সাক্ষাৎকার

ভয়েস কলরেট আপাতত পরিবর্তনের সুযোগ নেই

দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। সংস্থাটির কমিশনার হিসেবে মো. জহুরুল হক যোগ দেন ২০১৫ সালের ৩০ আগস্ট। ২০১৮ সালের ১২ মে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন তিনি। আর গত ৩০ জানুয়ারি বিটিআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও টেলিযোগাযোগ খাতকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন শেয়ার বিজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হামিদুর রহমান

শেয়ার বিজ: বর্তমান সরকারের অন্যতম স্লোগান ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ। টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে এক্ষেত্রে বিটিআরসি কী ধরনের ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন?
জহুরুল হক: ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ছিল একটি প্রত্যয়, একটি স্বপ্ন। এই স্বপ্নের যাত্রা শুরু ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের হাত ধরে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দিন বদলের সনদ’-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ জানতে পারে এই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন আর রূপকল্পের কথা। বর্তমানে এটি বাস্তবতা। তবে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ পরিণত হবে।
একটি উন্নত দেশ, সমৃদ্ধ ডিজিটাল সমাজ, একটি ডিজিটাল যুগের জনগোষ্ঠী, রূপান্তরিত উৎপাদন ব্যবস্থা, নতুন জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিসহ সবকিছু নিয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্নই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম সোপান। ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার পর বিগত ১০ বছরে দেশ লক্ষণীয়ভাবে এগিয়েছে। টেলিঘনত্বের দিক থেকে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ দেশ এখন বাংলাদেশ। ২০০৯ সালের শুরুতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ছিল ২০ মিলিয়ন, যা এখন ১৩৬ মিলিয়ন। দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা ৯ বছর আগে ছিল মাত্র ১২ লাখ, এখন ৯ কোটিরও অধিক। ইন্টারনেটের প্রসারে ব্যান্ডউইথ ব্যবহারে এক হাজার জিবিপিএসের কাছাকাছি চলে এসেছে। বর্তমান টেলিযোগাযোগ খাত ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জাতীয় অগ্রগতি, অর্থনীতি, প্রগতি, টেকসই উন্নয়নে প্রভূত ও বহুবিধ ভূমিকা রাখছে। ইন্টারনেট গ্রাহকেরা ৯৫ শতাংশ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। বর্তমানে দেশে থ্রিজি গ্রাহকসংখ্যা সাড়ে ছয় কোটির বেশি এবং ফোরজি গ্রাহকও এক কোটি ছাড়িয়েছে। মোবাইল ফোনে লেনদেন হচ্ছে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। আর্থিক এ লেনদেনের জন্য প্রচলিত ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভর না থেকে জনগণ ডিজিটাল পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। আর এ অগ্রগতির চালিকাশক্তি নিঃসন্দেহে উন্নত টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা।
২০০৯ সালে দেশে মাথাপিছু আয় ছিল যেখানে ৭২৮ মার্কিন ডলার, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়নের ছোঁয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির ফলে তা এখন প্রায় এক হাজার ৮০০ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত বছর মে মাসে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্বপ্নের ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্বে ৫৭তম সদস্য হিসেবে স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য হলো বাংলাদেশ। এ স্যাটেলাইট বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। এর মাধ্যমে বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরতা দূর হবে এবং সাশ্রয় হবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
২০১৮ সালে দেশে ফোরজি ও এলটিই তরঙ্গ নিলামের পরে চালু করা হয়েছে চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল ফোন প্রযুক্তি ফোরজি সেবা। এর ফলে গ্রাহকরা হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার, উন্নত ভয়েস কোয়ালিটি, নিরবচ্ছিন্ন ভিডিও স্ট্রিমিং, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন বা অন্যান্য মোবাইল যন্ত্রে মোবাইল আল্ট্রা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা, আইপি টেলিফোনি, গেমিং সেবা, এইচডিটিভি, হাই-ডেফিনিশন মোবাইল টিভি, ভিডিও কনফারেন্স, ত্রিমাত্রিক টেলিভিশন এবং ক্লাউড কম্পিউটিং প্রভৃতি সেবা গ্রহণ করতে পারছে।
মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি সিস্টেম (এমএনপিএস) বা নম্বর অপরিবর্তন না করে মোবাইল ফোন অপারেটর বদলের সুবিধা চালু করা হয়েছে। এ সেবা থেকে নম্বর পরিবর্তন না করে মোবাইল ব্যবহারকারীরা স্বাধীনভাবে ভিন্ন অপারেটরের মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারবে। এতে কোয়ালিটি অব সার্ভিস বৃদ্ধিসহ মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে উন্নত মোবাইল সেবা প্রদানের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। গ্রাহক যেন সহজে এ সেবা গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য এ-সংক্রান্ত সিমে ট্যাক্সের ১০০ টাকা রেয়াত প্রদান করা হয়েছে।
ইন্টারনেট ব্যবহারসাশ্রয়ী করতে দফায় দফায় ব্যান্ডউইথের দাম কমানো হয়েছে। ২০০৪ সালে এক এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৭২ হাজার টাকা। তা এখন ৬২৫ টাকায় নেমে এসেছে। বর্তমানে আইটিইউ পরামর্শকের মাধ্যমে চলছে কস্ট মডেলিং তৈরির কাজ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের মূল্য হ্রাসের কার্যক্রম।

