প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানো থেকে বাদ না পড়ুক কোনো শিশু

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুস্থ-সবল শিশুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এ প্রবাদটি। জাতির উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদেরও বিকল্প নেই। দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জন্মের আগে ও পরে নিতে হবে শিশুর বিশেষ যত্ন। একজন সুস্থ-সবল মা-ই জš§ দিতে পারেন সুস্থ শিশু। আবার জন্মের পর থেকেই তাকে দিতে হবে ভিটামিনযুক্ত খাবার, যাতে শিশু পুষ্টিহীনতার শিকার না হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম অর্জন হলো শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস পাওয়া।

গতকাল শুক্রবার শেয়ার বিজে “ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে কাল” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে জানানো হয়, সারাদেশে আজ শনিবার দুই কোটি ১০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে। খাওয়ানো হবে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে।

সব শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর ঘোষণা দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের সব শিশুকে এ কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার জন্য ২০ হাজার স্থায়ী ক্যাম্পের পাশাপাশি করা হবে ২০ হাজার অস্থায়ী ক্যাম্প। প্রতিটি ক্যাম্পেই তিনজন স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালন করবেন। ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পগুলো করা হবে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, খেয়াঘাট, ব্রিজের টোলপ্লাজা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশনসহ চরাঞ্চলের দুর্গম এলাকায়। দেশের দুর্গম এলাকায় যাতে কোনো শিশু এ কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, এ জন্য আরও চার দিন কর্মসূচিটি চালানো হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

কোনো শিশু যাতে এ কার্যক্রম থেকে বাদ না পড়ে, সেজন্য প্রতিবারই মোবাইল ফোনে পাঠানো হয়ে থাকে এসএমএস। এবারও সেটি করা হবে নিশ্চয়। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে। এটা এ কর্মসূচির জন্য ইতিবাচক।

শিশুর অন্ধত্ব রোধে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর বয়স ৯ মাস হলে হামের টিকার সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে ৯ মাসের আগে জোর করে এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই। এর কম বয়সী শিশুকে ক্যাপসুলটি খাওয়ালে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুর বমি বমি ভাব, মাথার তালু ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাপসুলের পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত খাবার খাওয়ানো দরকার। যাতে শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে। ছিন্নমূল শিশুসহ কেউ যেন এ কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, এটাই কাম্য।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি বাজারে খোলা গুঁড়া মসলার ব্যবসা করতেন হাসান আলী। তিন যুগ ব্যবসা করার পর এখন তিনি বেকার। বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তিন বছর আগেই ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বড় কষ্টে দিন পার করছেন বৃদ্ধ হাসান আলী।

নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় ২০ বছর ধরে বেকারি চালিয়েছেন আবদুর রহমান। তার বেকারি এখন বন্ধ। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে বসে আছেন তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিনারায়ণপুর গ্রামের রহিমা বেগম। মুড়ি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু এখন তিনি অনেকটা বেকার। রমজান মাস ছাড়া তার ব্যবসা হয় না।

এভাবে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন দেশের লাখো ব্যবসায়ী। প্রাণ, স্কয়ার, এসিআইসহ বড় কয়েকটি কোম্পানির আধিপত্যে লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখন দিশাহারা। তারা ভালো নেই। তাদের রুটি-রুজিতে হাত দিয়েছে বড় কোম্পানিগুলো।

প্রাণ ও স্কয়ার গ্রুপ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। এ দুটি কোম্পানির বাজারজাত করা পণ্যের গুণগত মান যা-ই হোক না কেন, আকর্ষণীয় মোড়কে পৌঁছে ভোক্তার হাতে। তাদের রয়েছে বিশাল বিপণন নেটওয়ার্ক ও কর্মিবাহিনী। পণ্যের বিক্রি বাড়াতে টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় নিয়মিত নজরকাড়া বিজ্ঞাপনও দেয় এসব প্রতিষ্ঠান। তাই যে কোনো পণ্য ছেড়ে সহজে বাজার দখল করে নিতে পারছে কোম্পানি দুটি। আর এ সুযোগে তারা মুড়ি, চানাচুর, কটকটি, ডালভাজা, মটর ভাজা, দই, চিঁড়া, মাঠাসহ প্রায় সব ধরনের জাংকফুড বাজারজাত করছে। এছাড়া চাল, মসলা, নুডলস, তেলসহ শতাধিক পণ্য তৈরি করছে তারা।

এক্ষেত্রে প্রাণ গ্রুপ এক ধাপ এগিয়ে। গ্রুপটি শুরু করেছে বেকারি ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা। প্রাণের অলটাইমের কাছে ছোট সব বেকারি মার খাচ্ছে। প্রাণের বাজারজাত কৌশলের সঙ্গে পেরে উঠছে না লোকাল ব্র্যান্ডগুলো। অলটাইম ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হচ্ছে কেক, বিস্কুট, চকোলেটসহ শত রকমের বেকারি পণ্য। পাড়া-মহল্লায় যেসব বেকারি রয়েছে, তাদের এখন জান যায় যায় অবস্থা। এছাড়া প্রাণের ‘টেস্টি ট্রিট’ রেস্টুরেন্টের কারণে পাড়া-মহল্লার ছোট রেস্তোরাঁগুলো মার খাচ্ছে।

বিশ্বের সব দেশেই ক্ষুদ্র উদ্যোগকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগ সফল করার জন্য থাকে নানা সহযোগিতা। বড় উদ্যোগের পাশাপাশি ছোট উদ্যোগও যাতে টিকে থাকে, সেজন্য তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। কারণ ক্ষুদ্র উদ্যোগেই উদ্যোক্তার হাতেখড়ি হয়ে থাকে। সফল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা একসময় মাঝারি, তারপর বড় উদ্যোক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন। তাছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোগ শ্রমঘন বলে কর্মসংস্থানও বেশি হয়। ফলে রাষ্ট্র এ ধারণাকে নীতিগত সমর্থন দেয়। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কোনো নীতিমালা নেই। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে কয়েকটি শিল্প গ্রুপ।

