প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ভুল পরিকল্পনায় নির্মাণ ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন: ত্রুটি সংশোধনে নেওয়া হচ্ছে নতুন প্রকল্প

ইসমাইল আলী: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে। আর ২০১০ সালের জুনে নেওয়া হয় ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পটি। গত জুনে দুটি চার লেনই একই সঙ্গে উদ্বোধন করা হয়। তবে ধীরগতির যানবাহনের জন্য চার লেন দুটিতে রাখা হয়নি সার্ভিস লেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়ক দুটিতে একই সঙ্গে চলছে সব ধরনের যানবাহন। এতে ব্যাহত হচ্ছে চার লেনের সুবিধা। নির্মাণ শেষে প্রকল্প দুটির এ ভুল পরিকল্পনা ধরা পড়ে।

চার লেন দুটির ত্রুটি সংশোধনে নেওয়া হচ্ছে এখন নতুন প্রকল্প। এক্ষেত্রে মহাসড়ক দুটির পাশে নতুন করে নির্মাণ করা হবে সার্ভিস লেন। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত মাসে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরকে (সওজ) নির্দেশনা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এরই মধ্যে একটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

তথ্যমতে, আদর্শ মহাসড়কের দুই পাশে সার্ভিস লেন থাকা বাধ্যতামূলক। এতে দ্রুতগতির যানবাহন মূল সড়ক দিয়ে বাধা ছাড়াই দ্রুত যাতায়াত করতে পারে। আর ধীরগতির যানবাহন সার্ভিস লেন দিয়ে যাতায়াত করে। পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য উঠানামায় বাস-ট্রাক সার্ভিস লেন ব্যবহার করে। তবে নবনির্মিত চার লেন দুটিতে কোনো সার্ভিস লেন নেই। তাই এগুলো মহাসড়কের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না।

বিভিন্ন গবেষণায়ও এ তথ্য উঠে এসেছে। এসব গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে কোনো আদর্শ মহাসড়ক নেই। চার লেনের যেসব সড়ক রয়েছে, সেগুলো অনেকটা লোকাল সড়ক। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত তিন বছরে গৃহীত নতুন তিনটি চার লেনের প্রকল্পে সার্ভিস লেন নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সার্ভিস লেন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গত ২১ নভেম্বর দরপত্র আহ্বান করা হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগ করা পরামর্শক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াও বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন, জমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত, প্রকল্প ব্যয় প্রাক্কলন ও ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র চূড়ান্ত করবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৮ সালের মার্চের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী ইবনে আলম হাসান শেয়ার বিজকে বলেন, সার্ভিস লেন না থাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের সুবিধা পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে মহাসড়ক দুটিতে নতুন করে সার্ভিস লেন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করেও চার লেনের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, শিগগিরই ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের দুই পাশে সার্ভিস লেন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এক্ষেত্রেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামছুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়কের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো প্রবেশ সংরক্ষিত রাখা। দুই পাশে বেষ্টনী থাকায় কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই এসব সড়কে সর্বোচ্চ গতিতে যানবাহন চলাচল করে। ধীরগতির যানবাহনের জন্য থাকে পৃথক সড়ক। এজন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সার্ভিস লেন যুক্ত করার উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। দেরিতে হলেও সওজ তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। এতে মহাসড়কগুলোর গুণগত মানোন্নয়ন হবে। তবে চার লেনের সঙ্গেই সার্ভিস লেন করা হলে ব্যয় কম হতো।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকা। ২০১০ সালে তা বাড়িয়ে দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা করা হয়। এরপর বিশেষ সংশোধনী আনলে ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ৪১০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীর পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সর্বশেষ এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮১৭ কোটি টাকা।

এদিকে ২০১০ সালে গৃহীত ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৯০২ কোটি টাকা। এক বছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৯২ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।