মত-বিশ্লেষণ

ভ্যালু অ্যাডেড পোশাক তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে

আবুল কাসেম হায়দার: বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাত আগামী দিনগুলোয় বড় রকমের প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। ১৯৭৬ সালের পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৪৩ বছর ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের আধিপত্য চলছে বলা যায়। এ শিল্প বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য স্থান এনে দিয়েছে। দেশের বস্ত্র খাত তৈরি পোশাকশিল্পের কারণে অন্য দেশের ঈর্ষায় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা প্রতিযোগিতায় দেশের স্পিনিং খাত বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। ১০ মাস ধরে কঠিন পথ অতিক্রম করছে স্পিনিং খাত। তাই পোশাকশিল্পের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান অধিকারী বাংলাদেশ সামনের বছরগুলোতে কঠিন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) রিপোর্ট (২০১৯) অনুযায়ী, নতুনভাবে সতর্ক হয়ে নতুন নতুন কৌশল নিয়ে ধীর, স্বচ্ছ ও দৃঢ়গতিতে আমাদের সবাইকে একযোগে এগিয়ে যেতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। তবে সেই মুকুট আর কত দিন থাকবে, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশের ঘাড়ে ভিয়েতনাম নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে। যেকোনো সময়ে দেশটি বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিসটিকস রিভিউ, ২০১৯’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং চীন, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত, তুরস্ক, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রÑএই শীর্ষ ১০টি অঞ্চল ও দেশ ৪২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশ্বের মোট রপ্তানির ৮৩ দশমিক তিন শতাংশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে চীন। বৈশ্বিক বাজারে দেশটির হিস্যা ৩১ দশমিক তিন শতাংশ। পোশাক রপ্তানিতে চীনের পেছনেই এক এক করে আছে যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ তিন হাজার ২৯২ কোটি এবং ভিয়েতনাম তিন হাজার ২০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। উভয় দেশের বাজার হিস্যা এখন প্রায় কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে। গত বছর ১০ শীর্ষ রপ্তানিকারকের মধ্যে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা ছিল ছয় দশমিক চার শতাংশ। অন্যদিকে ভিয়েতনামের বাজার হিস্যা বেড়ে হয়েছে ছয় দশমিক দুই শতাংশ।

ডব্লিউটিওর গত দুই বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভিয়েতনাম পোশাক রপ্তানিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন ২০১৭ সালে দেশটি ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল। তখন তাদের বাজার হিস্যা ছিল পাঁচ দশমিক ৯ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই তাদের রপ্তানির পরিমাণ ৫০০ কোটি ডলার বেড়েছে। বদৌলতে দেশটির বাজার হিস্যা ছয় শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের বাজার হিস্যা কমেছে। ২০১৭ সালে দুই হাজার ৯২১ কোটি ডলারের রপ্তানির বিপরীতে বাজার হিস্যা ছিল ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ। রপ্তানি ৩৭১ কোটি ডলার বাড়লেও গত বছরের চেয়ে বাজার হিস্যা দশমিক এক শতাংশ কমেছে।

বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের হিস্যা এখন ছয় দশমিক চার শতাংশ আর ভিয়েতনামের ছয় দশমিক দুই শতাংশ। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ১১ দশমিক ৪৬ ও চার দশমিক ৭০ শতাংশ কমেছে। অক্টোবর মাসেও পোশাক রপ্তানি কমার আশঙ্কা প্রবল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) পণ্য রপ্তানির তথ্য দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে জানান পোশাকশিল্পের একাধিক উদ্যোক্তা। ‘ভিয়েতনাম যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেলে অবাক হব না। বৈশ্বিক চাহিদায় এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিদেশের ক্রেতারা বেছে বেছে কিনছেন, কম কিনছেন। তারা ভ্যালু অ্যাডেড পোশাক চাচ্ছেন। সেটির জন্য হয়তো আমরা এখনও প্রস্তুত নই।’

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ভিয়েতনামে প্রচুর চীনা বিনিয়োগ আছে। সেজন্য তারা বহুমুখী পোশাক উৎপাদনে বেশ এগিয়ে গেছে। তাই আমাদেরও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে।’

ডব্লিউটিওর তথ্যানুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো গত বছর সম্মিলিতভাবে ১৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া ভারত এক হাজার ৭০০ কোটি, তুরস্ক এক হাজার ৬০০ কোটি, হংকং এক হাজার ৪০০ কোটি, ইন্দোনেশিয়া ৯০০ কোটি, কম্বোডিয়া ৮০০ কোটি ও যুক্তরাষ্ট্র ৬০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে।

