ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে সচেতন হতে হবে

রাশেদুর রহমান : বিয়ানের বয়স ৭। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। দোকানে কেক কিনতে যায় বাসার গৃহকর্মীর সঙ্গে। টাকা দিয়ে বিয়ান দেখে কেকের মেয়াদ দুই দিন আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। বিয়ান প্রতিবাদ করে, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ কেক নেব না, আমাকে টাকা ফিরিয়ে দিন।’ টাকা ফেরত নিয়ে সে বাসায় ফিরে আসে। বিয়ান তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে এ বিষয়গুলো শিখেছে বলে সে সচেতন হয়েছে। দোকনদারের উচিত ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস নষ্ট করে ফেলা, অথবা বিক্রি না করা। এমন বহু দোকনদার আছে, যারা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিস বিক্রি করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। অসচেতনতার কারণে অনেকেই না দেখে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার খেয়ে নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ‘ভোক্তা’ শব্দটি ছোট, তবে এর পরিধি ব্যাপক। দেশের সবাই ভোক্তা। মাতৃগর্ভে যারা আছে তারাও ভোক্তা। কারণ তারাও মাতৃগর্ভ থেকে খাবার গ্রহণ করে। যিনি বিক্রেতা তিনিও ভোক্তা, তিনি একদিকে পণ্য বিক্রি করছেন, অন্য বিক্রেতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ও করছেন। ভোক্তাদের অধিকার অনেক। অসচেতনতার কারণে হয়তো আমরা সে অধিকারের কথা জানি না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সবার এ বিষয়ে জানা দরকার। উন্নত বিশ্বে ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ অনেক সচেতন। নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশেও ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে মানুষ সচেতন হচ্ছে।

১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কংগ্রেসে ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে বক্তৃতায় নিরাপদ পণ্য বা সেবা পাওয়ার অধিকার, তথ্য পাওয়ার অধিকার, পছন্দের অধিকার এবং অভিযোগ প্রদান ও প্রতিকার পাওয়ার অধিকারÑভোক্তাদের এ চারটি মৌলিক অধিকার সম্পর্কে আলোকপাত করেন। পরে এটি ভোক্তা অধিকার আইন নামে পরিচিতি পায়। ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার রক্ষার নীতিমালায় কেনেডি বর্ণিত চারটি মৌলিক অধিকারকে বিস্তৃত করে অতিরিক্ত আরও চারটি মৌলিক অধিকার সংযুক্ত করা হয়। চাহিদা পূরণের অধিকার, জানার অধিকার, শিক্ষা লাভের অধিকার এবং সুস্থ পরিবেশের অধিকারসহ মোট আটটি অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ভোক্তা অধিকার রক্ষায় ১২০টি দেশের ২৪০টির বেশি সংগঠন নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল’ (সিআই) এই আটটি অধিকারকে সনদে আন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯০ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সম্মেলনে ভোক্তা অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের নীতিমালা অনুসরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বহুল প্রতীক্ষিত ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ পাস করে। সে বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’। ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’-এর উদ্দেশ্য হলো ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তি, নিরাপদ পণ্য বা সেবা নিশ্চিতকরণ, পণ্য বা সেবা ব্যবহারে ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রতারণারোধ এবং ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি।

মূল্য পরিশোধের বিনিময়ে কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহণ করেন যিনি, তিনিই ভোক্তা। ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত মূল্যের অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা, জেনেশুনে ভেজালমিশ্রিত পণ্য বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রস্তাব করা, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ দ্রব্য খাদ্যপণ্যের সঙ্গে মিশ্রণ ও বিক্রি করা, মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতাদের প্রতারিত করা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা যথাযথভাবে বিক্রি বা সরবরাহ না করা, ওজনে বা পরিমাণে কারচুপি করা, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ করা, এমন কোনো কাজ করা যাতে সেবাগ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্ন হতে পারে, অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করা, মোড়কাবদ্ধ পণ্যের মোড়কের গায়ে পণ্যের উপাদান, খুচরা বিক্রয়মূল্য, প্রস্তুত ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করা, আইনানুগ বাধ্যবাধকতা অমান্য করে দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা প্রভৃতি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার কারওয়ান বাজারে। দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। যে কোনো বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ করা যায়। অভিযোগ কেন্দ্রের ফোন নম্বর: ০২-৫৫০১৩২১৮, মোবাইল ফোন নম্বর: ০১৭৭৭-৭৫৩৬৬৮, হটলাইন: ১৬১২১ এবং ই-মেইল: [email protected]। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট (www.dncrp.gov.bd) থেকেও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। এছাড়া জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়, জেলা কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা যায়। এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘ভোক্তা অধিকার ও অভিযোগ’ অ্যাপ থেকে অভিযোগ করা যাচ্ছে।

অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে; ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েবসাইট প্রভৃতির মাধ্যমে অথবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে বা কারও মাধ্যমে পাঠানো যাবে, অভিযোগের সঙ্গে পণ্য বা সেবা ক্রয়ের রশিদ সংযুক্ত করতে হবে, অভিযোগকারীর পূর্ণাঙ্গ নাম, বাবা-মায়ের নাম, ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স, ই-মেইল (যদি থাকে) উল্লেখ করতে হবে, কোনো কোর্ট ফি/রাজস্ব স্ট্যাম্প লাগবে না। কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হলে ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করা যাবে।

‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ লঙ্ঘনের জন্য বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। ধারা ৩৭: কোনো ব্যক্তি মোড়কাবদ্ধভাবে পণ্যের মোড়কের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহার-বিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে থাকলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধারা ৩৮: কোনো ব্যক্তি যদি কোনো আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করে তার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোনো স্থানে পণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করে, তাহলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধারা ৪০: কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধির অধীনে নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধারা ৪১: কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে ভেজালমিশ্রিত পণ্য বা ওষুধ বিক্রি করলে বা প্রস্তাব করলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ধারা ৪২: মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সঙ্গে যার মিশ্রণ কোনো আইন বা বিধির অধীনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি উক্ত দ্রব্য কোনো খাদ্যপণ্যের সাথে মিশ্রিত করলে, তিনি অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

ভোক্তা অধিকার একটি সর্বজনীন অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কর্মকর্তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন। এখন ফলের মৌসুমে তাদের তৎপরতা আরও বেড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিতভাবে বাজার মনিটরিং করছে। অসাধু বিক্রেতাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। আইনের কঠোর বাস্তবায়ন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সুফল বয়ে আনছে।

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ভোক্তারও কিছু দায়িত্ব আছে। ভোক্তাকে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে জানতে হবে। যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত পণ্য বা সেবা সঠিক মূল্যে ক্রয় করতে হবে। ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়নে সোচ্চার হতে হবে। বাজার অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের শাস্তির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতের মাধ্যমেই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তাবিধান সম্ভব হবে।

পিআইডি নিবন্ধ


সর্বশেষ..