সম্পাদকীয়

ভোজ্যতেলের বাজারে সয়াবিনের প্রায় মনোপলি

 

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘সয়াবিন তেলের ব্যবহার ছয় বছরে দ্বিগুণ’ শীর্ষক খবরটি এরই মধ্যে অনেক পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদনটির ভিত্তি সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘কমোডিটি মার্কেট আউটলুক’ শিরোনামের গবেষণা। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি দশকে ভোজ্যতেল কী পরিমাণ ব্যবহার হয়েছে ও হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন দেখা যাচ্ছে, স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ১৯৭০-৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলার অধিবাসীরা সয়াবিন তেল ব্যবহার করেছে মাত্র ৫২ হাজার টন। ১৯৮০-৮১ সালে পরিমাণটি আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৮ হাজার টনে। তবে এরপর থেকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে সয়াবিনের ব্যবহার বৃদ্ধি লক্ষণীয়। খেয়াল করার মতো বিষয়, ১৯৯০-৯১ সালে দুই লাখ ৩৫ হাজার টন সয়াবিন তেল ব্যবহার হয়েছে বাংলাদেশে। তবে স্থানীয় বাজারে সয়াবিন তেলের ঐতিহাসিক ভূমিকা পর্যালোচনা এ সম্পাদকীয় লেখার উদ্দেশ্য নয়। স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় সাম্প্রতিক সময়ে ভোক্তাদের মধ্যে সয়াবিন পরিভোগের উত্তরোত্তর বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করে আমরা উদ্বিগ্ন। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে সয়াবিন পরিভোগ হয়েছে আনুমানিক তিন লাখ ৮৮ হাজার টন। অথচ এর ঠিক ছয় বছর পর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এটি ব্যবহারের পরিমাণ কমপক্ষে সাত লাখ ১৯ হাজার টন অর্থাৎ ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পূর্বাভাসে বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সয়াবিনের বাড়তি ব্যবহার অব্যাহত থাকতে পারে; সামগ্রিক পরিমাণ আট লাখ ২৮ টন হতে পারে বলে প্রাক্কলন। স্পষ্টত এক্ষেত্রে এক বছরে সয়াবিন তেলের ব্যবহার বৃদ্ধি মোটামুটি এক হাজার টন!

খাবার সুস্বাদুকরণে ভোজ্যতেলের অনস্বীকার্য ভূমিকা সত্ত্বেও সয়াবিন নিয়ে প্রথম দুশ্চিন্তা প্রধানত স্বাস্থ্যগত কারণে, যদিও ভোজ্যতেল ছাড়া সহজে পুষ্টিগ্রহণ কঠিন এবং ইদানীং সয়াবিনের সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান সংযুক্তির প্রক্রিয়াটি চলমান। আমাদের দ্বিতীয় ভাবনা, সয়াবিন তেলের চাহিদার সিংহভাগই মেটাতে হয় আমদানির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে সয়াবিন আমদানি বৃদ্ধি মানেই দেশের জাতীয় ব্যয় বৃদ্ধি। এ অবস্থায় ভালো হতো সয়াবিনের বিকল্প অন্য যেসব ভোজ্যতেল বাজারে ছিল, সেগুলোর ব্যবহার বাড়ানো গেলে। সরিষার তেল দেশে একসময়কার জনপ্রিয় ভোজ্যতেল। তবে রান্নায় বিশেষ কয়েকটি অসুবিধার কারণে এর ব্যবহার ক্রমহ্রাসমান বলে প্রতীয়মান। উপরন্তু সরিষার তেলের ব্যবহার যেভাবে সীমাবদ্ধ ও সংকুচিত হয়ে পড়ছে, তাতে করে সয়াবিনকে প্রতিস্থাপন এর পক্ষে অসম্ভব বলে ধারণা। বিকল্প হিসেবে তেমন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি পাম অয়েলও। তবে এক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল ও আছে রাইস ব্রান অয়েলের; যদিও যথাযথ প্রচারের অভাব ও গুজবের সম্প্রসারণে এর বাজার সেভাবে বিকশিত হতে পারছে না বলে মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ও সার্বিক বিবেচনায় সয়াবিনের ব্যবহার কমানো প্রয়োজন। বলা দরকার, বাসাবাড়িতে সয়াবিনের ব্যবহার মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিশেষত হোটেল-রেস্তোরাঁ ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে সয়াবিন তেলের অবাধ ব্যবহার হয় বলে অভিযোগ ওঠে মাঝেমধ্যে। আইনি নজরদারির মাধ্যমে একে প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে ব্যবহারকারীরা সচেতন হলে কাজটি সহজ। ফলে সচেতনতা বাড়িয়ে, বিকল্প ভোজ্যতেল সামনে এগিয়ে দিয়েই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সয়াবিন তেলের ব্যবহার। লক্ষণীয়, ব্যবহারগত দিক থেকে সয়াবিনের ‘প্রায় মনোপলি’র জন্যই সরবরাহকারীদের মধ্যে এক ধরনের অলিগোপলি গড়ে উঠেছে বলে কারো কারো অভিমত। ফলে ভোক্তাদের মধ্যে সয়াবিন ব্যবহারের একমুখী ও তীব্র প্রবণতাটি ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়া আবশ্যক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..