াসহ বিভিন্ন মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে নৌকা নোঙর করে জেলেরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। দু-একটি নৌকা মাছঘাটে ভিড়লেও নেই হাঁকডাক। ঘাটগুলোতে ইলিশ কেনাবেচা না থাকায় আড়তে অলস সময় পার করছেন আড়তদাররাও। কেউ পুরোনো জাল ও নৌকা মেরামত করছেন, কেউবা নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে মাছঘাটে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
এদিকে মতিরহাট মাছঘাটের একাধিক আড়তদার জানান, ইলিশের ওপর নির্ভর করে জেলেদের মধ্যে লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন মেঘনার ইলিশ মাছ বিক্রি করে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের মুনাফা অর্জন করবেন এ আশায়। এখন মুনাফা দূরে থাক, মূলধন নিয়েই চিন্তিত তারা।
লক্ষ্মীপুরের কয়েকজন মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, মেঘনা নদীর নাব্য সংকটের কারণে কমলনগর উপজেলার লুধুয়া ঘাট, মতিরহাট, সাহেবের হাট, রামগতির বড় খেরী, সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট, রায়পুরের হাজিমারাসহ বিভিন্ন মাছঘাটগুলোতে প্রতিদিন কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হলেও এখন এসব ঘাট প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়ে পড়ে রয়েছে। এতে জেলেদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন মৎস্য ব্যবসায়ী, আড়তদার ও দাদন ব্যবসায়ীরা।
মজুচৌধুরীর হাট মাছঘাটের বরফ ব্যবসায়ীরা জানান, জেলেদের জালে মাছ ধরা না পড়ায় বরফ বিক্রি হচ্ছে না। বরফ উৎপাদনের জন্য ইঞ্জিন সবসময় চালু রাখতে হয়। ফলে বরফ বিক্রি না থাকলেও বিদ্যুৎ বিল এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম মহিব উল্লাহ জানান, প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নদীতে পানির প্রবাহ কম হওয়ায় ইলিশ কম আসছে। এখন পর্যন্ত সাগরের পর্যাপ্ত ঢল নদীতে আসেনি বলে ইলিশ আসতে দেরি হচ্ছে, তাই জেলেরা মাছ পাচ্ছেন না।
জেলা মৎস্য অধিদফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রতি বছর মার্চ-এপ্রিল মাসে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে ছোট ইলিশ যাতে বড় হতে পারে। আর অক্টোবর মাসে ২২ দিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখার কারণ হচ্ছে প্রজননক্ষম ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে এসে যাতে ডিম ছেড়ে নিরাপদে সমুদ্রে ফিরে যেতে পারে। আর এ নিষিদ্ধ সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হয়। জেলায় মোট মৎস্যজীবীর সংখ্যা ৫০ হাজার ২৫২ জন ও মৎস্যচাষির সংখ্যা ৫৪ হাজার ১২৫ জন। তবে নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪৭ হাজার ৭৭১ জন। আর আইডিকার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৪২ হাজার ৩৩৭ জন। জেলায় ৩৭ হাজার ৮৬৫ টন মাছের চাহিদার বিপরীতে মাছের উৎপাদন হয় ৬১ হাজার ৪১৫ দশমিক ৬০ টন। এর মধ্যে শুধু ইলিশ উৎপাদন হয় ২০ হাজার ৫৮০ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে সাতশ কোটি টাকা।

সর্বশেষ..