নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম : আমন ধানে রেকর্ড উৎপাদন, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত এবং ধারাবাহিক আমদানির পরও চালের বাজারে স্বস্তি নেই। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে চালের দাম নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে। সপ্তাহ ব্যবধানে অন্যান্য চাল কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা বাড়লেও সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম প্রতি কেজিতে এক লাফে বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪০ টাকা। ভরা মৌসুমে এমন ঊর্ধ্বগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ ও পাহাড়তলীর পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি খুচরা বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে চিনিগুঁড়া চালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি মধ্য ও নিম্নআয়ের পরিবারের খাদ্য ব্যয়ে নতুন চাপ তৈরি করেছে।
সরেজমিনে চট্টগ্রামের বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে বর্তমানে মোটা স্বর্ণা চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৬ টাকা কেজি দরে। মাঝারি মানের পাইজাম ও বিআর-২৮ চালের দর ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। প্রতি কেজি মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম তিন থেকে চার টাকা বেড়ে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং নাজিরশাইল ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এই দামের ব্যবধান হয়ে দাঁড়াচ্ছে আকাশচুম্বী। খুচরায় প্রতি কেজি স্বর্ণা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, পাইজাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, মিনিকেট ৮৫ থেকে ৯০ টাকা এবং নাজিরশাইল ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা চিনিগুঁড়া চালের। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই চালের দাম কেজিতে ৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত ‘চাষি’ এবং এরফান সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৭৫ টাকা কেজি দরে। খোলা সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়।
পাহাড়তলী বাজারের ব্যবসায়ী সিরাজ সরকার জানান, রমজান মাসে সাধারণত বেচাকেনা কিছুটা কমে যায়, মানুষের ভোগও তুলনামূলক কম থাকে। সেদ্ধ চালের দাম খুব বেশি না বাড়লেও সুগন্ধি চিনিগুঁড়া চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে যে চাল ১০৫ টাকায় কিনতাম, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ১৪০ টাকায়। চিনিগুঁড়া চাল রপ্তানি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, আর সে কারণেই বাজারে চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে। নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান, দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে চিনিগুঁড়া চালের রপ্তানি বন্ধ রাখা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ তুলনা মূল্যে কম দামে চাল কিনতে পারেন।
নগরের পাহাড়তলী বাজারের ইয়াছিন ট্রেডারের স্বত্বাধিকারী মো. সোহেল বলেন, মিনিকেট ও ব্রি ধান-২৮ এখন অফ-সিজনে রয়েছে। এ দুটি জাতই সবচেয়ে বেশি খাওয়ার চাল। সরকার নভেম্বর থেকে কেজিতে ৪৯ টাকায় চাল ও ৩৪ টাকায় ধান সংগ্রহ শুরু করার পর থেকেই বাজারে ধান-চালের দাম তুলনামূলক উচ্চ রয়েছে। তবে বর্তমান দাম গত বছরের তুলনায় এখনো কম রয়েছে।
চকবাজারের মুদি ব্যবসায়ী হেদায়েত আলী বলেন, মার্কেটে মিনিকেট ও ব্রি ধান-২৮ চালের পাইকারি দাম ৫০ কেজির বস্তাপ্রতি ১৫০ থেকে ১৭৫ টাকা বেড়েছে। শম্পা কাটারি ও নজিরশাইলের মতো মৌসুমি জাতের চালও গত তিন-চার দিনে বস্তাপ্রতি ১২০ থেকে ১৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজারে চাল কিনতে আসা হেদায়েত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুদি দোকানে প্রতি বস্তা চালে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়ে গেছে। চিনিগুঁড়া চাল তো এখন বিলাসিতা। পর্যাপ্ত চাল থাকতেও যদি দাম বাড়ে, তবে এই আমদানির সুফল ভোগ করছে কে? সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ মানুষের বাজেট কোনোভাবেই সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে দেশে ৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ মেট্রিক টন। দিনাজপুর ও চট্টগ্রামসহ অধিকাংশ জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে দেখা যায়, হেক্টরপ্রতি গড় ফলন গত বছরের ২ দশমিক ৮১ টন থেকে বেড়ে এবার ২ দশমিক ৯৫ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৪০ কেজির বেশি অতিরিক্ত ধান মিলেছে। সরকারি মজুত পরিস্থিতিও শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আমন মৌসুমে সরকার ১০ লাখ ৫ হাজার টন চাল ও ধান সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ২১ লাখ ৫০ হাজার টন ছাড়িয়েছে।
অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমদানিও চলছে। চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ লাখ ৫০ হাজার টন চাল দেশে পৌঁছেছে। ভারত থেকে অতিরিক্ত ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ২৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ১০ মার্চ পর্যন্ত আমদানির সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, মজুত ও আমদানি- তিন ক্ষেত্রেই শক্ত অবস্থান থাকার পরও বাজার অস্থির কেন, সেই প্রশ্ন এখন ভোক্তাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন জানান, রেকর্ড উৎপাদন ও উচ্চ মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বাড়া অস্বাভাবিক। মিলগেট ও শহরের পাইকারি বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠছে।
বিশ্ববাজারে চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল। তবু স্থানীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাজার নজরদারিতে ঘাটতির দিকে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে স্বল্পমূল্যে চাল বিক্রি হলেও খোলা বাজারে তার প্রভাব সীমিত। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, মিলগেট থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত তদারকি জোরদার না হলে মূল্যচাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো বড় পাইকারি কেন্দ্রে নজরদারি না বাড়ালে ভোক্তাদের স্বস্তি ফেরানো কঠিন হবে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post