প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ভুয়া ‘ইউডি-ইউপি’ তৈরি করে কাঁচামাল ব্যবহারে জালিয়াতি

রহমত রহমান: বানানো হয়েছে ভুয়া ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন)। সেই ভুয়া ইউডি দিয়ে নিজেরাই বানিয়েছে ভুয়া ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিশন)। ভুয়া ইউডি আর জাল ইউপি দেখিয়ে অবৈধভাবে অপসারণ করা হয় কাঁচামাল। এই জালিয়াতি করেও প্রতিষ্ঠান থেমে থাকেনি। আগুনে পুড়ে যাওয়া কারখানার নামে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে কাঁচামাল। এমনকি মেশিনারিজের উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত কাঁচামাল ব্যবহার দেখিয়ে অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে কাঁচামাল।

মূলত শুল্ককর ফাঁকি দিতেই এমন সব অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে। জালিয়াতির মাধ্যমে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। দুই মামলায় প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকার শুল্ককর পরিশোধে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি এ নোটিস জারি করা হয়। এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে প্রিমিয়ার অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এইচ লুৎফুর রহমান আজিম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাকে শোকজ করা হয়েছে, তবে আমি এখনও চিঠি হাতে পাইনি। পেলে জবাব দেব।’ জালিয়াতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমদানি প্রাপ্যতার বাইরে আমার যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি যে পণ্য রপ্তানি করেছি তার সব কাগজপত্র আছে। আমার কারখানায় আগুন লাগার পর আমার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে।’ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইসি প্রতিবেদন দিয়েছে। জালিয়াতি হয়নি, এলসি, পিআরসি সব ঠিক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। অতিরিক্ত কাঁচামাল ব্যবহার দেখিয়ে ইউপি গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডেডোর নির্দেশনা মেনেই কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। অপব্যবহারের সুযোগ নেই।’

এনবিআর সূত্রমতে, ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১১টার দিকে লাগা আগুনে নগরীর বায়েজিদ থানাধীন প্রিমিয়ার অ্যাকসেসরিজ লিমিটেডের কারখানা পুড়ে যায়। কিন্তু কারখানা পুড়ে গেলেও দুই মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধার আওতায় ৭৫টি ইউপি নিয়ে পণ্য চালান খালাস করেছে। পুড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির অনুমতি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন ও এনবিআরে একজন ব্যবসায়ী অভিযোগ দেয়। বিষয়টি নিয়ে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) তদন্ত শুরু করে। এছাড়া পুড়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নামে কীভাবে কাঁচামাল হলোÑতা খতিয়ে দেখতে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করে।

সূত্র আরও জানায়, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে পৃথক প্রতিবেদন দেয় সিআইসি। যাতে প্রতিষ্ঠানটির জালিয়াতি করে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। যাতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ও প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকার শুল্ককর ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম কাস্টম বন্ড কমিশনারেটকে প্রতিবেদন পাঠায় সিআইসি। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানকে পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। গত ২৯ ডিসেম্বর কমিশনার একেএম মাহবুবুর রহমান সই করা এই নোটিস জারি করা হয়।

সিআইসির প্রতিবেদন অনুযায়ী জারি করা নোটিসে বলা হয়, সিআইসির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রিমিয়ার অ্যাকসেসরিজের কারখানায় স্থাপিত টুইল টেপ ও ড্রয়েস্টিং উৎপাদনকারী মেশিনারিজের জন্য নির্ধারিত উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত কাঁচামাল ব্যবহার দেখিয়ে ইউপি গ্রহণ করেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইসি ২০২০ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে আট মাসে মোট ২২৪ কার্যদিবসে ইস্যু করা ২২৯টি ইউপি পর্যালোচনা করা হয়। যাতে দেখা গেছে, এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ১২ সেট টুইল টেপ মেশিনের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮০০ কেজি এবং ৭৫টি ড্রয়েস্টিং উৎপাদনে পলিয়েস্টার ইয়ার্নের ব্যবহার দেখিয়েছে ১০ লাখ ৪২ হাজার ১১৬ কেজি ও ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮ কেজি। অর্থাৎ টুইল টেপ উৎপাদনের জন্য ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৩৬৩ কেজি পলিয়েস্টার ইয়ার্ন ও ড্রয়েস্টিং উৎপাদনের জন্য ১ লাখ ২৬ হাজার ৮২৮ কেজি পলিয়েস্টার ইয়ার্ন কারখানায় স্থাপিত মেশিনারিজের উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ত কাঁচামাল ব্যবহার দেখিয়ে অবৈধভাবে অপসারণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অবৈধ অপসারণ করা এই কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৯ কোটি ৫০ লাখ ২১ হাজার ১০৮ টাকা। যার ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর ১১ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৩৬৯ টাকা, যা প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে।

সিআইসির প্রতিবেদন অনুযায়ী জারি করা অন্য নোটিসে বলা হয়, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট হতে ইস্যু করা ইউপি, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং সিইপিজেড থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে যাচাইয়ে দেখা গেছে, বিজিএমই হতে ৬টি এবং বিকেএমইএ থেকে ১০টি ইউডির মাধ্যমে অসত্য ইউডি এবং ইউডির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি অসত্য ইউডি সংশোধনের মাধ্যমে এই দপ্তর থেকে ৭৩টি ইউপি অনুমোদন নিয়েছে। ওই ইউপিগুলোয় ব্যবহƒত কাঁচামালের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দাঁড়ায় ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৩৬ হাজার ৫২৫ টাকা। ইউপিতে কনজাম্পশন শিট ও ইউপি ফরমে অসত্য তথ্য প্রদান করে বন্ড লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে দাখিল করা ইউপিতে পলিয়েস্টার ইয়ার্ন ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৭৩ কেজি, কটন ইয়ার্ন ২৩ হাজার ৩৩৩ কেজি, ডুপ্লেক্স বোর্ড ৩৭ হাজার ১২৯ কেজিসহ মোট ৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৫ কেজি ব্যবহƒত কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ককর দাঁড়ায় ৩ কোটি ২০ লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৪ টাকা; যা প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিয়েছে। কাস্টমস আইন অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় প্রতিষ্ঠানটি পৃথক কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। নোটিসে প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। অন্যথায় কাস্টমস আইন অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, সিআইসির প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান যথাযথ জবাব দিতে পারলে খালাস পাবে। জবাব দিতে না পারলে প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটির বন্ডের সব ধরনের অপব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।