শেয়ার বিজ: সম্প্রতি বিটিআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে পূর্ণকালীন দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। চেয়ারম্যান হিসেবে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বলুন।
জহুরুল হক: মোবাইল ফোনের কোয়ালিটি অব সার্ভিস অর্থাৎ মানোন্নয়নে আমার ফোকাস থাকবে। আমরা এরই মধ্যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দেশের সব মোবাইল অপারেটরের কোন এলাকায় সেবার মান কেমন, তা ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে পরিমাপ করছি। পরবর্তীকালে সম্পূর্ণ টেস্টের ফলাফল বিশ্লেষণ করে অপারেটরদের মানের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে পারব বলে আশা করছি।
গত বছর নভেম্বর মাসে মোবাইল ফোনের কোয়ালিটি অব সার্ভিস রেগুলেশন জারি করা হয়েছে এবং সে মোতাবেক বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যেসব অপারেটরের মান কমিশন-নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে, তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস প্রেরণ তথা জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে। যেহেতু ২০২১-২৩ সালের মধ্যে ফাইভজি চালুকরণ সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের একটি বিষয়, তাই আমি আশা করছি, এ প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে ফাইভজি চালু করার বিষয়ে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে দেওয়া এবং এ বিষয়ে কারিগরি বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় একটি পর্যায়ে উপনীত হতে পারব।
গ্রাহকদের নিরাপত্তায় এরই মধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে মোবাইল হ্যান্ডসেটের ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই) ডেটাবেজ। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) নিবন্ধনের কাজও শিগগিরই শুরু হচ্ছে। আশা করছি, ক্রমান্বয়ে দেশের সব মোবাইল হ্যান্ডসেটকে এ ডেটাবেজের আওতায় নিয়ে আসতে পারব। পরে যখন এনইআইআর চালু করা হবে, তখন থেকে নিরাপদে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গৃহীত হবে বলে মনে করছি।
এর বাইরে ইন্টারনেটের দাম কমানোর ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। কীভাবে প্রত্যন্ত এলাকায় এ দাম আরও কমানো যায়, কমিশন এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। ইন্টারনেট অব থিংস বা আইওটি ডিভাইস দেশে আমদানির ব্যাপারে এরই মধ্যে কমিশন থেকে নির্দেশিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ করা হয়েছে। আশা করছি তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমরাও একই গতিতে অগ্রসর হব।

