দিনের খবর পত্রিকা শেষ পাতা

ভিকারুননিসার ঠিকাদারকে জরিমানা করল প্রতিযোগিতা কমিশন

শিক্ষার্থীদের পোশাক সরবরাহে আইন লঙ্ঘন

নিজস্ব প্রতিবেদক: একক প্রতিষ্ঠানকে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরির একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ করে দেয়ায় রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলকে সতর্ক করেছে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজকে প্রায় ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরি-সংক্রান্ত এক মামলায় গতকাল এই আদেশ দেয় প্রতিযোগিতা কমিশন। চেয়ারপারসনসহ পাঁচ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিযোগিতা কমিশন এ আদেশ দেন। মোট ছয় কার্যদিবসে এ মামলার শুনানি হয়।
প্রতিযোগিতা কমিশনের আদেশে বলা হয়, বিচার্য বিষয় (১), (২) এবং (৩) প্রতিপক্ষগণের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিপক্ষগণ প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারার (১) উপধারার বিধান লঙ্ঘন করেছে। ২ নম্বর প্রতিপক্ষ মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ যোগসাজশের মাধ্যমে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে দীর্ঘ সময়ব্যাপী পোশাক সরবরাহ করে প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘন করে। আইনের ২০ ধারা অনুযায়ী প্রতিপক্ষ মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম মোল্লার ওপর ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে ইউনিফর্ম বিক্রিবাবদ এক কোটি ১৯ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮০ টাকার বার্ষিক গড় টার্নভারের ২ শতাংশ হিসেবে ৭৯ হাজার ৮৯৭ টাকা প্রশাসনিক আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়।
অন্যদিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য না থাকলেও প্রতিযোগিতা আইন অনুসরণ না করে একক প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের পোশাক সরবরাহের ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ায় স্কুল কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ২০২০ সালের ১ মে থেকে ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ভাড়াটিয়া চুক্তি প্রতিযোগিতা বিরোধী হওয়ায় তা বাতিল ও অকার্যকর করতে স্কুল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
একক প্রতিষ্ঠানকে পোশাক তৈরির কাজ না দিয়ে প্রতিটি ক্যাম্পাসের জন্য ন্যূনতম তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে
শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরি করাতে হবে। দর্জির দোকান নির্বাচনের জন্য দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বরে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত এ মামলাটি করে প্রতিযোগিতা কমিশন। অভিযোগ ছিল, ২০০৩ সাল থেকে লালবাগের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ একচেটিয়াভাবে শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরি করত। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা দরজি এই ব্যবসায় আসতে পারত না। বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষার্থীদের ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই পোশাক কিনতে হতো।
মামলার আদেশে বলা হয়, মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ যোগসাজশের মাধ্যমে ভিকারুননিসা স্কুলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এককভাবে পোশাক সরবরাহ করে। এতে স্কুল ও পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ (১) ধারার বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির জন্য ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির জন্য এক হাজার ২০০ টাকা এবং উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের পোশাকের মূল্য এক হাজার ৪০০ টাকা রাখা হয়।
২০১২ সালের প্রতিযোগিতা আইনের ১৫ ধারায় প্রতিযোগিতাবিরোধী চুক্তির বিষয়ে বলা আছে। এতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিতরণ, গুদামজাতকরণ বা অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত এমন কোনো চুক্তিতে বা যড়যন্ত্রমূলক যোগসাজশে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, আবদ্ধ হতে পারবে না; যা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে বা বিস্তারের কারণ ঘটায় কিংবা বাজারে মনোপলি অথবা ওলিগপলি অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এই মামলা প্রসঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, এই মামলার রায়ের উদ্দেশ্য একটাই, যারাই ব্যবসা করছেন, পণ্য ও সেবা ক্রয়-বিক্রয় করছেন, এখানে যেন প্রতিযোগিতা থাকে। প্রতিযোগিতা থাকলে ন্যায্য মূল্যে ভালো পণ্য ও সেবা পাওয়া যাবে।
মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ইব্রাহিম মোল্লা বলেন, ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর ১২ থেকে ১৩ হাজার পোশাক তৈরি করতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে। তবে তাদের কোনো কার্যালয় নেই। লালবাগে একটি কারখানা আছে যেখানে পোশাক তৈরি করা হয়। তিনি দাবি করেন, ২০০৩ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে দরপত্রের মাধ্যমে তিনি ভিকারুননিসা স্কুলের পোশাক তৈরির কাজ পান। এরপর আর দরপত্র ডাকা হয়নি। তবে তিনি এই কাজ প্রতি বছর পাচ্ছেন।
বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন গঠিত হয়। অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন আনাই এর লক্ষ্য। প্রতিযোগিতামূলক দামে জনসাধারণের পণ্য ও সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণেও এই কমিশন কাজ করে। ২০১২ সালে প্রতিযোগিতা আইনটি হয়। এর আগে ১৯৭০ সালে করা মনোপলিস অ্যান্ড রেসট্রিকটিভ ট্রেড প্র্যাকটিস অর্ডিন্যান্স দেশে বলবৎ ছিল। গত চার বছরে প্রতিযোগিতা কমিশনে চারটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। একটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেয়া আছে। এখন বিচারাধীন ১১টি মামলা।
এদিকে ১০ ফেব্রæয়ারি শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরির একচেটিয়া ব্যবসার কারণে আরেকটি মামলায় রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে প্রতিযোগিতা কমিশন। একক প্রতিষ্ঠান বা দরজি থেকে পোশাক তৈরির বাধ্যতামূলক না করে এর বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করতে রাজধানী আইডিয়াল স্কুলকে নির্দেশ দেয়া হয়। রামপুরায় অবস্থিত রাজধানী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরির নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান খিলগাঁও তালতলা মার্কেট এলাকার সুরভী টেইলার্স। অভিযোগ ছিল, ওই টেইলার্স থেকে শিক্ষার্থীদের পোশাক বানানো বাধ্যতামূলক। অন্য কোনো টেইলার্স থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা পোশাক বানাতে পারত না।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..