প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

ভ্যাট পরিশোধে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ‘ই-পেমেন্ট’

রহমত রহমান: ভ্যাট প্রদানে ভ্যাটদাতাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ই-পেমেন্ট (ইলেকট্রনিক পেমেন্ট) সিস্টেম। বর্তমানে প্রতি মাসে ই-পেমেন্টের মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। প্রতি মাসে জমার পরিমাণ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ভ্যাট খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও ভ্যাটদাতাদের সময় সাশ্রয়ে ২০২০ সালে ই-পেমেন্ট (ইলেকট্রনিক পেমেন্ট) সিস্টেম চালু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আইভাসের সমন্বয় (ইন্টিগ্রেশন) না হওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। করদাতা ই-পেমেন্টে ভ্যাট জমা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমা নিশ্চিত করতে দ্রুত ইন্টিগ্রেশন করার মতো দিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে ই-পেমেন্টের মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে। ই-পেমেন্টে সফটওয়্যারে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও ভ্যাট পরিশোধ করা যায়। এ ছাড়া ই-পেমেন্টে যেকোনো অঙ্কের ভ্যাট পরিশোধ করা যায়। সহজ ও ঝামেলামুক্ত হওয়ায় ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

তারা আরও জানিয়েছেন, ই-পেমেন্টে পরিশোধিত ভ্যাট আইভাস সিস্টেমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান ই-পেমেন্টের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করলে তা সঙ্গে সঙ্গে আইভাস সিস্টেমে জমা হয় না। ই-পেমেন্টে কোনো প্রতিষ্ঠান ভ্যাট পরিশোধ করলে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারিতে জমা হয়। তার এক দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিজিএ কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন হিসাবরক্ষণ অফিসে জমার তথ্য কাগজ (হার্ডকপি) আসে। পরে হিসাবরক্ষণ অফিসের কর্মকর্তারা তা আইভাসে এন্ট্রি দেয়। তবে আইভাসের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি শাখার ইন্টিগ্রেশন না হওয়ায় এক দিন সময় লেগে যায়। আইভাস ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে ইন্টিগ্রেশন হলে ই-পেমেন্টে পরিশোধিত ভ্যাট সঙ্গে সঙ্গে আইভাসে যোগ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তারা। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইভাসের মধ্যে দ্রুত ইন্টিগ্রেশন করার মত দেন তারা।

এ বিষয়ে ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প পরিচালক ও ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, সিস্টেম সহজ ও সময় সাশ্রয়ী হওয়ায় জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধের পরিমাণও বাড়ছে।

ভ্যাট অনলাইন সূত্রমতে, বর্তমানে ভ্যাট নিবন্ধনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। এর মধ্যে মার্চ মাসে রিটার্ন (দাখিলপত্র) জমা দিয়েছে প্রায় দুই লাখ ৪৮ হাজার প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ভ্যাটদাতারা অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন, রিটার্ন দাখিল, ট্রেজারি জমা (ই-পেমেন্ট, এ-চালান), রিফান্ড আবেদন ও রিফান্ড গ্রহণ করতে পারেন।

এনবিআর সূত্রমতে, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই ভ্যাট পরিশোধের জন্য ২০২০ সালের ১৬ জুলাই ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর। যার মাধ্যমে অনলাইনে ভ্যাটের টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি সরকারের কোষাগারে জমা দেয়া যায়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম ই-পেমেন্ট সিস্টেম উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এ বি এম আবদুল ফাত্তাহ, ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের পরিচালক কাজী মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প এনবিআরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রণীত মূসক ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ অনলাইনভিত্তিক। এটির সফল বাস্তবায়নের জন্য ভ্যাট অনলাইন প্রকল্পের মাধ্যমে ইন্টিগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম (আইভাস) চালুর কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ১৬টি মডিউলের মধ্যে ইতোমধ্যে রেজিস্ট্রেশন, রিটার্ন ও ট্যাক্সপেয়ার অ্যাকাউন্ট মডিউলটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য মডেলগুলোও বাস্তবায়ন করা হবে।

ই-পেমেন্ট মডিউলটির কাজ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, ভ্যাটসংক্রান্ত সব কর (ভ্যাট, টার্নওভার কর, সম্পূরক শুল্ক, জরিমানা, সুদ প্রভৃতি) ই-পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করে পরিশোধ করতে পারবেন। বর্তমানে এইচএসবিসি, প্রাইম ও মিডল্যান্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ই-পেমেন্ট কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্যাংককে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। উল্লেখ্য, ১৭টি ব্যাংক এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, চালানে ভ্যাট জমা দিতে ব্যাংকে নগদ টাকা নিয়ে যেতে হয়। চেক ও পে-অর্ডার জমা দিলে ট্রেজারি চালান পেতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লেগে যায়। এ ছাড়া নগদ টাকা জমা দেয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকিও থাকে। ট্রেজারি চালানে ভ্যাট জমায় বাড়তি চার্জও দিতে হয়। এতে করদাতারা ভ্যাট অফিসে সময়মতো চালান জমা দিতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেজারি চালানের নম্বর জালিয়াতি করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার ঘটনাও ঘটে। এসব ঝামেলা থেকে করদাতাদের মুক্তি দিতে এই ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত ব্যক্তি নিজস্ব ব্যাংক হিসাব থেকে সরাসরি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্কসহ যেকোনো প্রদেয় কর সহজে, ঝুঁকিমুক্ত অবস্থায় এবং কম সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে পারবেন।

অন্যদিকে, ই-পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয় এনবিআর। ৫০ লাখ বা তার বেশি ভ্যাটের টাকা ই-পেমেন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক করতে আদেশ জারি করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তা বাধ্যতামূলক করা হয়। যাতে বলা হয়, ভ্যাট ব্যবস্থা অনলাইন নির্ভর করতে কাজ করছে এনবিআর। এরই অংশ হিসেবে নতুন ভ্যাট আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী যেকোনো একক ট্রেজারি চালানের বিপরীতে ৫০ লাখ বা তার বেশি ভ্যাট ই-পেমেন্ট বা এ-চালানের মাধ্যমে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আধুনিক ই-পেমেন্ট বা এ-চালান পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে দ্রুততম সময়ে রাজস্ব পরিশোধ করতে পারবে এবং এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমা নিশ্চিত হবে।

অন্যদিকে, আমদানি-রপ্তানি পণ্যের শুল্ককর পরিশোধে আর ব্যাংকে যেতে হবে না। ফলে ঘরে বসেই অনলাইনে পরিশোধ করা যাবে। ই-পেমেন্টের মাধ্যমে যেকোনো পরিমাণ শুল্ককর পরিশোধ করা যাবে। ১ জানুয়ারি থেকে সব কাস্টম হাউসে ই-পেমেন্ট পদ্ধতিতে শুল্ককর পরিশোধ চালু করে এনবিআর।