প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ভারতের অর্থনৈতিক মুক্তিপর্বে রণদা  

অনাথ শিশুর মতো যার জীবনখানি নিস্তরঙ্গে নিথর হতে পারতো নিযুত জীবনের নিঠুর নিয়তিপাশে তিনি জুগিয়েছেন হৃৎস্পন্দনের খোরাক। দেশের জন্য লড়েছেন। শূন্য জমিনে গড়েছেন ব্যবসায় কাঠামো। জীবনের সব অর্জন লিখে দিয়েছেন মানুষের নামে। তিনিই দেশের সবচেয়ে সফল ট্রাস্টি প্রতিষ্ঠান ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’-এর জনক রণদা প্রসাদ সাহা। নারীশিক্ষা ও চিকিৎসায় নারী-পুরুষ কিংবা ধনী-গরিবের ভেদ ভেঙেছেন। তার জীবনেই রয়েছে সসীমকে ডিঙিয়ে অসীমে শক্তি সঞ্চারের কথামালা। এ জীবন ও কেতন যেন রোমাঞ্চিত হৃদয়েরই উদ্দীপ্ত প্রেরণা। পর্ব-৩৬

মিজানুর রহমান শেলী: ১৯৩২ সালের পর থেকেই মূলত ভারত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পথে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। আর এ সময়ে অর্থাৎ ১৯৩২-৩৩ সালেই রণদা ব্যবসায় জীবনে পা দিয়েছেন। এ সময় জাতীয় সরকারের রাজনৈতিক আক্রমণে ল্যাঙ্কাশায়ার বেশ হিমশিম খেয়ে যায়। মোদ্দাকথা হলো, ১৯৪৭-এর আগেই ভারত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন শুরু করে। আর তাই ল্যাঙ্কাশায়ারের ব্যবসা বাঁচেনি।

এমনকি এ সময় ভারত তুলা, কাগজ ও চিনির ওপর বেশি বেশি সংরক্ষণমূলক শুল্কের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তাতে ভারতীয় শিল্পবিকাশের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। এমনকি ১৯৩৫ সালের আইনের আর্থিক বিধান মোতাবেক বলা চলে, ভারতীয় আইনসভার হাতে ব্রিটিশ সরকার নিয়ন্ত্রণ দেয়নি, কিন্তু ক্ষমতা মোটামুটি তুলে দিয়েছিল। তবে সহজ সমীকরণে সেকালে চিত্রাদি অঙ্কিত হয়নি। এর পেছনে ছিল আরও জটিলতা। কার্যত, সংরক্ষণমূলক প্রশুল্ককে প্রায়ই ব্রিটিশদের সাম্রাজ্যিক সুবিধার খাতিরে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবুও ব্রিটিশ পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক কাঠামোর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের অবস্থায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। দেশীয় বাণিজ্য এগিয়ে যায়। তার আরেকটি ভালো উদাহরণ হলো, ১৯৩৫-৩৬ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টেলিযোগাযোগ, রেডিও সরঞ্জাম আর চিনি তৈরির যন্ত্রপাতি ইত্যাদি অপ্রথাগত পণ্যে ভারত এগিয়ে যেতে থাকে। এমনকি তা ব্রিটিশের সুতি কাপড়ের রফতানি মূল্যের উচ্চতা ছুঁতে সক্ষম হয়। ভারতের বাণিজ্য কাঠামোতে এই যখন উন্নয়ন শুরু হলো, তখনি ব্রিটিশরা আবার নতুন সাম্রাজ্যবাদী কৌশল নিতে থাকে। প্রথমত তারা বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির অধীনে নানা উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। যেমন ১৯৩৩ সালে লিভার ব্রাদার্স ও মেটাল বক্স এবং ১৯৩৬-৩৭ সালে ডানলপ ও ইম্প্রেয়াল কেমিক্যালসের উৎপাদন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। দ্বিতীয়ত, তারা বিদেশ-নিয়ন্ত্রিত ‘ইন্ডিয়া লিমিটেড’ বা ভারত সীমাবদ্ধ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এই বিদেশি কোম্পানির উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিদেশ নিয়ন্ত্রিত ইন্ডিয়া লিমিটেড কোম্পানিগুলো ভারতের প্রশুল্ক সুবিধা ভোগ করতে থাকে। অর্থাৎ ভারতের নিজস্ব শিল্পায়নের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদীদের পদচারণা রয়েই গেল। সাংবিধানিক উপায়ে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিলেও ভারতীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সহযোগী হওয়ার আড়ালে ভারতের ব্যবসায় কাঠামোতে নিয়ন্ত্রণ যেন আঁকড়ে ধরেই থাকল। বাণিজ্যে প্রভুত্ব না থাকলেও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে তারা সাহেবগিরি চালিয়েই গেল। এ সময় তারা রিজার্ভ ব্যাংককে আইনসভার আওতামুক্ত রাখে। আসলে ১৯৩৫ সালের আইনে বড়লাটের হাতেই ছিল আর্থিক সংরক্ষণ ও রক্ষাকবচের হাতিয়ারগুলো। বাসুদেব চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা মোতাবেক, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় অদৃশ্য অর্থ পাঠানো হয়েছে। ১৯২২ সালে মোট ব্রিটিশ অদৃশ্য উপার্জনের ১৬.৩১%, ১৯৩১-এ ১৪.৭৭% ও ১৯৩৬-এ ১৫.৭৫% যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে। এই অর্থসমূহ হোম ব্যয়, ব্যক্তি মালিকানাধীন পুঁজি বিনিয়োগের ওপর লভ্যাংশ, বিমা ও ব্যাংক জমা, মাল ভাড়ার খরচ, স্বত্ব দেয় খাত থেকে আহরিত। এগুলোকে স্থ‚লভাবে জাতীয়তাবাদীরা ‘সম্পদ নির্গম’ বলতেন।

