দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ভ্যাট না দিলে আটকে যাবে রবির স্পেকট্রাম নবায়ন!

এয়ারটেলের স্পেকট্রাম ব্যবহার

রহমত রহমান: এয়ারটেলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর রবি। একীভূত হওয়ার পর থেকে এয়ারটেলের জন্য বরাদ্দ করা স্পেকট্রাম ব্যবহার করছে রবি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়। এর বিপরীতে রবিকে চার্জ পরিশোধ করতে হয়, যার ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে ভ্যাট রয়েছে। রবি থেকে বিটিআরসি স্পেকট্রাম সেবামূল্য আদায় করলেও ভ্যাট আদায় করেনি। বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন নেই, এমন অজুহাতে রবিও সেই ভ্যাট পরিশোধ করেনি।

যদিও এনবিআর বলছে, উৎসে কর্তনকারী সত্তা হিসাবে বিটিআরসি ভ্যাট আদায় করতে পারবে। তবুও আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে অপারেটরগুলো ভ্যাট পরিশোধ করছে না। আগামী ১৯ ডিসেম্বর রবির স্পেকট্রামের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। স্পেকট্রাম নবায়নে রবির বিটিআরসিকে দিতে হবে ৩৬ কোটি ডলার, যাতে প্রযোজ্য ভ্যাট পাঁচ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ৪৫৯ কোটি টাকা। এ ভ্যাট পরিশোধ ছাড়া কোনোভাবেই স্পেকট্রাম নবায়নের সুযোগ না দিতে বিটিআরসিকে চিঠি দিয়েছে এনবিআর।

৫ অক্টোবর এনবিআরের আওতাধীন বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) মূল্য সংযোজন কর কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে এ চিঠি দেন।

এনবিআর সূত্র জানায়, বিটিআরসি মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে শুধু তাদের পাওনা আদায় করবে। আর অপারেটরদের কাছ থেকে এনবিআরকে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা করতে বিটিআরসি চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি এনবিআর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়। সেই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব (মূসক আইন ও বিধি) মো. তারেক হাসানের সই করা একটি চিঠি বিটিআরসি চেয়ারম্যানকে দেওয়া হয়। সেই চিঠিতে স্পেকট্রামের বিপরীতে ভ্যাট আদায় বিষয়ে স্পষ্ট করা হয়।

এলটিইউ’র চিঠিতে বলা হয়, এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড রবি আজিয়াটা লিমিটেডের সঙ্গে মার্জার হয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে রবি আজিয়াটা লিমিটেড এয়ারটেলের জন্য বরাদ্দকৃত স্পেকট্রাম ব্যবহার করে। বিশ্বস্ত সূত্রে এলটিইউ জানতে পেরেছে, রবি ও এয়ারটেলের মার্জারের পরিপ্রেক্ষিতে এয়ারটেলের জন্য বিটিআরসি’র বরাদ্দকৃত স্পেকট্রামের ব্যবহারের মেয়াদ আগামী ১৯ ডিসেম্বর উত্তীর্ণ হবে। এ স্পেকট্রামের পূর্ণ নবায়নের পূর্বশর্ত ছিল যে, রবি বিটিআরসিকে এক্ষেত্রে মোট ৩৬০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে। এর বিপরীতে এনবিআরের পাওনা ভ্যাট দাঁড়ায় ৫৪ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৪৫৯ কোটি টাকা।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বিষয়টি নিয়ে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। চেয়ারম্যানের নির্দেশনা মোতাবেক জানানো যাচ্ছে, বিটিআরসি এর আগে এনবিআরের পাওনা আদায় না করেই নিজস্ব পাওনার অর্থ বা পরিশোধযোগ্য অর্থ জমা গ্রহণ করেছে, যা আইনানুগ ছিল না; বর্তমানে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রাপ্য রাজস্ব জমা নিশ্চিত করেই কেবল রবির পরিশোধযোগ্য অর্থ জমা গ্রহণ করা আইনানুগ। ওই রাজস্ব জমা নিশ্চিত হলেই কেবল রবিকে এয়ারটেলের জন্য বরাদ্দ করা স্পেকট্রামের ব্যবহার অনুমোদন ও সচল করা বাঞ্ছনীয়। এ বিষয়ে চিঠিতে এনবিআরের চলতি বছরের একটি আদেশ (এসআরও ১৪৯-আইন/২০২০/১১০) ও চলতি বছরের ১১ জুন জারি করা উৎসে মূল্য সংযোজন কর কর্তন ও আদায় বিধিমালার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