শেয়ার বিজ: অনেকেই অভিযোগ করেন পুরোনো আইনে চলছে টেলিযোগাযোগ খাত। আইনটি নিয়ে আপনারা কী ভাবছেন?
জহুরুল হক: হ্যাঁ, সময়ের প্রেক্ষিতে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে, সবকিছু আপডেট হয়েছে। দেশে নতুন নতুন প্রযুক্তি আসছে। সময়ের প্রেক্ষিতে তথ্যপ্রযুক্তির খাত, বিশেষ করে গত ২০১৭-১৮ বছরে অনেক উন্নতি করেছে। তাই টেলিযোগাযোগ আইন যুগোপযোগী হলে ভালো হয়। তবে এটি যেন অবশ্যই গ্রাহকবান্ধব হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মানুষের উপকার হয় ও বিনিয়োগকারীরা যেন আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারেন, সে দিকেও লক্ষ রাখতে হবে। ইতিবাচক পরিবর্তন হলে আমরা সেটিকে অবশ্যই সাধুুবাদ জানাব।

শেয়ার বিজ: কয়েক মাস আগে মোবাইল ফোনের নতুন কলরেট নির্ধারণ করেছে বিটিআরসি। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে, এখনও হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
জহুরুল হক: আমি মনে করি নতুন কলরেট যুগোপযোগী হয়েছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করেই কলরেটে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অননেটে (একই অপারেটর) ও অফনেটে (ভিন্ন অপারেটর) আগে যে-ই কলরেট ছিল, সেটিতে কম মানুষের উপকার হয়েছে। অপারেটর, গ্রাহকসহ সর্বোপরি সব শ্রেণির কথা চিন্তা করেই আমরা নতুন কলরেট করেছি, যাতে বেশিরভাগ গ্রাহক সাশ্রয়ী রেটে কথা বলতে পারে। লক্ষ করলে দেখবেন, অফনেটে ন্যূনতম কলরেট ৮৫ পয়সা থেকে নামিয়ে ৪৫ পয়সা করা হয়েছে। আর অননেটে ২৫ পয়সা থেকে ৪৫ পয়সা হয়েছে। এখানে আমরা ওভারঅল যে ট্যারিফটা আছে, সেটি থেকে দেখেছি গ্রাহকদের ওপর কোন ধরনের প্রভাব পড়েছে। এটি বরং আগের থেকে সাশ্রয়ী হয়েছে।

শেয়ার বিজ: আমাদের দেশে ভয়েস কলের রেট বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশি। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
জহুরুল হক: ভয়েস কলের যে বর্তমান রেটটি রয়েছে, সেটি এই মুহূর্তে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই, কেননা বর্তমানে ভয়েস কলের যে রেট দেওয়া হয়েছে সেটি আমরা যাচাই-বাছাই করেই করেছি। তবে যদি ভবিষ্যতে কমিশনের কাছে বা সরকারের কাছে এমন কোনো বিষয় প্রতীয়মান হলে সেক্ষেত্রে আমরা আবার বিবেচনা করতে পারি।

শেয়ার বিজ: বিটিআরসির বর্তমানে যে সংখ্যক জনবল রয়েছে, তা দিয়ে সেবা প্রদানে কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে কি?
জহুরুল হক: আসলে বিটিআরসিতে কাজের পরিধি বিগত দিনের তুলনায় অনেকাংশই বেড়েছে। আমাদের জনবল অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিনিয়ত গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে। লাইসেন্সসহ নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, যেমন থ্রিজি, ফোরজি, এমএনপি, আইএমইআর, কোয়ালিটি অব সার্ভিসসহ অনেক কিছুই প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে। তবে জনবল বাড়েনি। সম্প্রতি কিছু জনবল নিয়োগ দেওয়া হলেও তা কাজের তুলনায় খুবই কম। গ্রাহকদের পুরোপুরি সেবা প্রদানে বিটিআরসিতে জনবল বাড়ানোর বিকল্প নেই।

শেয়ার বিজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
জহুরুল হক: আপনাকে ও শেয়ার বিজকে ধন্যবাদ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..