মত-বিশ্লেষণ

ভ্যাকসিন দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা

বিশ্ব আজ করোনা নামক এক অদৃশ্য শক্তির হাতে বন্দি। উন্নত থেকে অনুন্নত রাষ্ট্র সব স্থানেই চলছে তার রাজত্ব। গত ডিসেম্বরে আত্মপ্রকাশের পর তার তাণ্ডবের আজ প্রায় আট মাস হতে চলল। স্থায়িত্বের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সব মহামারিকে এরই মধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছে। প্রতি দিনই আক্রান্তের সংখ্যা লাখের কোঠা অতিক্রম করছে। মৃতের সংখ্যাও নেহায়াত কম নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব খুবই ভয়াবহ। অন্যান্য দেশের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে কিছু কম হলেও আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার দিক দিয়ে ক্রমেই সামনের দিকে চলে যাচ্ছে। আর আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন চলে যাচ্ছে প্রায় অর্ধশত মানুষ।

বিশেষজ্ঞের মতে, এসব মহামারি থেকে বাঁচতে দুটি পথ অবলম্বন করতে হয়। প্রথমত, জনগোষ্ঠীর হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা; দ্বিতীয়ত, ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা। যেহেতু এই ভাইরাসের মৃত্যুর হার বেশি, তাই প্রতিরোধের একমাত্র রাস্তা হলো ভ্যাকসিনের ওপর ভরসা করা। তাই মহামারির শুরু থেকেই আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মহাযজ্ঞ চলছে। সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ পৃথিবীর প্রায় ১৪০টি প্রতিষ্ঠান এর জন্য নিরলসভাবে খেটে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৩টি প্রতিষ্ঠান ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যেতে সমর্থ হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রসর ভূমিকায় আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না নামক প্রতিষ্ঠান। আমাদের দেশের শুধু একটি প্রতিষ্ঠান আবিষ্কারের পথে আছে। সৃষ্টিকর্তার রহমতে যদি তা সফল হয়, তাহলে তা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের বিষয়। কিন্তু গত ৮ এপ্রিল আামাদের ভ্যাকসিনের কাজ শুরু হওয়ায় এই ভ্যাকসিন পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হতে পারে আরও কয়েক মাস। এমনকি অপেক্ষার প্রহর হতে পারে অনির্দিষ্ট দিন।

আমাদের বিকল্প পদ্ধতি, অর্থাৎ অন্যান্য দেশের ভ্যাকসিনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে ব্রাজিলের ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় গত এপ্রিল মাসে ৫০০ আক্রান্ত অংশগ্রহণকারীর মধ্যে তাদের প্রথম স্তরের টেস্টটি করতে সক্ষম হয়েছিল। তার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয় বানরের ওপর ভ্যাকসিনের পরীক্ষায় সফলতা লাভ করে। সবকিছু ঠিক থাকলে আশা করা যায়, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার যৌথ উদ্যোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না অতি দ্রুতই পৃথিবীর জন্য একটি সুসংবাদ নিয়ে আসতে পারে। তার জন্য আর খুব বেশি বিলম্ব করতে হবে না। এ বছরের শেষের দিকেই এই শুভ সংবাদটি পৃথিবীর মানুষকে অনেক বড় প্রশান্তির জায়গা উপহার দিতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানি ব্রাজিলের সঙ্গে ভ্যাকসিনটি প্রস্তুত করার লক্ষ্যে ১২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি সম্পাদন করেছে। ব্রাজিলের স্বাস্থ্য বিভাগ ঘোষণা দিয়ে রেখেছে, তারা মোট ৩০ মিলিয়ন ভ্যাকসিন স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করবে, যার অর্ধেক হবে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এবং বাকি অর্ধেক হবে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার তিনটি ওষুধ কোম্পানিকে তাদের তৃতীয় স্তরের পরীক্ষা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে অনুদানের জন্য নির্বাচিত করেছে। তারা এই মাসে অনুদান প্রদান করবে মডার্নাকে, আগস্ট মাসে করবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকাকে এবং সেপ্টেম্বরে করবে ফাইজার নামক আরেক কোম্পানিকে। এদিকে চীনের ভ্যাকসিনটি এদেশে ট্রায়ালের কথা থাকলেও কূটনৈতিক জটিলতায় তা সম্ভবপর হচ্ছে না। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা ভ্যাকসিন পাওয়ার দৌড়ে পেছনে পড়ে যাচ্ছি, যদিও বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় যার প্রয়োজনীয়তা আমাদের জন্য আবশ্যক। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হওয়ায় আমাদের অর্থনীতি এখনও উচ্চস্তরে গিয়ে পৌঁছায়নি। শিক্ষার হার তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সচেতনতার বড় অভাব। গ্রামের মানুষেরা এখনও করোনাভাইরাসের বিষয়ে অজ্ঞ। সাধারণ মাস্কের বিষয়টিকেও তারা মূল্যায়ন করতে শেখেনি। শহরের কর্মব্যস্ততার কারণে এখানেও সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কোনো সুযোগ নেই। আর আমাদের স্বাস্থ্য খাতও প্রতিনিয়ত রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছে। আর এতেই প্রতীয়মান হয় সামনে আমরা কী ধরনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়ার ঝুঁকিতে আছি। তাই সব সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন অতি দ্রুত ভ্যাকসিনের পেছনে ছোটা। আবিষ্কারের পরপরই যেন বাংলাদেশ তা হাতে পায়, সেজন্য এখন থেকেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের দাবি। তাই প্রশাসনের কাছে এই বিষয়টি বিবেচনার জন্য বিনীত দাবি জানাচ্ছি।

আফসারুল আলম মামুন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..