প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ভ্যাট ফাঁকিতে সরকার স্টিল

রহমত রহমান: স্টিল খাতের প্রতিষ্ঠান সরকার স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে স্টিল পণ্য বিক্রি, রফতানি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ক্ষেত্রে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম) এ ফাঁকি উদ্ঘাটন করেছে। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে সরকার স্টিল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন সরকারের বক্তব্য জানতে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফাঁকির বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে এসএমএস ও ই-মেইল করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, দাবিনামা জারি হয়েছে। বিষয়টি আমরা আইনিভাবেই মোকাবিলা করব।
সূত্র জানায়, ধামরাইয়ের কালামপুরের সরকার স্টিলের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে পণ্য বিক্রি ও রফতানি এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআরের নির্দেশে ২০১৮ সালে ভ্যাট পশ্চিম কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানটি নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট পরিশোধসংক্রান্ত দলিলাদি ও বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেয়। তাদের জমা দেওয়া ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যাট হিসাব করে প্রতিবেদন দেয় নিরীক্ষা দল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী বিক্রিমূল্য ও ভ্যাট কমিশনারেটে জমা দেওয়া মাসিক দাখিলপত্রে দেখানো বিক্রিমূল্যে বিপুল পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয়ভাবে পণ্য বিক্রি ও রফতানি দুই ক্ষেত্রেই বিক্রিমূল্যের পার্থক্য রয়েছে। সে অনুযায়ী ২০১২ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিক্রি দেখানো হয়েছে (ভ্যাট বাদে) প্রায় ৯৩ কোটি টাকা, রফতানি প্রায় সাড়ে ১১ কোটি টাকা ও স্থানীয়ভাবে বিক্রি প্রায় ৪১ কোটি টাকা। কিন্তু দাখিলপত্র যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সাড়ে ৯ কোটি টাকার কম বিক্রি দেখিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। একইভাবে ২০১৩ সালে দুই কোটি ২০ লাখ, ২০১৪ সালে তিন কোটি ৪২ লাখ, ২০১৫ সালে চার কোটি ও ২০১৬ সালে পাঁচ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১১ কোটি টাকার বিক্রি কম দেখিয়ে প্রায় ১৬ কোটি ৭২ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দাখিলপত্র না পাওয়ায় বিক্রির হিসাব করা যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অডিট ফি, বিজ্ঞাপন, সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, কুরিয়ার, আপ্যায়নসহ ৪৫ খাতে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটা ও ব্যয়ের ওপর প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট এক কোটি ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৩ সালে ৪৪ লাখ, ২০১৪ সালে ৫৬ লাখ, ২০১৫ সালে ১৮ লাখ ও ২০১৬ সালে ৬১ লাখ টাকা। ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট তিন কোটি পাঁচ লাখ টাকা কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। বিক্রি ও কেনাকাটায় সর্বমোট ১৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করা হয়। ভ্যাট আইন অনুযায়ী দুই শতাংশ হারে সুদ ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সুদসহ মোট ফাঁকি ২৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, এ ভ্যাট পরিশোধে ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রাথমিক দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়। প্রতিষ্ঠান জবাব না দিয়ে কয়েক দফা সময় নেয়। এছাড়া পুনর্নিরীক্ষার আবেদন জানায়। ভ্যাট পশ্চিম কমিশনার পুনর্নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেয়। পুনর্নিরীক্ষার সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়। পুনর্নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের ছয় কোটি ৪২ লাখ টাকার ফাঁকি পাওয়া যায়। এ ভ্যাট পরিশোধে চলতি বছরের ২৩ জুলাই চূড়ান্ত দাবিনামাসংবলিত কারণ দর্শানো নোটিস জারি করা হয়।
নোটিসে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে পণ্য বিক্রি বা সরবরাহ পর্যায়ে মোট ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে চার কোটি ৫৮ লাখ টাকা। আর ওই সময়ে উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে এক কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ছয় কোটি ৪২ লাখ টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট যে সময় পরিশোধ করা হবে, সে সময়ে এ ভ্যাটের ওপর দুই শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার ড. মইনুল খান শেয়ার বিজকে বলেন, পুনর্নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত দাবিনামা জারি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ফাঁকি প্রমাণিত হয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধ না করা হলে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফাঁকি রোধে বিশেষ নজরদারি রাখা হবে বলে জানান তিনি।

 

সর্বশেষ..