ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে রেকর্ড ২৩.২৯%

বসে থাকছে নিজস্ব কেন্দ্র

ইসমাইল আলী: ভারত থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর প্রথম বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। এরপর প্রায় প্রতি বছরই বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে। যদিও করোনায় চাহিদা কমায় ২০১৯-২০ অর্থবছর আমদানি কিছুটা কমেছিল। তবে গত অর্থবছর তা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তবে আমদানি বাড়লেও দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে গুনতে হচ্ছে ক্যাপাসিটি চার্জ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় ৬৫৯ কোটি ৩২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এ জন্য ব্যয় হয় চার হাজার সাত কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এতে ইউনিটপ্রতি আমদানি ব্যয় পড়ে ছয় টাকা আট পয়সা। আর ২০২০-২১ অর্থবছর বিদ্যুৎ আমদানি করা হয় ৮১২ কোটি ৮৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এ জন্য ব্যয় হয় চার হাজার ৭১২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এতে ইউনিটপ্রতি আমদানি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ৮০ পয়সা।

ইউনিটপ্রতি দাম কিছুটা কম পড়লেও গত অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৫৩ কোটি ৫৭ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বা ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছর দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সক্ষমতার মাত্র ৩৬ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। আর এসব কেন্দ্রের জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ১৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। অর্থাৎ নিজস্ব কেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ গুনলেও আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে মেরিট অর্ডার ডেসপাচ অনুসরণ করা হয়। এক্ষেত্রে কম ব্যয়ের কেন্দ্রগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাধান্য দেয়া হয়। তবে গত অর্থবছর গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসচালিত বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রাখা হয় বা ডিজেলে উৎপাদন করা হয়। তাই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। এক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ কমাতে বিকল্প উৎস হিসেবে আমদানি বৃদ্ধি করা হয়েছে। কারণ ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলে উৎপাদনের চেয়ে বিদ্যুৎ আমদানিতে গড় খরচ কম হয়।

সূত্রমতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছিল ৬৭৮ কোটি ৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এজন্য ব্যয় হয় তিন হাজার ৭০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। এতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ৪৬ পয়সা। আর তার আগের (২০১৭-১৮) অর্থবছর আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৭৮ কোটি ৭৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় দুই হাজার ৮১২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ওই অর্থবছর বিদ্যুৎ আমদানিতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৮৭ পয়সা।

২০১৬-১৭ অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৬৯ কোটি ৪০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এজন্য ব্যয় হয় দুই হাজার ৫৯২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। ফলে ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ৫২ পয়সা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছর বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৮২ কোটি ২৪ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় এক হাজার ৯৬৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ফলে ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ৮৭ পয়সা।

এদিকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ ছিল ২২৬ কোটি ৫০ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় এক হাজার ১৪৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ওই অর্থবছর বিদ্যুৎ আমদানিতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ছয় পয়সা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছর দেশটি থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ৯৯ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এতে ব্যয় হয় এক হাজার ৯০০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এতে ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ে পাঁচ টাকা ৬২ পয়সা।

পিডিবির চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ রয়েছে। তাই বিদ্যুৎ আমদানি না করলেও একটা খরচ গুনতে হবে। তাই আমদানি অব্যাহত রয়েছে। আর চুক্তির শর্ত থাকায় আমদানি এখনই বন্ধ করা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, বর্তমানে ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এনটিপিসির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এনভিভিএন (বিদ্যুৎ ভ্যাপার নিগম লিমিটেড) থেকে দুই ফেজে যথাক্রমে ২৫০ ও ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনে বাংলাদেশ। এছাড়া সেম্বকপ ইন্ডিয়া থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, পিটিসি থেকে ২০০ মেগাওয়াট ও ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়।

২০১৪ সালে প্রথম জিটুজি ভিত্তিতে এনভিভিএনের ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। এ চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর। অর্থাৎ ২০৩৯ সালে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। আর এনভিভিএনের বাকি ৩০০ মেগওয়াট, পিটিসির ২০০ ও সেম্বকপের ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করা হয় ২০১৮ সালে। এ তিন চুক্তি মেয়াদ ১৫ বছর। অর্থাৎ ২০৩৩ সালে এ তিন চুক্তি শেষ হবে। আর ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানিতে চুক্তি করা হয় ২০১৬ সালে। পাঁচ বছর মেয়াদি এ চুক্তি শেষ হবে চলতি বছর। 

সর্বশেষ..