সম্পাদকীয়

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ প্রদানে গড়িমসি কাম্য নয়

‘মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: জমি অধিগ্রহণের ছয় বছরেও ক্ষতিপূরণ পায়নি ৪৯৪ জন’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকাল শেয়ার বিজে, তা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে বলেই ধারণা। খবরে বলা হয়, দ্রæত ক্ষতিপূরণ দিতে কক্সবাজারের ডিসিকে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং ক্ষতিপূরণ দেয়া না হলে প্রকল্পটিতে আটকে যাবে জাইকার অর্থছাড়।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে কিংবা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আইন অনুসারে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্র। ওই আইনে হুকুম-দখল প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর জন্য ভ‚মি অধিগ্রহণের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। আইনানুসারে ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করবেন এবং প্রযোজ্য ক্ষতিপূরণ দেয়া বা সরকারি ট্রেজারিতে গচ্ছিত রাখা সাপেক্ষে ভ‚মি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করবেন।

দুঃখজনক বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের সম্পত্তি অধিগ্রহণের পরও ক্ষতিপূরণ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন থাকে। প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনাও কম হয়। অনেক ক্ষেত্রে বল প্রয়োগের মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যাচ্ছে, কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও সংযোগ সড়কের জন্য এক হাজার ৬১৪ একর ৬৫ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ২০১৪ সালে এ প্রক্রিয়ায় দুই হাজার ৮১৯ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে এখনও ৪৯৪ জন ক্ষতিপূরণ পাননি। ভ‚মি অধিগ্রহণের এতদিন পরও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক বৈকি।

জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণ দেয়া নিয়ে জটিলতা নতুন নয়। এখানে কেবল রাষ্ট্রের দায় নয়, জমির মালিকদেরও ভ‚মিকা রয়েছে। জমির মালিকরা বেশি দাম পেতে নানা কৌশল নেন। চালাক মানুষ পতিত জমিকে ফসলি জমি কিংবা বসতবাড়ি হিসেবে দেখিয়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বেশি অর্থ দাবি করেন বলে নানা সময় গণমাধ্যমে এসেছে। যেহেতু ২০১৪ সালে এ অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তাই এটি ‘স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ১৯৮২’ অনুযায়ীই ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা। ওই আইন অনুসারে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ছিল বাজারদরের দেড় গুণ। নির্দিষ্ট সময়ে ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় জমির মালিকরা ২০১৭ সালের আইন অনুসারে তিন গুণ ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।

আমরা মনে করি, যথাসময়ে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ দেয়া হলে অর্থ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা দেখা দিত না। এখন নতুন আইনের সুফল চাইতে পারেন ক্ষতিগ্রস্তরা। সে ক্ষেত্রে আরও ক্ষতিপূরণ দেয়া বিলম্বিত হতে পারে। এর আগে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নির্মীয়মাণ রেললাইনের ঘুষ দিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন ভ‚মিমালিকরা। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে সে ধরনের হয়রানির শিকার না হন লক্ষ রাখেতে হবে সেদিকেও। ক্ষতিপূরণ দেয়া না হলে এ প্রকল্পে জাইকার অর্থছাড় আটকে যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছে ইআরডি। এটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেয়া উচিত বলে মনে করি। আইন অনুসারে ডিসি ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও পরিশোধ করবেন। আমরা আশা করি, কক্সবাজারের ডিসি কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন। ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ভ‚মিমালিকরা যথাসময়ে ক্ষতিপূরণ পান, সেটি নিশ্চিতে সরকার পদক্ষেপ নেবে বলেই প্রত্যাশা।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..