ভুল পরিকল্পনায় প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে ২,২২৪ কোটি টাকা

ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য ভারতের ঋণে চার লেন নির্মাণ

ইসমাইল আলী: ভারতের ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে এ-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এর চার বছরের মাথায় প্রকল্পটির পরিকল্পনায় ত্রুটি ধরা পড়ে। তা সংশোধন করতে গিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে প্রায় দুই হাজার ২২৪ কোটি টাকা।

এদিকে সাড়ে চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ৩৩ শতাংশ। এজন্য প্রকল্পটির মেয়াদ তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সম্প্রতি চূড়ান্ত করা প্রকল্পটির আরডিপিপিতে (সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) এ তথ্য উঠে এসেছে। শিগগিরই তা অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

আরডিপিপির তথ্যমতে, বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের মধ্যে সংযুক্তি বৃদ্ধির জন্য আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে সরাইল, ধরখার হয়ে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত ৫০ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে প্রকল্পটি নেয়া হয়। তিনটি প্যাকেজে এ মহাসড়কের কাজ চলছে। ভারতের ঋণে (এলওসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ৫৬৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পটির নকশা সংশোধনের ফলে বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ হিসাবে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে দুই হাজার ২২৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বা ৬২ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

এদিকে প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটিতে ভারতের ঋণ দেয়ার কথা ছিল দুই হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। বাকি এক হাজার ৩১২ কোটি জোগান দেবে বাংলাদেশ। এখন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভারতের ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে দুই হাজার ৯৮২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। আর সরকারের তহবিল থেকে দেয়া হবে দুই হাজার ৮০৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ ভারতের ঋণ সামান্য পরিমাণ বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাই সরকারি বিনিয়োগ অনেক বেশি বাড়াতে হচ্ছে।

সূত্রমতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ করার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। পরে তা এক বছর করে দুইবার বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ হয়েছে ৩২ দশমিক ৮৯ শতাংশ। তাই বাকি শেষ করতে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবায়নকাল পাঁচ বছর বেড়ে যাচ্ছে।

গত এপ্রিলে প্রকল্পটির পিএসসি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে জানানো হয়, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় ধীরগতির যানবাহনের লেনের প্রশস্ততা ধরা হয়েছিল তিন দশমিক ৬ মিটার। কিন্তু একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটি) সভায় বর্তমান যান চলাচল পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় ঢাকা-সিলেট ধীরগতির যানবাহনের লেনের প্রশস্ততা সাড়ে পাঁচ মিটার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এতে আশুগঞ্জ-আখাউড়া মহাসড়কেও প্রথম প্যাকেজের আওতায় আশুগঞ্জ ইন্টারসেকশন থেকে সরাইল ইন্টারসেকশন পর্যন্ত ধীরগতির যানবাহনের লেন ঢাকা-সিলেট করিডোরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাড়ে পাঁচ মিটার প্রশস্ততায় উন্নীত করার নির্দেশনা দেয়া হয়।

এদিকে মূল মহাসড়কের পিসি গার্ডার সেতুর স্লাযাবের প্রশস্ততা ১৪ মিটার থেকে ১৬ দশমিক ৪০ মিটারে উন্নীত করতে হবে আর ধীরগতির যানবাহনের লেনের সেতুর স্লাযাবের প্রশস্ততা ছয় মিটার থেকে আট দশমিক ৪০ মিটারে উন্নীত করা প্রয়োজন হবে।

এর আগে মহাসড়কটির প্যাকেজ ১-এর কাজ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। সড়ক চওড়া করতে গিয়ে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল ভরাট করা নিয়ে বাদ সাধে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এতে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করে সংস্থাটি। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকের পর বিষয়টি সুরাহা হয়। এ ক্ষেত্রে ১২টি কালভার্ট পুনর্নির্মাণ করতে হবে। তবে প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে এ খাতে বরাদ্দ ছিল না।

এদিকে দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় নতুন একটি আন্ডারপাস নির্মাণ করতে হবে। এ ছাড়া ঋণ চুক্তির শর্ত অনুসারে ভারত থেকে নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণ আমদানি করতে হবে ৬৫ শতাংশ। তবে এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে উৎসমুখে যে শুল্ক, আবগারি ও ভ্যাট দিতে হবে তা বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে। এ খাতে কোনো ব্যয় ধরা ছিল না। তবে সংশোধিত ডিপিপিতে এ খাতে ৮০৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

প্রকল্পটিতে জমি অধিগ্রহণ খাতেও ব্যয় বাড়ছে। প্রকল্পটির জন্য জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি না পেলেও ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণ প্রদান তিনগুণ করা হয়েছে। তাই এ খাতে ব্যয় বাড়বে ৮৪৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া পরিষেবা সংযোগ লাইন স্থানান্তরে কোনো বরাদ্দ ছিল না প্রকল্পটিতে। তবে প্রকল্পের আওতায় দুটি রেলওয়ে আন্ডারপাস নির্মাণ করতে গিয়ে এ খাতে নতুন করে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এর বাইরে ঠিকাদার কর্তৃক ১ম, ২য় ও ৩য় প্যাকেজে যে দর প্রস্তাব করা হয়েছে, তা ডিপিপিতে সংস্থানকৃত অর্থের চেয়ে যথাক্রমে ১৪৪ কোটি ৯৫ লাখ, ৫২৮ কোটি ১৭ লাখ ও ১৮০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা বেশি। আর ডিপিপিতে ভ্যাট ও আয়কর খাতে পাঁচ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ ছিল। তবে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ শতাংশ। তাই ওই খাতেও ব্যয় বাড়বে। এ ছাড়া পরামর্শক খাতেও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আকবর হোসেন পাটোয়ারী শেয়ার বিজকে বলেন, প্রকল্পটির প্রস্তাবিত সংশোধনে পূর্ত কাজ বৃদ্ধির পরিধি ও কারণ সভায় তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্যাকেজে প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে চুক্তি মূল্যের এত বেশি পার্থক্যের কারণও বৈঠকে তুলে ধরা হয়। বিভিন্ন বিষয় আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির আরডিপিপি চূড়ান্ত করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এখন তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে।

সর্বশেষ..