শাহ মো. জিয়াউদ্দিন : ফকির শব্দটি দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহƒত হয়: আধ্যাত্মিক অর্থে যিনি ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ নিবেদিত এবং সাধারণ অর্থে যিনি দরিদ্র বা ভিক্ষুক। ফকির বলতে এমন ব্যক্তিকে বুঝানো হয় যিনি সর্বত্যাগী, পৃথিবীর ভোগবাদ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। ফকির আরবি শব্দ ফকর (দারিদ্র্য) থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর দুটি প্রধান অর্থ রয়েছে: প্রথমত, যিনি নিজের পার্থিব সম্পদ ত্যাগ করে পরমাত্মার ধ্যানে ও জ্ঞান লাভের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এমন সুফি সাধক বা সন্ন্যাসী। তবে সব সুুফি সাধকই ফকির না। তবে ভিক্ষুককেও অনেকেই ফকির বলে থাকেন তবে যারা নিঃস্ব ও ভিক্ষা করে জীবন নির্বাহ করেন তারা ভিক্ষুক। সমাজে ভিক্ষুক ও ফকিরকে এক করে ফেলা হচ্ছে। ফার্সি দরবেশ শব্দটিও ফকির শব্দের সমার্থক। তবে সুফি সাধক ও সন্নাসী যে কোনো ফকির হতে পারে কিন্তু সব সুফি বা সন্ন্যাসী ফকির হতে পারে না।
ফকির যারা তারা সব সময় বাস্তবতায় বিশ্বাস করে। ফকিরা মনে করে প্রদর্শনবাদ প্রকৃত ধর্ম নয়, পরিপূর্ণ মানবতাই হলো প্রকৃত ধর্ম। ফকিরা বলে ধাকেন, ‘নিজেই নিজের ত্রাণকর্তা বা মুক্তিদাতা। নিজে ব্যতীত অন্য আবার কে জীবনের পাপ মোচন করবে, তাই নিজের পাপ নিজেকেই মোচন করতে হবে। ফকিরা আরও বলেন ‘আত্মদীপ প্রজ্বালন করো, নিজের শরণই অনন্য শরণ।’ ফকিরা মনে করেন যে মানুষ তার কর্মের ফলের জন্য সুখ-দুঃখ উভয়ই ভোগ করে থাকেন। আবার অন্য ভাবে বলা যায় যে, ফকির শব্দের মানে হলো সর্বহারা, যার কিছুই নেই এমন হতদরিদ্র, এর বহুবচন আরবিতে ফুকারা। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রেরণায় কিছু মানুষ সন্ন্যাসী হয়ে যান, দুনিয়ার কোনো ধনসম্পদ তারা চান না। গরিবিয়ানা জীবনযাপনে তাদের কোনো গ্লানি নেই। তবে সব ধর্মেই পার্থিব মোহ ত্যাগী মানুষ আছে। তাছাড়া তারা বুঝাতে চেয়েছেন। ফকিরদের মতে, সম্পদ, লোভ ও কামবাসনা হলো দুনিয়ার সব ধরনের হানাহানির মূল কারণ।
বাংলায় ফকির বলতে একটি মূলত একজন সন্ন্যাসী, সাধু পুরুষ বা দরবেশকে বোঝায়। ফকির শব্দটি মুসলিম ধর্মে ব্যবহার হলেও ভারতীয় উপমহাদেশে এটি গোস্বামী, সাধু, ভিক্ষুক এবং অন্যান্য উপাধির মতো হিন্দু তপস্বী এবং রহস্যবাদীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়েছে।
ধর্মের বাহ্য আচারে ফকিরদের তেমন আস্থা নেই। লোক দেখানো ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপকে তাদের অপছন্দ। ফকিরা আত্মমগ্ন উদাসীন ও আত্মতৃপ্ত। তাদের পার্থিব জগতে বিলাসী জীবনযাপনের করার বাসনা নেই। উপাস্যকে তারা অন্তরে চান বলে পার্থিব কিছু চান না। ফকিরা প্রতিষ্ঠাকামী নন, অথচ বিনীত, অকৃত্রিম ও অনাড়ম্বর। সবকিছু ত্যাগ করলেই একমাত্র ফকির হওয়া যায়। আসল ফকিরী মতে বাহ্য আলাপ থাকে না, অর্থাৎ তার সবটাই অন্তর্জগতের ব্যাপার, ধ্যানময় ও নীরবতালব্ধ।
