সম্পাদকীয়

ভুল পরিকল্পনায় দেশ আর কত মাশুল দেবে?

আমাদের বড় প্রকল্পগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো ব্যয়বহুল। বেশিরভাগ প্রকল্প, অবকাঠামোর নির্মাণব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হয় না। এতে নির্মাণব্যয় বাড়ে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হয়। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণেও সময়ক্ষেপণ হয়, তাতে ব্যয়ও বাড়ে। কিন্তু কোনো প্রকল্প ভুল পরিকল্পনায় নির্মিত হলে শুধু রাষ্ট্রের অর্থই অপচয় হয় না, সাধারণ মানুষের ভোগান্তিও বাড়ে। বারবার ভুল হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বারবার ভুল হওয়া মানে আগের ভুল থেকে শিক্ষা নেয়া হয়নি। ফলে এ প্রশ্নও ওঠে, প্রকল্পে ভুল পরিকল্পনার নামে পরিকল্পিতভাবে অর্থ লোপাট হচ্ছে কি না। যথাযথ পরিকল্পনা একটি স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনায় কোনো দুর্বলতা বা ভুল থাকলে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, নির্মাণ চলাকালে কিংবা পরবর্তী সময়ে বড় দুর্ঘটনা সংঘটিত হতে পারে। কখনও নতুনভাবে নির্মাণ করতে হতে পারে।

আমাদের দেশে ভুল পরিকল্পনার কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত কম নয়। গতকালও শেয়ার বিজে প্রকাশিত হয়েছে এমন প্রতিবেদন। ‘খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ নির্মাণ: ভুল পরিকল্পনায় দুই দফায় ব্যয় বাড়ছে ২৫৪০ কোটি টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে আলোচ্য প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭২১ কোটি ৩৯ লাখ। ২০১৫ সালে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং সর্বশেষ হিসাবে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, খুলনা-মোংলা বন্দর রেলপথ তিন বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার কথা থাকলেও গত আগস্ট পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৮৩ শতাংশ। যদিও পরিকল্পনার ত্রুটিতে ঠিকাদার নিয়োগের আগেই ২০১৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটি একবার সংশোধন করা হয়। তবে নির্মাণ শুরুর পর মূল রেলপথ ও রূপসা রেল সেতুর নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ে। এগুলো সংশোধন করতে গিয়ে নির্মাণব্যয় আরও বেড়ে গেছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দ্বিতীয় দফা বাড়ানো হচ্ছে।

কয়েক বছর ধরে আমরা লক্ষ করছি, রেলের প্রকল্পের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো যথাযথ পরিকল্পনা না করে প্রকল্প গ্রহণ, মাঝপথে গিয়ে প্রকল্প সংশোধন, বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধি। কখনও কেনাকাটায়, কখনও চড়া সুদে ইঞ্জিন কেনা কখনও ভুল পরিকল্পনায় ব্যয় বাড়ছে। এতে লাভবান হচ্ছে দেশি-বিদেশি ঠিকাদার, রেলের অসাধু কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী তদবিরকারী চক্র। চূড়ান্ত বিচারে এতে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রেলকে পরিকল্পনামতো এগিয়ে নিতে চাইলে সঠিকভাবে প্রকল্প নেয়া, বাস্তবায়ন করা এবং ঠিকাদারের ওপর কার্যকর নজরদারি এবং অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা না থাকায় প্রায়ই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা কঠিন। এর মধ্যে বাড়তি সময়, নকশায় পরিবর্তনসহ নানা অজুহাতে ঠিকাদার বাড়তি টাকা দাবি করেন। নিজেদের ব্যর্থতা কিংবা যোগসাজশে রেলের কর্মকর্তারাও প্রকল্পব্যয় বাড়িয়ে নেন। ভুল পরিকল্পনার নামে অর্থ অপচয় বা লোপাট কাম্য নয়। কতবার ভুল হতে পারে! এ প্রকল্পে বা ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রকল্প ‘ভুল পরিকল্পনায়’ আক্রান্ত হলে সে জন্য দায়ীদের জবাবদিহি করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..