প্রচ্ছদ শেষ পাতা

‘ভ্যাট আদায়ে কঠোর হলে হয়রানির প্রশ্ন যেন না ওঠে’

এনবিআর চেয়ারম্যান

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘ভ্যাট আদায়ে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ভ্যাট আদায়ে প্রাথমিক পর্যায়ে অনুরোধ করা হবে, পরে আইন প্রয়োগ করা হবে। তবে সে সময় ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো দিক থেকে যেন হয়রানির কথা না ওঠে।’ এ মন্তব্য করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

গতকাল এনবিআর সম্মেলন কক্ষে জাতীয় ভ্যাট সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর সদস্য (মূসক নীতি) ড. আবদুল মান্নান শিকদার, সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) মো. জামাল হোসেন, কমিশনার (শুল্ক মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট) ড. একেএম নুরুজ্জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ব্যবসায়ীদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসায়ী তো নিজে ভ্যাট দেয় না। ভোক্তা থেকে আদায় করে জমা দিচ্ছে। কর্মকর্তাদের এ ভ্যাট যথাযথভাবে আদায় নিশ্চিত করতে হবে। আইন বাস্তবায়িত হয়েছে, কয়েক মাস আমরা দেখেছি। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে অনুরোধ করব। পরবর্তী পর্যায়ে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে। আইন প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের সময় কোনো দিক থেকে যেন কথা না ওঠে আমরা হয়রানি করছি।

রাজস্ব আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, অক্টোবর পর্যন্ত ৬৫ হাজার ৯৬ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কম। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে চার শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। জুলাই মাসে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১১ শতাংশ ছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। চার মাসে কাস্টমসে চার শতাংশ, ভ্যাটে আট দশমিক ৬৬ শতাংশ ও আয়করে ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রাজস্ব আদায়ে একবারে চূড়ায় উঠতে না পারলেও আশার বাণী শুনাতে পারি।

ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি বাড়বে বলে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, ভ্যাটের আহরণ বাড়ছে। আগামী মাসে ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ হবে। সিগারেটে আট হাজার কোটি রাজস্ব আদায় হয়েছে। সিগারেটে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করার ফলে আদায় বাড়ছে। এছাড়া গ্যাসের কারণে রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন এক লাখ ১২ হাজার ছাড়িয়েছে। রিটার্ন পড়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার। রেজিস্ট্রেশন প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

রাজস্ব ঘাটতি বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতিতে ধীরগতি রয়েছে। আমদানি-রফদতানি প্রবৃদ্ধি গত বছরের তুলনায় একটু কম। প্রবৃদ্ধি নেগেটিভ থাকার কারণে রাজস্ব আহরণে কিছুটা শ্লথ গতি আছে। বিভিন্ন ফিসকেল ইনসেনটিভের কারণে প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাবে, অর্থনীতিতে ভালো গতির সঞ্চার হবে। আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রার যথেষ্ট রিজার্ভ রয়েছে। ব্যাংক খাতে তারল্য সংকটও নেই। ঝুঁকির কারণে নতুন উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিদেশি বিনিয়োগ আগের তুলনায় বাড়বে।

চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই লাখ দুই হাজার ৩১৩ কোটি টাকার রাজস্ব আহরিত হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে এসেছে ৭৮ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্বের ৩৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছর লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ১৭ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, যা মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার ৩৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। ভ্যাট থেকে লক্ষ্যমাত্রা বেশি হলেও আয়কর থেকে আমরা বেশি প্রত্যাশা করি। গত অর্থবছর আয়কর থেকে এসেছে ৩৩ শতাংশ, সেটিকে ক্রমান্বয়ে আমরা ৪০ শতাংশে নিয়ে যেতে চাই। চলতি অর্থবছর ভ্যাটের আহরণ আয়করের চেয়ে বেশি হবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে ভ্যাটের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। রড, স্টিলসহ কয়েকটি পণ্যে মানুষের কথা চিন্তা করে এবং ভ্যাটের বিষয়ে ভীতি যেন তৈরি না হয়, সেজন্য ভ্যাটের হার ফিক্সড করে দেওয়া হয়েছে। এত কিছুর পরও যদি ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি না হয় তাহলে তা হবে খুবই দুঃখজনক। ব্যবসায়ীদের যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভ্যাটে জুলাই-আগস্টে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি থাকলেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ডিসেম্বরে ইএফডি মেশিন স্থাপন করা হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এ মাসে ব্যবসায়ীদের হাতে ইএফডি মেশিন তুলে দেওয়া হবে। প্রথমে ১০ হাজার মেশিন দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছরের মধ্যে চাহিদার ৫০ শতাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ মেশিন স্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, মোট ভ্যাটের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভ্যাট আসে বড় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। ট্রেড ভ্যাটের পরিমাণ অনেক কম। গত বছর ট্রেড ভ্যাট থেকে এসেছে তিন শতাংশ ভ্যাট। তবে নতুন মেশিন সংযোজনের কারণে ভ্যাট আহরণে স্বচ্ছতা আসবে। নতুন মেশিন স্থাপন করা হলে ট্রেড ভ্যাটের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ শতাংশে আমরা উন্নীত করতে পারব। ভ্যাটের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতার চেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর আমাদের নির্ভরতা বেশি।