‘শাহ’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট বংশ বা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে ব্যবহƒত হয়। শাহ শব্দটি তাদের বংশ পরিচয় যারা উল্লিখিত ফকিরদের পরম্পরা থেকে এসেছে। ফকির থেকে আসা মানুষগুলোই নামের সঙ্গে ‘শাহ’ ব্যবহার করেন। তাই অনুমান করা হয় এই বংশটা এসেছে ওই ফকির গোত্রীয় মানুষদের মধ্য থেকে। কারণ ফকিররা ঐতিহাসিকভাবে তাদের নামের সঙ্গে ‘শাহ’ ব্যবহার করে আসছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ফকির রয়েছে। শাহ শব্দটি হিন্দু তপস্বীদের (যেমন, সাধু, গুরু, স্বামী এবং যোগী) ক্ষেত্রেও ব্যবহার করতে দেখা যায়। শাহ শব্দটির ব্যবহার মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল যুগে বিকশিত হয়েছিল। উত্তর ভারতে ফকিরদের একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠীও পাওয়া যায়, যারা সুফি মাজারে বসবাসকারী ফকির সম্প্রদায় থেকে এসেছেন। সব ধর্ম মতে ‘ফকির’ শব্দটি সাধারণত সংসারত্যাগী, আধ্যাত্মিক সাধক বা তপস্বীকে বোঝায়, যারা জাগতিক জীবনের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকতার গভীরতার ধ্যানে রপ্ত থাকেন। ধর্মভেদে ফকিরের ধারণা হলো এমন যেমন, ইসলামে ফকির বলতে সুফি মুসলিম তপস্বীদের বোঝানো হয়, যারা জাগতিক সম্পদ ত্যাগ করে আল্লাহর উপাসনায় জীবন উৎসর্গ করেন। হিন্দু ধর্মে, যোগী, সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসী সম্প্রদায়কে অনেকে ফকির বলা হয়, যারা জাগতিক জীবন ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক পথে চালিত হন। সন্ন্যাসী ও তপস্বী এই দুটি শব্দের সাধারণ অর্থে ফকির শব্দটি এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি সংসার ও জাগতিক জীবন থেকে দূরে থেকে আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন থাকেন। এই ধারণাটি সব ধর্মের তপস্বী বা সন্ন্যাসীদের একই রকম হয়ে থাকে। তাছাড়া হিন্দু ধর্মে, যারা সংসার ত্যাগী বা গৃহের বন্ধন থেকে মুক্তি চান তারা হলেন সন্ন্যাসী।
‘ফকির’ বা ‘বাউল’ শব্দটি সাধারণত আধ্যাত্মিক সাধকদের বোঝাতে ব্যবহƒত হয়, যারা লোকজ ও আধ্যাত্মিক ধারার অনুসারী। লালন শাহ ‘ফকির লালন’, ‘লালন সাঁই’ এবং ‘মহাত্মা লালন’ নামে পরিচিত ছিলেন। বাউলরা হলেন বাংলার এক ধরনের আধ্যাত্মিক লোকসংগীত শিল্পী ও সাধক, যারা সুফি ও বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শনের সমন্বয়ে আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী গান পরিবেশন করেন। অন্যদিকে ফকির একটি সুফি-ভিত্তিক আধ্যাত্মিক সাধক সম্প্রদায়, যারা মানব জীবনের দর্শন অনুযায়ী আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। তবে লালন সাঁই হলো বাউল কিন্তু তিনি ফকির। কারণ মানবতার দর্শনটাই লালন ফকিরের চিন্তা চেতনায় সদ্য জাগ্রত ছিল। তিনি বিশ্ব বহ্মাণ্ডের মানুষের মাঝে মানবতার বানী প্রচার করেছেন। বাউল এবং ফকিরের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে অনেক সাধক উভয় পরিচয় ধারণ করেন।
প্রকৃত ফকিরা কিন্তু মানবতার বানী প্রচার করে। মানবাত্মার মুক্তি লাভের জন্য সৎকর্মকে নির্দেশনা দেন। ফকিররা কোনো তত্ত্বকে হাতিয়ারা বানিয়ে মানুষের মন জয় করতে চান না। বা ইন্দ্রজালিকতায় কিছু প্রদর্শন করেন না। তারা বুঝাতে চান পার্থিব জগতে মোহাবিষ্ট হয়ে মানুষ পাপ কার্যে লিপ্ত হয়। ফকিররা কোনো ধর্মের বাণীকে কটাক্ষ করেন না। তারা নিজেদের কথাগুলো প্রচার করে থাকেন, যা সব ধর্মের মানুষের এবং সমাজের জন্য কল্যাণকর।
উন্নয়ন কর্মী, রাজশাহী
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post