এই অর্থনৈতিক মন্দা ভারতের প্রান্তিক গোষ্ঠীর পক্ষে খুব বেশি লাভজনক ছিল না। তবে ভারতীয় বুর্জোয়াদের দিক থেকে বিশেষভাবে বিচার করা যায়। মূলত অর্থনৈতিক মন্দা বেশ কিছু সংকট সৃষ্টি করেছিল। তবুও অন্তত পুরনো ধাঁচের ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক বন্ধন তখন ঢিলা হয়ে যায়। ফলে ভারতীয় পুঁজিপতিদের একটি বড় মাপের আর্থিক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি হয়। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো থান কাপড়ের উৎপাদন বেড়ে যাওয়া।

১৯২৯-৩০ সালে ভারতীয় কলে ২৩ হাজার ৫৬৫ লাখ গজ থান কাপড় উৎপাদন হয়েছিল। তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯৩২-৩৩ সালে ২৯ হাজার ৮২৭ লাখ গজ ও ১৯৩৮-৩৯ সালে ৩৯ হাজার ৫৩ লাখ গজ। উৎপাদনের বেড়ে যাওয়ায় ল্যাঙ্কাশায়ারের আমদানি পেছনে পড়ে যায়। এ সময় ভারত তথা বোম্বাই জাপানের উৎপাদনকে সমীহ করে চলত। তবুও ১৯৩০-এর দশকে চিনি, সিমেন্ট ও কাগজশিল্পে ভারতের উৎপাদন বাড়ছিল দ্রæত। ১৯৩৪ সালের পর সংরক্ষণ ছাড়াই দাঁড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে টাটা স্টিল। ভারতীয় পুঁজিবাদী অগ্রগতি তখন আর বোম্বাই-আহমেদাবাদ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। কারণ ১৯৩০-এর দশকে কলকাতা যুক্ত প্রদেশ, দক্ষিণ ভারত এবং বরোদা, মাইশোর ও ভুপালের মতো কয়েকটি দেশীয় রাজ্যে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, মাদ্রাজ প্রদেশে সুতাকলের সংখ্যা ছিল ১৯৩২ সালে ২৬ আর ১৯৩৭ সালে ৪৭।

অর্থাৎ ভারতীয় শিল্প-বাণিজ্যের বিকাশে দুটি প্রধান কারণ ছিল, ল্যাঙ্কাশায়ার সংকট এবং সরকারি প্রশুল্কের মাধ্যমে প্রাপ্ত বাজার সংরক্ষণ। কিন্তু এ দুইয়ের বাইরে আরও দুটি বিষয় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এক. শিল্পজাত পণ্যের চেয়ে কৃষিজ পণ্যের দাম অনেক বেশি কমে যাওয়া। দুই. বাণিজ্যিক ও গ্রামীণ মন্দার পরিণামে সম্ভবত বাণিজ্য, সুদি কারবার ও জমি কেনার থেকে পুঁজি চলে গিয়েছিল শিল্পে। তবে শিল্পের এই বিকাশ পর্বে বাণিজ্য কিংবা কৃষি থেমে থাকেনি।