তিনি আরও বলেন, ৯ মাস আগে মেশিন ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে মেশিন কেনা হচ্ছে। জয়েন্ট ভেঞ্চারে ১০ হাজার মেশিন আসছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। দু-এক দিনের মধ্যে মেশিন পাব। ১০ হাজার মেশিন বসানোর পর সাকসেসফুল হলে ৯০ হাজার তারা দেবে। পর্যায়ক্রমে যত প্রয়োজন হবে ব্যবসায়ীদের মেশিন দেওয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে মেশিন স্থাপন শুরু হবে। প্রতিটি মেশিনের মূল্য পড়বে ১৭ হাজার টাকা। সফটওয়্যার বিনা মূল্যে দেওয়া হলেও মেশিনের মূল্য হিসেবে পর্যায়ক্রমে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাভ ছাড়া এ টাকা নেওয়া হবে।

চলতি অর্থবছরের রিটার্নের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, করদাতার সংখ্যা বাড়াতে জরিপ করা হচ্ছে। গত অর্থবছর ২২ লাখ রিটার্ন দাখিল হয়েছে। এবার দুই লাখ রিটার্ন বেড়েছে। এছাড়া জানুয়ারিতে প্রায় ৫০ হাজার কোম্পানি করদাতা রিটার্ন দাখিল করবে। বর্তমানে ৪৬ লাখ ই-টিআইএনধারী রয়েছেন। কমিশনারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে যত ই-টিআইএনধারী রয়েছেন, যারা রিটার্ন দাখিল করেননি, প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে তাদের রিটার্ন দাখিল ও কর আদায়ে বাধ্য করা হবে। কমিশনাররা কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন এনবিআর হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় বাধা এমন প্রশ্নে চেয়ারম্যান বলেন, তিনি এটা কেন বলেছেন, তার আমি কোনো ব্যাখ্যা পাই না। বাজেটে তাদের মতামত নেওয়া হয়। দেশীয় শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য যত আমদানি ভোগ্যপণ্য রয়েছে তার ওপর বেশি করারোপ করা হয়েছে। আমরা এখনও কাস্টমস থেকে মোট রাজস্বের ২৮ শতাংশ আহরণ করি, যা পৃথিবীর কোনো দেশ করে না। দেশের ব্যবসায়ীদের সহায়তা করার জন্য কাস্টমস ডিউটি আদায় করা হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানিতে পাঁচ শতাংশ ও মেশিনারিজ আমদানিতে এক শতাংশ শুল্ক আদায় করা হয়। এছাড়া অন্যান্য কাঁচামাল আমদানিতে সুবিধা প্রদান, রফতানিতে সবচেয়ে কম ট্যাক্স আদায় হয়, যা পৃথিবীর কোথাও নেই। ভিয়েতনাম ও ভারতের চেয়ে কোনো অংশে ব্যবসায়ীদের কম সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না, বরং বেশি দেওয়া হচ্ছে। সরকার সুবিধা না দিলে কীভাবে ব্যবসা করে? সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব তো দিতেই হবে। এর পরও কেন ব্যবসায়ীরা এসব বলছেন, তা চিন্তা করা যায় না।

ভ্যাট দিবস বিষয়ে তিনি বলেন, ১০-১৫ ডিসেম্বর ভ্যাট সপ্তাহ পালন করা হবে। সর্বোচ্চ ভ্যাটদাতাদের সম্মাননা দেওয়া হবে। এবার ভ্যাট দিবসে ভ্যাট সচেতনতায় একটি নাটক তৈরি করা হয়েছে, যা ভ্যাট সপ্তাহে প্রচারিত হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..