দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ভ্যাট ফাঁকিতে উরি ব্যাংক

রহমত রহমান: উরি ব্যাংক লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট (মূসক) ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকটির এক বছরে প্রায় তিন কোটি ৩৮ লাখ টাকার ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিভিন্ন সেবা ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে ব্যাংকটি এ ফাঁকি দিয়েছে। সম্প্রতি এ ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়। এ ভ্যাট পরিশোধে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিক দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, উরি ব্যাংক দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক, যার সদর দপ্তর সিউলে। ১৯৯৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক কমার্শিয়াল ব্যাংক অব কোরিয়া, হানিল ব্যাংক ও পিস ব্যাংক একত্র হয়ে গঠন করে হানভিট ব্যাংক। ২০০২ সাল পর্যন্ত তা এ নামেই পরিচিত ছিল। ২০০২ সালে নাম পরিবর্তন করে উরি ব্যাংক করা হয়। এ ব্যাংকটি উরি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে ১৯৯৬ সালে শাখা পরিচালনা শুরু করে ব্যাংকটি। বাংলাদেশে বর্তমানে পাঁচটি ব্রাঞ্চ ও একটি সার্ভিস সেন্টার রয়েছে উরি ব্যাংকের।

সূত্র আরও জানায়, ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এনবিআরের নির্দেশে মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ব্যাংকটি নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের সরবরাহ করা বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন, দাখিলপত্র ও দলিলাদির ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরের নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষা শেষে সুদসহ প্রায় তিন কোটি ৩৮ লাখ টাকার মূসক ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়। এ পরিহার করা মূসক আদায়ে গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকায় (উত্তর) পাঠানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ জানুয়ারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর প্রাথমিক দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়। নোটিসের জবাব দিতে ব্যাংককে ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে জবাব না দিলে মূসক আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মূসক আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ব্যাংকের বিভিন্ন সেবার ওপর ১৫ শতাংশ মূসক প্রযোজ্য। এর মধ্যে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সেবা থেকে প্রায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে। যার মধ্যে রয়েছে আমদানি-রপ্তানির বিপরীতে কমিশন, বিবিধ সেবা, ব্যাংক গ্যারান্টি, কমিশন অন ডিডি, পিও, টিসি, বিভিন্ন আদায়, ম্যানেজমেন্ট ফি, বার্ষিক সার্ভিস চার্জ, স্থায়ী সম্পদে লাভ, অ্যাকাউন্ট ক্লোজিং চার্জ। এ আয় থেকে মূসক আরোপযোগ্য আয় প্রায় ১১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ১৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য মূসক প্রায় এক কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ব্যাংকটি এ বছর সুদসহ প্রায় ৫৯ হাজার ৮৯১ টাকার মূসক পরিশোধ না করে ফাঁকি দিয়েছে। তবে ২০১৬ সালে মূসক আরোপযোগ্য আয় থেকে পুরো মূসক পরিশোধ করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যাংকটি ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দাখিলপত্র এবং বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শূন্য হার বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয়ের ক্ষেত্রে বেশ পার্থক্য রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তুলনায় দাখিলপত্রে শূন্য হার বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় কম দেখিয়ে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। তাদের ২০১৫ সালের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, শূন্য বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর দাখিলপত্রে দেখানো হয়েছে প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ টাকা। কম দেখানো হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি পাঁচ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রযোজ্য মূসক প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা। পরিহার করা এ মূসকের ওপর দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ টাকা। সুদসহ মূসক প্রায় তিন কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

আবার ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শূন্য বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় দেখিয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর দাখিলপত্রে দেখিয়েছে ১৮ কোটি সাত লাখ টাকা। দুই অর্থবছরে দুই ধরনের তথ্য থাকায় বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি দিতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয়ের হিসাব সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করে না। এক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রদর্শিত মূসকযোগ্য আয়ের তুলনায় মাসিক দাখিলপত্রে মূসক আয় কম দেখিয়ে এবং দাখিলপত্রের তুলনায় বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শূন্য বা অব্যাহতিপ্রাপ্ত আয় দেখিয়ে মূসক মোট দুই কোটি ১১ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এর ওপর দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ টাকা। সুদসহ মোট ফাঁকি তিন কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে শেয়ার বিজের পক্ষ থেকে উরি ব্যাংক লিমিটেডের বাংলাদেশ শাখার উপমহাব্যবস্থাপক নিয়াজ উদ্দিন খান ও ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ খাবিরুল হক খানকে ফোন করা হলেও তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

এদিকে উরি ব্যাংক লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় সাত কোটি ৫৮ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকির অপর একটি মামলা আপিলাত ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। যার মধ্যে মূসক প্রায় চার কোটি ১৫ লাখ ও সুদ তিন কোটি ৪৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..