আনোয়ার হোসাইন সোহেল : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট দিতে পারছেন না ওষুধ কোম্পানিগুলোর ১৫ লাখ বিক্রয় প্রতিনিধি। জানা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলেও এসব বিক্রয় প্রতিনিধির অধিকাংশই ভোটের দিন থাকতে হবে কর্মস্থলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোম্পানির পক্ষ থেকে লিখিত কোনো ছুটির আদেশ না থাকায় অনেককেই বাধ্য হয়ে ঢাকায় থাকতে হচ্ছে। যে কারণে দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থাকলেও এসব কর্মীরা ভোট দিতে পারছেন না। তাছাড়া কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির ছুটি মাত্র এক দিন হওয়ায় তাদের কর্মীদের পক্ষে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ভোট দিয়ে আবার ঢাকা এসে ডিউটি করা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতির জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিক্রয় প্রতিনিধিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
বেক্সিমকো ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি রূপক নাম সালমান সাদ সনি শেয়ার বিজকে বলেন, বেক্সিমকো ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির চাকরি করে মনে হয় একটা পাপ করেছি। তারা এই উৎসব মুখোর পরিস্থিতিতেও আমাদের কোনো ছুটি দিচ্ছে না। আগামীকালও অর্ডার কাটতে হবে। তাহলে বৃহস্পতিবার ওই মাল ডেলিভারি হবে, তাহলে কোনো উপায়েই গ্রামের বাড়ি গিয়ে ভোট দিয়ে আমার এসে ডিউটি ধরা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মালিকরা শুধু মুনাফার হিসাব করেন। তাদের কাছে আমাদের ভোটাধিকারের বিন্দুমাত্র মূল্য নেই।
গাইবান্ধার আব্দুল লতিফ বলেন, ঢাকা থেকে আমাদের অফিস থেকে যারা ভোট দিতে যাবেন, তাদের অন্যূনতম তিন থেকে চার দিনের প্রস্তুতি নিতে হয়। আসা-যাওয়ায় দুদিন চলে যায়। মাঝের দু-এক দিনের জন্য বাড়ি গেলে পরিবারকে সময় দেওয়া যায় না। তাই আপাতত বাড়ি যেতে পারছি না।
পপুলার ফার্মার একজন কর্মী বলেন, কোম্পানির অবাধ্য হয়ে হয়তো আমরা বাড়ি গিয়ে ভোট দিয়ে আসতে পারতাম। তবে আমার কাছে একটি ভোট দেওয়া আমার চাকরি চাইতে বড় নয়। তিনি আরও বলেন, বিগত নির্বাচনগুলোয় আমরা ভোট দিতে পারিনি। এখনো সেই সুযোগ পাওয়ার পরও আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছি না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তীব্র গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনে হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার অনেকগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ওষুধ খাতে কর্মরত কর্মীদের সঙ্গে চলে আসা বৈষম্য দূর করার বিষয়ে কেউ কথা বলেন না। ওষুধ খাতের বিক্রয় প্রতিনিধিরা যেন একেকজন শিক্ষিত দাস। এখানে মালিকপক্ষের ইচ্ছাই শেষ কথা; এখানে কোনো আইনের তোয়াক্কা করা হয় না।
এদিকে ফার্মাসিউটিক্যাল রিপেজেন্টেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের (ফারিয়া) নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনেকে এখনো ছুটি দেয়নি। কেউ ছুটি দিলেও মাত্র এক দিনের জন্য ছুটি দিয়েছে। আবার কোনো কোনো কোম্পানি তিন দিনের জন্য ছুটি দিয়েছে। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১১ ও ১২ তারিখ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে।
ফার্মাসিউটিক্যাল রিপেজেন্টেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের (ফারিয়া) ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছেÑ‘একটি ভোটের জন্য এদেশের মুক্তিকামী জনতা দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর সংগ্রাম করেছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। জনগণ যেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেজন্য সরকার এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। গার্মেন্ট সেক্টরে এরই মধ্যে চার দিন ছুটি ঘোষণা করেছে। অথচ ওষুধ সেক্টরে কর্মরত ১৫ লাখ মানুষ এখনো পুরোপুরি ভোট প্রদানের নিশ্চয়তা পায়নি। সারা বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ফারিয়া’র দিকে তাকিয়ে আছে। এটা লজ্জাজনক। আমরা আবারও বলছি, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিকে নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় ফারিয়া অবশ্যই কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেই।’
এ বিষয়ে ফারিয়ার অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তিনি জন্ডিশে আক্রান্ত, রেস্টে আছেন। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে অ্যাডমিন বলেন, তিনি রেকর্ডিং বক্তব্য পাঠাচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি বক্তব্য পাঠালেও তা কয়েক সেকেন্ড পরে তিনি নিজেই মুছে ফেলেন।
এ বিষয়ে ওষুধ প্রশাসনের পরিচালক ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মো. আসরাফ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার ইতোমধ্যে দুদিনের ছুটি ঘোষণা করেছে। ওষুধ কোম্পানিগুলোর কর্মীদের ছুটির না দেওয়ার বিষয়টি শ্রম মন্ত্রণালয় দেখে। এ বিষয়টি ওষুধ প্রশাসনের নয়।’
এ নিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার একান্ত সচিব (উপসচিব) মো. জাহিদুল ইসলামকেও তার মুঠোফোনে কল করা হলেও তাকেও পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যার কোম্পানিতে লিখিত কোনো ছুটি নেই। ওরিয়ন ফার্মারও লিখিত কোনো ছুটি নেই। তবে স্কয়ার, রেনেটা, নাভানা, একমি, এসআইসহ বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত ছুটি দেওয়া হয়েছে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post