ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে বড় হচ্ছে আখতার ফার্নিশারস

প্রকাশ: ফেব্রুয়ারী ১২, ২০২০ সময়- ০৪:৩৯ অপরাহ্ন

## ভ্যাট ফাঁকি প্রমাণিত, চূড়ান্ত দাবিনামা জারি

## কিস্তি করে পরিশোধের সুযোগ দেয়ার পরও পরিশোধ করছে না

## রাজস্ব ফাঁকির খোঁজে প্রধান কার্যালয়, শো-রুম, বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান, হচ্ছে নিরীক্ষা

রহমত রহমান: ফার্নিচার খাতের দেশীয় প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড ‘আখতার ফার্নিশারস’। ১৯৭৬ সাল থেকে হাঁটিহাঁটি পা পা করে ব্র্যান্ডে পরিণত হয় আখতার গ্রুপের প্রতিষ্ঠানটি। ৪৪ বছরে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে কয়েকগুণ। ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ফাঁকিও কয়েকগুণ বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির বিশাল অঙ্কের ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটন করে। ফাঁকির কৌশল দেখে বিস্মিত এনবিআর কর্মকর্তারা। এরপর ফাঁকির চিত্র সামনে চলে এসেছে। এনবিআর কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, প্রতিষ্ঠানটি একই কৌশলে বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে।

অন্যদিকে, নিরীক্ষায় ভ্যাট ফাঁকি উদ্ঘাটনের পর প্রথমে প্রতিষ্ঠানটি ফাঁকি হয়নি দাবি করে। শুনানি আর যাচাই শেষে ফাঁকি প্রমাণিত হয়। ফাঁকি হয়েছে বলে ভুল স্বীকার করে প্রতিষ্ঠান। ফাঁকি দেওয়া ভ্যাট পরিশোধে কিস্তিতে তা পরিশোধের অনুরোধ জানায়। এনবিআর তাদের সেই সুযোগও দেয়। সেই অনুযায়ী সম্প্রতি চূড়ান্ত দাবিনামাও জারি করা হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ভ্যাট পরিশোধ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় এখন ভ্যাট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এনবিআর।

অন্যদিকে, আখতার ফার্নিশারসের ভ্যাট ফাঁকি কৌশল দেখে নড়েচড়ে বসেছে এনবিআর। তাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠানটির দেশব্যাপী থাকা ৩২টি শোরুম ও বেশ কিছু বিক্রয়কেন্দ্রে মূসক চালান ছাড়াই প্রতিষ্ঠান পণ্য সরবরাহ করে আসছে। এর মাধ্যমে বছরে বিপুল পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয় এনবিআর।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে মূসক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, শোরুম ও বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করে কাগজপত্র জব্দ করেন। ফাঁকি উদ্ঘাটনে জব্দ করা কাগজপত্র যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া ফাঁকি উদ্ঘাটনে মূসক গোয়েন্দা সব ভ্যাট কমিশনারেটের সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, কমিশনারেটের আওতাধীন এ প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি উদ্ঘাটনে সব কারখানা, বিক্রয়কেন্দ্রের তালিকা, ২০১৬-১৭ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের দাখিলপত্র পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গ্রুপের চেয়ারম্যান কেএম আখতারুজ্জামান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাতো কেএম রিফাতুজ্জামানের ব্যক্তিগত নাম্বারে কয়েকদিন কল দেওয়া হলেও রিসিভ করেনি। খুদে বার্তা পাঠানোর পরও কোনো জবাব দেয়নি। তবে গ্রুপের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, চূড়ান্ত দাবিনামার নোটিস পেয়েছি। কিস্তি করে দেওয়ার পরও টাকা পরিশোধ করা হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।

সূত্র জানায়, বিশ্বমানের ফার্নিচার উৎপাদন ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ পায় এনবিআর। বিশেষ করে বিক্রয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভ্যাট চালান না দেওয়া, ভ্যাট নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল ক্রয় করা, উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট না দেওয়া। ফাঁকি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয় এনবিআর। এনবিআরের নির্দেশে মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর নিরীক্ষা করে গত ১৩ মার্চ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর) প্রতিবেদন দেয়। সে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানের কাছে ভ্যাট, বিক্রয়সংক্রান্ত দলিলাদি ও বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কয়েকবার চিঠি দেওয়ার পর কিছু কাগজপত্র জমা দেয়। সে কাগজপত্র ও প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন যাচাই করে সুদসহ প্রায় সাত কোটি ২০ লাখ টাকার ফাঁকি উদ্ঘাটন হয়েছে।

আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি বিক্রয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভ্যাট চালান দেয় না। ফার্নিচার উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট দেয় না। দাখিলপত্রে সঠিকভাবে বিক্রয় তথ্য তুলে ধরা হয় না। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় না। প্রতিষ্ঠানটি স্থান-স্থাপনা ভাড়ার ক্ষেত্রেও ভ্যাট দেয় না। প্রতিষ্ঠানটির ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় তিন কোটি ২৩ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল কেনার মাধ্যমে ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ৪৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা, যাতে দুই শতাংশ হারে সুদ প্রায় ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।

অপ্রদর্শিত (সিএ রিপোর্ট ও ক্রয় রেজিস্টারে পার্থক্য) ক্রয়মূল্যের বিপরীতে উৎসে ভ্যাট ফাঁকি প্রায় ৯০ হাজার টাকা, যাতে সুদ প্রায় ৯১ হাজার টাকা। ফার্নিচার উৎপাদন পর্যায়ে প্রায় ১৫ কোটি ৯ লাখ টাকার পার্থক্য পাওয়া যায়। এর ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট প্রায় ৯০ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। আর সুদ প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া বিপণন পর্যায়ে প্রায় ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকার পার্থক্য পাওয়া যায়, যার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট প্রায় ৪২ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এর ওপর সুদ প্রায় ৫০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে যে দাখিলপত্র জমা দেয়, তাতে সঠিকভাবে ফার্নিচার বিক্রয়ের তথ্য তুলে ধরে না। প্রতিষ্ঠানটি দাখিলপত্রে পাঁচ বছরে প্রায় ১১ কোটি ৬১ লাখ টাকার বিক্রয় কম দেখিয়ে প্রায় এক কোটি ১৬ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এর ওপর সুদ প্রায় এক কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কেনাকাটা বা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য তুলে ধরে না। সিএ রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ১৯ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এর ওপর সুদ প্রায় ১৯ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানটি শোরুম ও কোম্পানির প্রতিষ্ঠানের ভাড়ার ওপর পাঁচ বছরে প্রায় সোয়া ৯ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এর ওপর সুদ প্রায় ১২ লাখ টাকা। পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট ফাঁকি প্রায় সাত কোটি ২০ লাখ টাকা। কারখানায় আগুন লেগে কাগজপত্র পুড়ে গেছে দাবি করে ভ্যাট ফাঁকি থেকে বাঁচতে চেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সে দাবি তাদের প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৩ মে ভ্যাট উত্তর প্রাথমিক দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে। শুনানি শেষে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফাঁকি মেনে নেওয়া হয়।

তবে বলা হয়, ২০১১-১২ অর্থবছর ৪৩ লাখ ৭২ হাজার ও ২০১২-১৩ অর্থবছর ৪৬ লাখ দুই হাজার টাকা পরিশোধ করে। এছাড়া শুনানির সময় ২৮ লাখ ৩৪ হাজার টাকা পরিশোধ করে। এ টাকা বাদ দিয়ে বাকি টাকা কিস্তিতে পরিশোধের আবেদন জানায়। দাবি মেনে নিয়ে চারটি কিস্তিতে ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথম কিস্তি ৩০ জানুয়ারি হলেও প্রতিষ্ঠান তা পরিশোধ করেনি। তবে কিস্তির সুবিধা দিতে শর্ত দেওয়া হয়, একটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিস্তি সুবিধা বাতিল হবে এবং ভ্যাট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, আখতার ফার্নিশারস ছাড়াও গ্রুপের আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑআখতার বোর্ড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ডেল্টা ফার্নিশারস লিমিটেড, আখতার মেট্রেস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আখতার ডোর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আখতার পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আখতার ফোম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সানোফির ফ্যাশনস লিমিটেড, আখতার ফার্নিচার একাডেমি, আখতার ফাউন্ডেশন, থাই বাংলা টুলস লিমিটেড ও জাট হোল্ডিংস বাংলাদেশ (প্রাইভেট) লিমিটেড।