পোশাক আমদানিতে শীর্ষস্থানে আছে ইইউ। গত বছর ইইউর সদস্য ২৮টি দেশ ২০ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ৯ হাজার ২০০ কোটি ডলার, জাপান তিন হাজার কোটি ডলার, হংকং এক হাজার ৩০০ কোটি ডলার, কোরিয়া ও কানাডা প্রতিটি এক হাজার ১০০ কোটি ডলার, চীন, রাশিয়া ও সুইজারল্যান্ড প্রতিটি ৮০০ কোটি ডলার এবং অস্ট্রেলিয়া ৭০০ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। ‘ভিয়েতনামের বার্ষিক পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ২২ হাজার কোটি ডলার। তার মধ্যে তৈরি পোশাক তাদের ষষ্ঠ শীর্ষ রপ্তানি পণ্য। তার পরও ভিয়েতনাম যদি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সেটি হবে দুঃখজনক। কারণ তৈরি পোশাক আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য। বাংলাদেশে কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অনেক কাজ হলেও বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের ক্ষমতায় ও প্রযুক্তিতে উন্নয়ন হয়নি। এ জায়গায় দ্রুত উন্নতি করতে হবে। না হলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে অনেক পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে ভিয়েতনাম।’

এগিয়ে যেতে করণীয় কৌশল

এক. এখন সময় এসেছে তৈরি পোশাকশিল্প সম্পর্কে নতুন করে ভাবার। বিদেশিদের পরামর্শে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কয়েক বছর ধরে যথেষ্ট উন্নয়নের কাজ করা হয়েছে। শহর থেকে সব তৈরি পোশাকশিল্প সরে গিয়ে সাভার, গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও নারায়ণগঞ্জে বৃহৎ আকারে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজের শেষ হলো না। নতুন করে সংস্কার, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা ছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকা সম্ভব নয়। উল্লিখিত আলোচনা থেকে আমাদের চোখ নতুন করে খুলে গেল। অর্থাৎ তৈরি পোশাকশিল্পে নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসতে হবে। তাই প্রয়োজনে আধুনিক ফ্যাশন ইনস্টিটিউট গড়ে তুলতে হবে। নতুন নতুন পোশাক ছাড়া আজ আমাদের বিশ্ববাজারে টেকা সম্ভব হবে না। সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে দ্রুত ফ্যাশন ইনস্টিটিউট স্থাপন করা প্রয়োজন।

দুই. তৈরি পোশাকশিল্প তথা বস্ত্র খাতকে সুরক্ষা দেওয়া এখন খুবই প্রয়োজন। আমাদের স্পিনিং খাত, উইভিং খাত ও ফিনিশিং খাতকে আর উন্নত ও সুরক্ষা প্রদান করতে হবে। প্রতিবেশী দেশের সুতা না এসে দেশি স্পিনিং মিলের সুতা ব্যবহারের কৌশল বের করতে হবে। দেশের স্পিনিং মিলগুলোকে রক্ষা না করা গেলে তৈরি পোশাকশিল্প অতি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় পড়বে। তৈরি পোশাকশিল্পে দেশি সুতা ব্যবহার করলে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাতে দেশের পোশাকশিল্প শক্তিশালী হবে। আর্থিকভাবে তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে উঠলে অগ্র ও পশ্চাৎশিল্প স্থাপনে এসব উদ্যোক্তা নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারবেন। এই প্রস্তাব দ্রুত মেনে নিয়ে বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা প্রয়োজন দেশের নীতিনির্ধারকদের।

তিন. তৈরি পোশাকশিল্প ও বস্ত্র খাতের জন্য ব্যাংকঋণে সুদের হার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা জরুরি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা দেশের শিল্পের স্বার্থে খুবই প্রয়োজন।

চার. বস্ত্র খাতে বিশেষ করে স্পিনিং খাতে ব্যবহার করা গ্যাস ও বিদ্যুতে আর কোনোভাবে মূল্য বৃদ্ধি করা যাবে না। গ্যাস ও বিদ্যুতে মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পণ্য বিপণন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সবাই কম মূল্যে বিদেশি সুতা ব্যবহারের ফলে দেশের স্পিনিং মিল দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন অতীব জরুরি।

পাঁচ. তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য দ্রুত দেশের রপ্তানিমুখী বিশেষ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন। ওইসব শিল্পাঞ্চলে উন্নতমানের, আধুনিক, অতি ফ্যাশনযুক্ত, চাহিদা মোতাবেক শিল্প দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের নিয়ে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এখন ফ্যাশনের যুগ। ওভেন ও নিট উভয় ক্ষেত্রে নতুন নতুন ফ্যাশনসমৃদ্ধ পোশাকের চাহিদা বিশ্বজুড়ে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কম মূল্যে, নতুন নতুন ফ্যাশনসমৃদ্ধ পোশাক সব তরুণ বাজারের চাহিদা। তা পূরণ করার জন্য আধুনিক মেশিন দিয়ে অত্যাধুনিক তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে তুলতে হবে।

ছয়. অপেক্ষাপকৃত কম দামের তৈরি পোশাক এখন বাংলাদেশ উৎপাদন করছে। কিন্তু এর চাহিদা কমে আসছে। বেশি দামের আধুনিক ফ্যাশনের পোশাক তৈরিতে সক্ষমতা বাড়াতে সর্বশেষ প্রযুক্তির কারখানা স্থাপন করতে হবে। এজন্য প্রচুর পুঁজিসমৃদ্ধ বিনিয়োগকারী প্রয়োজন। তাই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে নতুন করে বিশেষায়িত অঞ্চলে উন্নতমানের তৈরি পোশাকশিল্প স্থাপন করতে হবে। তাহলে ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের চেয়ে রপ্তানিতে আমরা এগিয়ে যাব।

সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ বিজিএমইএ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..