মত-বিশ্লেষণ

ভোটের মর্যাদা রক্ষায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন

মাহমুদুল হক আনসারী: নাগরিকের জন্য ভোট একটি উৎসব হিসেবে দেখে আসছি। ভোট অর্থ মতামত প্রদান করা। আমাদের দেশে পাঁচ বছর অন্তর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসব নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি প্রার্থী হন। প্রার্থীদের যোগ্যতা সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করা হয়। এজন্য স্বাধীন নির্বাচন কমিশন দেশব্যাপী তাদের শাখা-প্রশাখার মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রম তদারক করেন। প্রার্থীর যোগ্যতা ও অযোগ্যতা দেখা হয়। প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা তদারকি করা হয়। বৈধ-অবৈধ গোপনীয় আয় ও ব্যয় নির্ণয় করা হয়। প্রার্থী কতটুকু যোগ্য ও অযোগ্য ডকুমেন্টারিভাবে দেখভাল করেন নির্বাচন কমিশন। এসবের পর প্রার্থী কতটুকু জনবান্ধব, জনদরদি, সমাজ কর্মী ও মানবদরদি কি না, বিবেচনা করেন স্থানীয় জনগণ। প্রার্থী আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশনের শর্ত পূরণ করে সব ঠিকটাক হলে সে ক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। নির্বাচনী যুদ্ধ সেটা একটা মহাসংগ্রাম। সে সংগ্রামে প্রার্থীকে ভোটারের ঘরে ঘরে পাড়ায় মহল্লায় মসজিদ, মন্দির, গির্জা, স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে প্রার্থীকে গণসংযোগে অবিরাম নির্ঘুম পরিশ্রম করতে হয়। এসব তৎপরতায় প্রার্থী ভোটারের মন জয় করতে পারলে সেখানে প্রার্থীর ভোটের বিজয় আশা করা হতো। দুই যুগ আগেও আমাদের দেশে ভোটের সে আমেজ আনন্দ-উৎসব লক্ষ্য করেছি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে প্রার্থী ভোটার উভয়ের মধ্যে একটা ভোট উৎসব লক্ষ করা যেত। প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়ের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ ভালোবাসার সম্পর্ক দেখা যেত। একে অপরের বিরুদ্ধে তেমনভাবে বিষোদগার ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেখা কম যেত। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সবারই তাদের উদ্দেশ্যÑআদর্শ কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে উপস্থাপন করত। এসব ছিল ভোট আনন্দ। মানুষের আনন্দ মিছিল, ভোট প্রার্থনার মিছিল এক ধরনের ভোটারের আনন্দ আর উৎসবে মেতে উঠত। ভোটাররা তাদের মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করার জন্য দলে দলে কেন্দ্রে যেতে দেখা যেত। রিকশা, ভ্যানগাড়ি, হেঁটে অনেক দূরে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে আসত। বয়োবৃদ্ধ মানুষগুলোকেও এ আনন্দে দেখা যেত। এক ঐতিহাসিক সে ভোটের উৎসব আবহমান বাংলার স্মৃতি ছিল। ভোটের দিন যেরূপ আনন্দ-উৎসব ছিল নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর বিজয় উৎসব আরও আনন্দের হয়ে উঠত। ভোট শেষ হওয়ার পর বিজয় প্রার্থীকে ঘোষণার পর সে আরেক আনন্দ। মিষ্টি খাওয়া, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভোটারদের আনন্দ-উৎসব পালন করতে দেখা যেত। কোথায় গেল সে আনন্দ, সে উৎসব, সেটা এখন আর চোখে পড়ে না। কয়েক বছর আগে কিছু কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোট ছিনতাইয়ের চিত্র দেখা গেলেও, ভোট ডাকাতি, বাক্স ছিনতাই তেমন চোখে পড়ত না। সেদিনের নির্বাচন আমেজ আনন্দ ভোটার জনগণ উৎসব হিসেবে গ্রহণ করত। বিজয়ী প্রার্থী ভোটারের ভোট-পরবর্তী সময়ে ঘরে ঘরে গিয়ে কৌশল বিনিময় করত। মাত্র কয়েক বছরের মাথায় সে আমেজ এখন ভোটের কার্যক্রমে দেখা মিলছে না। ভোট এখন পেশিশক্তি ঐশী ষড়যন্ত্রে আবদ্ধ হয়ে গেছে। এখন আর ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে খুব কমসংখ্যক নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেখা যায়। জনমুখে শোনা যায়, ভোট নাকি আগেভাগে দেওয়া হয়ে যায়। ভোট কার্যক্রমে অংশ নেওয়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আগের দিনে উৎসাহ-উদ্দীপনা কার্যক্রমে অংশ নিত। এখন দেখি তারা ভয়-ভীতি আর উৎকণ্ঠার মধ্যে শুধু দায়িত্ব পালনের কারণে অবস্থান করে। অনেক পোলিং অফিসার ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আশঙ্কার মধ্যে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। কোনো কোনো সময় কেন্দ্রে তাদের জীবনও হুমকির মধ্যে পড়ে। এসব আশঙ্কা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কিছু প্রার্থী ও তার সমর্থকের কাছে ওইসব অফিসার জিম্মি হয়ে পড়ে। এটা কিন্তু গণতন্ত্র জনতন্ত্রের জন্য মোটেও কাম্য নয়। ভোট নাগরিক অধিকার। সাংবিধানিক প্রাপ্য। নাগরিক ভোট সংস্কৃতি ও অধিকারে অংশগ্রহণ করবে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট কার্যক্রমে অংশ নেবে সেটাই হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। ভোট যার যার মতো করে দেবে, সেটাই ছিল ভোটের উদ্দেশ্য এবং গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু বাংলাদেশে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সে ভোটের রাজনীতি ও গণতন্ত্র এখন হুমকির মুখে। ভোট রাজনীতি গণতন্ত্র এটা এদেশের মানুষের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের সঙ্গে ভোটের অধিকার নাগরিকদের নৈতিক অধিকার। এ অধিকার খর্ব হওয়া অথবা কোনো পক্ষ সে অধিকার ধ্বংস করা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। জাতি এ ধরনের কর্মকাণ্ড অনৈতিক ভোট সংস্কৃতি কামনা করে না। কয়েক বছরের ব্যবধানে ভোটের এ পরিবেশের যথেষ্টভাবে আলোচনা-সমালোচনা জনমুখে শোনা যাচ্ছে। জনগণের বক্তব্য আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। সে সংস্কৃতি মতামত ব্যক্ত করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন ভোটাররা। সেটা জাতির জন্য অমঙ্গলজনক। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে গণতন্ত্র আর জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রাপ্তির জন্য। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব। জনগণকে ভোটবিমুখ করা অথবা হয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি করা কোনো অবস্থায় গণতান্ত্রিক দেশে মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে কয়েকটি সিটি নির্বাচন উপনির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছি। দেশি-বিদেশি বহু সংগঠন এসব নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ছিল। দেখা গেছে, সেখানে ভিন্ন মতের প্রার্থী ও ভোটারের নির্বাচনী কার্যক্রমে বাধা দেওয়া হয়েছে। ভিন্নমতের প্রার্থীদের গণসংযোগ ও ভোট প্রদানে ভয়ভীতি ও বাধা প্রদান করার সংবাদ বহু সংবাদমাধ্যমে প্রচার হয়েছে।

