ইব্রাহীম খলিল : সুদানে চলছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। রাজধানী খার্তুম ও দারফুর আজ আগুনে জ্বলছে। কিন্তু এই আগুন শুধু ভেতরের নয়, এর ছাই উড়ে যাচ্ছে কায়রো, রিয়াদ, মস্কো, আবুধাবি, আঙ্কারা আর ওয়াশিংটনের দিকেও। কারণ সুদান এখন এক অনন্য ভূরাজনৈতিক মঞ্চ, যেখানে প্রতিটি পরাশক্তি তাদের নিজস্ব স্বার্থে খেলছে সূক্ষ্ম এক কূটনৈতিক খেলা। অনেকে একে আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ বলে মনে করেন, কিন্তু এর ভেতরে চলছে এক গভীর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। সুদান ভৌগোলিকভাবে এক অমূল্য জায়গায় অবস্থান করছে। এটি একদিকে আফ্রিকা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগপথ। তার উপকূল ঘেঁষে আছে লোহিত সাগর, যা বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। প্রতি বছর এই রুট দিয়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের তেল ও পণ্য পরিবহন হয়। এছাড়া আছে নীলনদ, বিপুল স্বর্ণ ও খনিজ সম্পদ। ফলে কোনো শক্তি যদি সুদান নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, সে শুধু রাজনৈতিক আধিপত্যই নয়, আর্থিক ও সামরিক সুবিধাও পাবে। এজন্যই সুদান আজ পরিণত হয়েছে একটি ভূরাজনৈতিক দাবার ছকে, যেখানে পরাশক্তিগুলো খুবই কৌশলে গুটি চালছে।
মিসর বনাম ইথিওপিয়া: নীলনদে আঞ্চলিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব
সুদানের সংঘাতে মিসর ও ইথিওপিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত কৌশলগত। মিসর চায় সুদান স্থিতিশীল থাকুক, বিশেষ করে নীলনদের জল নিরাপত্তা রক্ষার জন্য। তাই তারা এসএএফের পাশে দাঁড়িয়ে কোনো অ-রাষ্ট্রীয় বাহিনী নীলনদে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার লক্ষ্য কিছুটা বিপরীত। তারা সুদানের অস্থিতিশীলতাকে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং নীলনদে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য ব্যবহার করতে চায়। ইথিওপিয়া সংঘাতকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র: ওয়াশিংটন শুরু থেকেই সুদানের সংকটকে ‘মানবিক সংকট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকার, সুশাসন, ও মানবিক সহায়তার কথা বলেছে। তবে মূল লক্ষ্য আসলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব ঠেকানো। যুক্তরাষ্ট্র জানে, যদি রাশিয়া লোহিত সাগরে নৌঘাঁটি স্থাপন করতে পারে বা চীন বাণিজ্যিক করিডোর সমপ্রসারিত করে, তাহলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে তার দীর্ঘদিনের প্রভাব হ্রাস পাবে। আরেকটি দিক হলো ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্র চায় সুদান যেন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নিরাপত্তা কৌশল ও মধ্যপ্রাচ্য নীতি আরও দৃঢ় হবে। তাই যুক্তরাষ্ট্র সুদানিজ আর্মড ফোর্সকে (এসএএফ) সহায়তা করছে।
রাশিয়া: রাশিয়ার জন্য সুদান মানে আফ্রিকার ভেতরে পুনরুত্থানের সুযোগ। মস্কো পোর্ট সুদানে নৌঘাঁটি স্থাপন করতে চায়, যা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করবে। আবার ওয়াগনার গ্রুপের মাধ্যমে আরএসএফের স্বর্ণখনি থেকে অর্থ আহরণ রাশিয়ার জন্য দ্বিগুণ সুবিধা। প্রথমত, এটি ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অর্থায়ন সরবরাহ করে। দ্বিতীয়ত, সুদানের স্বর্ণ-ভিত্তিক অর্থনীতি মস্কোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ সরবরাহ করে। তাই রাশিয়ার সমর্থন আরএসএফের দিকে।
সৌদি, ইরান ও আমিরাত: ইরান সমপ্রতি সুদানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছে। তাদের লক্ষ্য মূলত সৌদি-আমিরাতের প্রভাবকে কমিয়ে নিজেদের ‘শিয়া কূটনীতি’ শক্ত করা। সৌদি আরব লোহিত সাগর অঞ্চলে স্থিতিশীলতা চায়, কারণ এটি তাদের তেলবাহী জাহাজের প্রধান রুট। তাই তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় থেকে আন্তর্জাতিক সুনাম বাড়াতে চায়। অন্যদিকে আমিরাত, আরএসএফ বাহিনীকে সমর্থন দেয়, কারণ অতীতে তারা এই বাহিনীর ভাড়াটে সৈন্য ব্যবহার করেছে ইয়েমেন যুদ্ধে আবার স্বর্ণখনির নিয়ন্ত্রণও তাদের কাছেই আছে।
তুরস্ক: উসমানীয় আমলে সুদান ছিল তুরস্কের প্রভাবাধীন। তাই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই ঐতিহাসিক যোগসূত্রকে ব্যবহার করে আবারও লোহিত সাগরে প্রভাব বাড়াতে চান। তুরস্ক ইতোমধ্যেই সুয়াকিন দ্বীপের পুনর্গঠনের চুক্তি করেছে; বলা হয়, এটাই ভবিষ্যতে তাদের সামরিক ঘাঁটির সম্ভাব্য স্থান। তুরস্কের উদ্দেশ্য শুধু ধর্মীয় ঐক্য নয়; এটি একপ্রকার ‘রেড সি ফুটহোল্ড’ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যা আরব প্রতিদ্বন্দ্বী (বিশেষত আমিরাত-সৌদি) প্রভাবকে ব্যালান্স করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দৃষ্টিতে সুদান মানে একটাই—অভিবাসন প্রবাহের গেটওয়ে। আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ ও দারিদ্র্যের কারণে লাখো মানুষ ইউরোপে পাড়ি দেয়, আর তাদের অনেকেই সুদানের ভেতর দিয়েই সেই পথে যাত্রা শুরু করে। তাই ইউরোপ চায় সেখানে এমন একটি সরকার থাকুক, যা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে এই প্রবাহ ঠেকাতে।
চীন: চীন আবার সরাসরি সামরিক নয়, বরং অর্থনৈতিক উপনিবেশবাদী কৌশল অবলম্বন করছে। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে সুদানে তেল, অবকাঠামো ও খনিজ সম্পদে বিনিয়োগ করে আসছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ হিসেবে চীন সুদানকে পূর্ব আফ্রিকার একটি করিডোর বানাতে চায়।
আজকের সুদান বাস্তবে এক ‘আন্তর্জাতিক ল্যাবরেটরি’, যেখানে নতুন প্রজন্মের ভূরাজনীতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। সুদানের সংকট আমাদের শেখাচ্ছে, এক ব্যথাজাগা বাস্তবতা—আধুনিক ভূরাজনীতি মানে কখনো কখনো মানবিক বিপর্যয়কে পেছনে রেখে ক্ষমতা ও প্রভাবের শীতল খেলা। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যদি শুধু কূটনৈতিক আহ্বানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ভূখণ্ডের রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকবে, আর আফ্রিকার এই কৌশলগত চোক পয়েন্ট পরিণত হবে পরাশক্তিগুলোর এক সক্রিয় যুদ্ধের রণক্ষেত্রে।
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রিন্ট করুন



Discussion about this post