দেশ চীনা পণ্যে সয়লাব। রাজধানীর চকবাজারের প্রায় সব মনোহারি পণ্যই বিদেশি। ভারত ও চীন থেকে আমদানি করা হচ্ছে এসব পণ্য। শিশুদের প্রায় শতভাগ খেলনা আসছে চীন থেকে। নবাবপুরের যত মেশিনারিজ, তাও আসছে চীন থেকে। দেশে সহস্রাধিক পণ্য আমদানি করা হয়, যার কোনো বিকল্প এদেশে নেই। সুই থেকে মোটরগাড়িÑপ্রায় সবই আমদানি করা হয়। ওষুধশিল্পের কাঁচামালও আসে বিদেশ থেকে। আকরিক লোহা প্রক্রিয়াকরণের কোনো কারখানা নেই দেশে। নেই কোনো আইটি পার্ক, গাড়ি তৈরির কারখানা। ওয়ালটন ও রানার গ্রুপ মোটরবাইক সংযোজনের কারখানা করলেও ভারতীয় বাজাজের সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠছে না। এক্ষেত্রে দেশে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকার মোবাইল ফোনসেট ও খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানি করা হয়। দেশে গড়ে উঠতে পারে নিজস্ব ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোনসেট কারখানা। প্রাণ ও স্কয়ার নিঃসন্দেহে বড় কোম্পানি। তাদের মূলধনের অভাব নেই। ভারী শিল্পের জন্য তারা উপযুক্ত। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার টেক্সটাইলের মতো আরও বড় উদ্যোগ নিতে পারে প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরীর হাতে গড়া এ বিশাল প্রতিষ্ঠান। মুড়ি, চানাচুর ও মসলা ছাড়াও নানা পণ্যে তারা বিনিয়োগ করতে পারে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বরং আমদানি-বিকল্প শিল্প গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে জাহাজ নির্মাণ খাতের সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল। রফতানিমুখী এ খাত নিয়ে ২০১০-১১ সালে যে সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, তা অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছে। এ জন্য যতটা না দায়ী ব্যবসায়িক মন্দা, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়ী আমাদের উদ্যোক্তারা। এ খাতে রয়েছে যোগ্য উদ্যোক্তার অভাব। এখানে তৈরি পোশাকশিল্পের মতো ভালো কিছু উদ্যোক্তা দরকার, যাদের হাত ধরে বড় হবে জাহাজশিল্প।

বছর পাঁচেক আগের কথা। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন তখন বাণিজ্যসচিব। কথা প্রসঙ্গে তাকে আমার সহকর্মী সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘দেশের কয়েকটি বড় কোম্পানি খুব ছোট মাপের ব্যবসা করছে। তাদের চিন্তা-ভাবনা এত নিচে নেমে গেছে যে, ফুটপাতের ঝালমুড়ির ব্যবসাও তারা করছে। এ বিষয়ে আপনার কিছু করার আছে কি না।’ উনি তখন বলেছিলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি। ছোট মাছকে যেভাবে বড় মাছ খায়, সেভাবে দেশের বড় ব্যবসায়ীরা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজিতে হাত দিচ্ছে।’ এক্ষেত্রে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছিলেন তিনি। জবাবে প্রশ্নকর্তা বলেছিলেন, ‘বড় মাছ ছোট মাছকে খায়। তারপরেও ছোট মাছের অস্তিত্ব টিকে থাকে। কিন্তু বড় মাছ যখন ছোট মাছের খাবারে হাত দেয়, তখন তাদের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।’ গোলাম হোসেন তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে সেখানেই আলোচনার ইতি টেনেছিলেন।

আকিজ গ্রুপের দুই ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন কোনো উদ্যোগ নেই, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে। একই প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল আকিজ গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে। বাবার হাতে গড়া বিশাল ব্যবসা সামলাচ্ছেন তিনি। বললেন, এমন কোনো ব্যবসা তারা করবেন না, যাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। দেশে এখনও বিনিয়োগ করার মতো অনেক খাত রয়েছে। তাই মুড়ি, চিঁড়ার ব্যবসা করার প্রশ্নই ওঠে না। এসব সহজ ব্যবসা। এতে পুঁজি কম লাগে। কিন্তু তাদের গ্রুপের সঙ্গে এটা যায় না।

পরিচিত এক সাংবাদিক-বন্ধু আছেন। তিনি কখনো বাসে উঠলে ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে এটা-ওটা কেনেন। ফুটপাত থেকেও পছন্দের উপহারসামগ্রী কেনেন। বই, কলম, শোপিসসহ নানা পণ্য কিনে কলিগদের উপহার দেন। উনি খুব আগ্রহ নিয়ে এটা করেন, কেবল পণ্যের উৎপাদক বা বিক্রেতাকে উৎসাহ দিতে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্ষায় নীতিমালা নেই। তার অর্থ এই নয়, বড় কোম্পানি যা ইচ্ছা তা-ই করবে। এ বিষয়ে সরকার নীরব থাকলেও ভোক্তাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যেন নতুন ও ক্ষুদ্র উদ্যোগকে উৎসাহ দিই। ছোটখাটো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোগকে প্রাধান্য দিই, তাহলে রাঘব বোয়ালদের আধিপত্য কমবে। টিকে থাকবে লাখো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

 

লেখক: সাংবাদিক