যাতে বলা হয়, ‘সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স প্রদান বা নবায়নকালে বা ক্ষেত্রবিশেষে কোনো সুবিধা সৃষ্টিকারী সেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের সুবিধা গ্রহণকারী ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক আদায় করবে। এছাড়া প্রদত্ত লাইসেন্স, রেজিস্ট্রেশন ও পারমিটে উল্লেখিত শর্তের আওতায় রাজস্ব বণ্টন, রয়্যালটি, কমিশন, চার্জ, ফি বা অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থের ওপর ১৫ শতাংশ হারে উৎসে মূসক আদায় করতে হবে।’

এলটিইউ’র চিঠিতে বলা হয়, আইনের বিধান অনুসরণ করে বিটিআরসি মোবাইল ফোন অপারেটরকে প্রদত্ত সেবার বিপরীতে উৎসে মূসক কর্তন না করায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অনাদায়ী রয়ে গেছে। এ রাজস্ব পরিশোধে অপারেটরগুলোকে এলটিইউ থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও তা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। অপারেটরগুলো আইনি জটিলতা সৃষ্টি করছে। যদি বিটিআরসি তাদের সেবামূল্য পরিশোধের সময় এ পাওনা রাজস্ব আদায় করত, তাহলে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না।

কমিশনার ওয়াহিদা রহমান চৌধুরীর সই করা চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে বিরাজমান কভিড-১৯-এর প্রকোপে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শতাব্দীর কঠিনতম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে দৃঢ় অবস্থানে রাখতে হলে প্রাপ্ত রাজস্ব জমা হওয়া আবশ্যক। রষ্ট্রীয় কোষাগারে এ রাজস্ব জমা নিশ্চিত করা অতিশয় জরুরি বলে রবির স্পেকট্রাম নবায়নের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ৪৫৯ কোটি টাকার ভ্যাট সঠিক সময়ে আইনানুগভাবে আদায় ও জমা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি চেয়ারম্যাকে অনুরোধ জানানো হয়।

এনবিআর সূত্র জানায়, বিটিআরসির ভ্যাট নিবন্ধন নেই এ অজুহাতে রবি, গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও এয়ারটেল বিভিন্ন সেবার বিপরীতে সেবামূল্য পরিশোধ করলেও ভ্যাট পরিশোধ করে না। এতে চারটি অপারেটরের কাছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বকেয়া হয়ে যায়। এ রাজস্ব পরিশোধে মোবাইল অপারেটরগুলোকে চিঠি দেয় এলটিইউ। একইসঙ্গে বিটিআরসিকেও চিঠি দেয়। কিন্তু বিটিআরসিকে ভ্যাট পরিশোধ করেনি কোনো অপারেটর। বিটিআরসি কেবল তাদের পাওনা আদায় করবে, এনবিআরের পাওনা এনবিআর আদায় করবেÑএ মর্মে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিটিআরসি এনবিআরকে চিঠি দেয়। তবে সব সেবার বিপরীতে উৎসে কর্তনকারী হিসেবে নিবন্ধন ছাড়াই ভ্যাট আদায় করতে পারবে বলে এনবিআর থেকে বিটিআরসিকে চিঠি দেওয়া হয়।

এলটিইউয়ের চিঠির বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান জহুরুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, এনবিআরের চিঠি পেয়েছি। নবায়নের আগেই দেখি ভ্যাট আদায়ে কী করা যায়।”

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..