ভারতীয় পুঁজিবাদী গোষ্ঠী তখন ক্রমেই রাজনৈতিক শক্তিকে প্রভাবিত করে আসছিল। তবে তার রূপটি ছিল অগোছালো। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন রূপে সংঘবদ্ধ। তাই সঠিক করে সাধারণ কথায় এই পরিস্থিতিকে সংজ্ঞায়িত করা চলে না। তবে খুব সাদামাটা ভাষায় বলা চলে ১৯৩০-এর দশকের বিভিন্ন বুর্জোয়া গোষ্ঠীর জাতি রাজনীতিতে সর্বাত্মক প্রভাব বিস্তার করে চলেছিল। ফলে অসহযোগ, সাংবিধানিক আলোচনা ও মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে এই পুঁজিপতিদের ভ‚মিকা মুখ্য হয়ে উঠত। ডারউইন, হোর বা বোম্বাইয়ের লাট সাইকসের মতো ব্রিটিশ বড় কর্তাদের ব্যক্তিগত কাগজপত্রে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে এমন মনোভাবই প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া ভারতীয় ব্যবসায়ী পুরুষোত্তম দাস, ঠাকুরত দাস, এইচপি মোদি, ওয়ালচন্দ হীরাচন্দ ও ফিরোজ শেঠনা, ব্রিটিশ ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড বেন্টহালদের কাগজপত্রেও একই চিত্র ফুটে ওঠে।

কার্যত, ঔপনিবেশিক আধিপত্য তখন দুর্বল; তবুও তারা প্রতাপশালী। আবার চলছিল বিশ্বব্যাপী মন্দা। ফলে পুঁজিপতিরাও প্রান্তিকদের ঘারে চেপে চলার সুযোগ পেয়েছিল। ১৯২৮-২৯ এবং ১৯৩৪-এ ‘নিয়োগ সংকোচনে’র উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাছাড়া মজুরি কমানো ও সাময়িক ছাঁটাই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে থাকে। ফলে কাজের শোচনীয় পরিবেশ আরও খারাপ হয়ে ওঠে। শ্রমিক বিক্ষোভ তুঙ্গে পৌঁছে। ১৯২৮-২৯ সালে ২০৩টি ধর্মঘট ও লকআউট হয়। এতে জড়িত ছিলেন ৫০ লাখ ছয় হাজার ৮৫১ জন শ্রমিক। ১৯২৮ সালে ৩ কোটি ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ৪০৪টি শ্রম দিবস নষ্ট হয়। ফলে ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩-এর মিরাট মামলা অত্যাচার ও ভাঙনের মুখোমুখি করে তোলে ভারতবাসীদের। ১৯৩০-এর মাঝামাঝি আবার জেগে ওঠে আন্দোলন। ১৯৩৭ সালে ৩৭৯টি ধর্মঘট ও লকআউট হলো। জড়িত ছিলেন ছয় লাখ ৪৭ হাজার ৮০১ জন। ১৯১৯-২২ পর্বের মতোই এ সময় শ্রমিকদের মধ্যে জঙ্গিভাব ও জাতীয়তাবাদী চেতনা কাজ করতে থাকে। তার প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশের পরবর্তী ইতিহাসে প্রকাশ পেয়েছে।

ব্রিটেনও পুঁজিবাদী অর্থনীতির মধ্যে যে যোগসাজশ হলো, তাতে শিল্পের খানিক বিকাশ দেখা গেল। অথচ কৃষি খাতে ধস নামল। অর্থাৎ সার্বিক ভারসাম্য হলো না। শিবসুব্রহ্মণিয়ানের গণনা থেকে জানা যায়, ১৯৩০-এর দশকে মাথাপিছু জাতীয় আয় হ্রাসের লক্ষণ দেখা যায়। তাছাড়া জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯০১ থেকে ১৯২১-এর মধ্যে জনসংখ্যা দুই হাজার ৮৪০ থেকে বেড়ে তিন হাজার ৬০ লাখ হয়। ১৯৩১ ও ১৯৪১ সালে জনসংখ্যা হলো তিন  হাজার ৩৮০ লাখ ও তিন হাজার ৮৯০ লাখ। অর্থাৎ এক লাফে প্রায় ৮০০ লাখ বাড়ল। আয় হ্রাস ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ১৯২০-এর দশক থেকে বিভিন্ন সমস্যা তীব্র হতে থাকে। ফলে ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ পর্বে বাংলা তথা ভারতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে রইল অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ও গণদারিদ্র্য।

গণদারিদ্র্য আর অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই রণদা প্রসাদ সাহা শুরু করলেন ব্যবসা। তিনি আদতে তখন একজন প্রান্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। খানিকটা ফেরি বা ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ীও বলা চলে। তবে রণদা প্রসাদ সাহার বিশেষত্ব হলো, তিনি একজন প্রান্তিক মানুষ হয়েও নিজের শ্রম, অধ্যবসায়, অবিচলতা আর বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ব্যবসায় কাঠামো দাঁড় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। শূন্য থেকেই তিনি শেখরে পৌঁছেছিলেন। এমন উদাহরণ খুব বেশি চাহর হয় না। তবে এ ধরনের প্রান্তিক মানুষের ব্যবসায় উদ্যোগে সফল হতে ধারাবাহিক কিছু পথপরিক্রমা পাড়ি দিতেই হবে। বিশেষত, ব্যবসায় জীবনে পুঁজি গঠনের বিকল্প নেই।

 

গবেষক, শেয়ার বিজ

mshelleyjuÑgmail.com