দিনের খবর শেষ পাতা

ভুল পরিকল্পনায় চার লেন নির্মাণব্যয় বাড়ছে ৬৫%

আশুগঞ্জ নৌবন্দর-আখাউড়া স্থলবন্দর মহাসড়ক

ইসমাইল আলী: ভারতের ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এজন্য ২০১৭ সালের এপ্রিলে প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। যদিও চার বছরের মাথায় প্রকল্পটির নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ে। আর তা সংশোধন করতে গিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে প্রায় ৬৫ শতাংশ।

এদিকে চার বছরে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। এজন্য প্রকল্পটির মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। গত ৬ এপ্রিল প্রকল্পটির পিএসসি বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে জানানো হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের মধ্যে সংযুক্তি বৃদ্ধির জন্য আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সরাইল, ধরখার হয়ে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে প্রকল্পটি নেয়া হয়। তিনটি প্যাকেজ এ মহাসড়কের কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ৫৬৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পটির নকশা সংশোধনের ফলে বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৭৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে দুই হাজার ৩০৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৬৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

ভারতের ঋণে (এলওসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটিতে ভারতের ঋণ দেয়ার কথা ছিল দুই হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। বাকি এক হাজার ৩১২ কোটি জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে বর্ধিত প্রকল্প ব্যয়ের জন্য ভারত ঋণের পরিমাণ বর্ধিত না করলে বাড়তি অংশ পুরোটাই বাংলাদেশকেই বহন করতে হবে।

সূত্রমতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ করার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনের মধ্যে। পরে তা এক বছর বাড়িয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে এখনও প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ বাকি রয়ে গেছে। বাস্তবায়ন ধীরগতির কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বৈঠকের তথ্যমতে, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) ধীরগতির যানবাহনের লেনের প্রশস্ততা ধরা হয়েছে তিন দশমিক ৬ মিটার। কিন্তু ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটি) সভায় বর্তমান যান চলাচল পরিস্থিতি ও ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সম্পূর্ণ অংশে ধীরগতির যানবাহনের লেনের প্রশস্ততা সাড়ে পাঁচ মিটার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রথম প্যাকেজের আওতায় আশুগঞ্জ ইন্টারসেকশন হতে সরাইল ইন্টারসেকশন পর্যন্ত ধীরগতির যানবাহনের লেন ঢাকা-সিলেট করিডোর উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাড়ে পাঁচ মিটার প্রশস্ততায় উন্নীত করার নির্দেশনা দেয়া হয়। এতে মূল মহাসড়কের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরগতির যানবাহনের লেনটি ৯২৫ মিলিমিটার থেকে এক হাজার ১৯৫ মিলিমিটারে উন্নীতের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে মূল মহাসড়কের পিসি গার্ডার সেতুর সø্যাবের প্রশস্ততা ১৪ মিটার থেকে ১৬ দশমিক ৪০ মিটারে উন্নীত করতে হবে আর ধীরগতির যানবাহনের লেনের সেতুর সø্যাবের প্রশস্ততা ছয় মিটার থেকে আট দশমিক ৪০ মিটারে উন্নীত করা প্রয়োজন হবে।

এর আগে মহাসড়কটির প্যাকেজ ১-এর কাজ নিয়ে জটিলতা ছিল। সড়ক চওড়া করতে গিয়ে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল ভরাট করা নিয়ে বাদ সাধে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এতে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে দাবি সংস্থাটির। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকের পর সুরাহা পর্যায়ে গেছে। এক্ষেত্রে ১২টি কালভার্ট পুনর্নির্মাণ করতে হবে। তবে প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে এ খাতে বরাদ্দ ছিল না।

এদিকে দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় নতুন একটি আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ঋণ চুক্তির শর্ত অনুসারে ভারত থেকে নির্মাণ কাজে ব্যবহƒত উপকরণ আমদানি করতে হবে ৬৫ শতাংশ। তবে এক্ষেত্রে ঠিকাদারকে উৎস মুখে যে শুল্ক, আবগারি ও ভ্যাট দিতে হবে তা বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে। এ খাতে কোনো ব্যয় ধরা ছিল না। তবে সংশোধিত ডিপিপিতে এ খাতে ৮০৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটিতে জমি অধিগ্রহণ খাতেও ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্পটির জন্য জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি না পেলেও ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ প্রদান তিনগুণ করা হয়েছে। তাই এ খাতে ব্যয় বাড়বে ৮৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এছাড়া পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরে কোনো বরাদ্দ ছিল না প্রকল্পটিতে। তবে প্রকল্পের আওতায় দুটি রেলওয়ে আন্ডারপাস নির্মাণ করতে গিয়ে এ খাতে নতুন করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এর বাইরে ঠিকাদার কর্তৃক ১ম, ২য় ও ৩য় প্যাকেজে যে দর প্রস্তাব করা হয়েছে তা ডিপিপিতে সংস্থানকৃত অর্থের চেয়ে যথাক্রমে ১৪৪ কোটি ৯৫ লাখ, ৫২৮ কোটি ১৭ লাখ ও ১৮০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি। আর ডিপিপিতে ভ্যাট ও আয়কর খাতে পাঁচ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। তবে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ শতাংশ। তাই ওই খাতেও ব্যয় বাড়বে। এছাড়া পরামর্শক খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেন পাটোয়ারী বলেন, ডিপিপির প্রস্তাবিত সংশোধনে পূর্ত কাজ বৃদ্ধির পরিধি ও কারণ সভায় তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্যাকেজে প্রাক্কলিত ব্যয়ে চেয়ে চুক্তি মূল্যের এত বেশি পার্থক্যের কারণও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন বিষয় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..