এ ধরনের গণতন্ত্র আর ভোটযুদ্ধ ভোট সংস্কৃতির জন্য কোনো অবস্থায় কাম্য নয়। ভোট আমার নাগরিক দায়িত্ব। দেশ ও জনগণের কল্যাণে প্রার্থী ও ভোটার ভোট আনন্দে অংশগ্রহণ করবে। ভোটযুদ্ধে নির্বাচিত হওয়া সেটা ব্যক্তি বিশেষের কল্যাণে নয়। সামগ্রিকভাবে দেশ ও জাতির কল্যাণে একজন বিজয়ী প্রার্থী কাজ করবে সেটাই নাগরিক প্রত্যাশা। জাতীয়ভাবে যে দলের প্রার্থী বিজয়ী হোক না কেন সে জনগণের কল্যাণে কাজ করবে সেটাই রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য। কিন্তু এখন যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠান হচ্ছে, সেখানে কতটুকু সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন হচ্ছে সেটা গোটা জাতি অবগত আছে। বক্তব্য হচ্ছে, নাগরিককে তার ভোট দেওয়ার পরিবেশ দিতে হবে। যার ভোট তাকে দেওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। জনগণের সাংবিধানিক এ অধিকার কেন সাধারণ মানুষ পাবে না, সেখানেই জনগণের অসংখ্য উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। সামনে আরও অনেকগুলো স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভোটের আনন্দ আমেজ উৎসব ফিরিয়ে দিতে হবে। পেশিশক্তি অদৃশ্য শক্তি থেকে ভোট সংস্কৃতিকে মুক্ত করতে হবে। ভোটের অধিকার ভোটারের হাতে ফেরাতে চাই। সে লক্ষ্যে সরকার প্রশাসন রাজনৈতিক সামাজিক সব প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। রক্ষা করতে হবে গণতন্ত্রকে। বাঁচাতে হবে ভোট ও ভোটারদের। পেশিশক্তি অদৃশ্য শক্তি থেকে ভোট ও ভোটারদের রক্ষায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকা চায়।

সংগঠক, গবেষক, কলামিষ্ট

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..