প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মদ বিক্রির শুল্ককর নিয়ে ইপিজেড এইচ কবির ‘রশি টানাটানি’

রহমত রহমান: বন্ড সুবিধায় মদ ও মদ জাতীয় পণ্য আমদানি হয়েছে দুই বছর আগে। বন্ড লাইসেন্সের শর্তানুযায়ী, আমদানি করা পণ্য রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত (ইন টু বন্ড ও এক্স বন্ড) করা হয়নি। এমনকি আমদানি পণ্যের বিক্রয়ের কোনো বৈদেশিক মুদ্রা লিয়েন ব্যাংকে জমা হয়নি। মেসার্স এইচ কবির অ্যান্ড কোং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে আমদানি করেছে প্রায় দেড় কোটি টাকার মদ। যাতে শুল্ককর প্রায় ৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (আদমজী ইপিজেড) প্রতিষ্ঠানটি এ মদ আমদানি করলেও কোনো শুল্ককর পরিশোধ করেনি। এমনকি বন্ড লাইসেন্সের কোনো শর্তও মানেনি। তবে এ শুল্ককর ইপিজেড নাকি এইচ কবির-কে পরিশোধ করবে, তা নিয়ে চলছে রশি টানাটানি।

আদমজী ইপিজেড ‘কমিশারিয়েট পরিচালনা ও ম্যানেজিং এজেন্ট’ হিসেবে এইচ কবিরকে নিয়োগ দিয়েছে। ‘অবৈধভাবে পণ্য অপসারণ ও শুল্ককর পরিশোধে’ আদমজী ইপিজেডকে সম্প্রতি কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। আদমজী ইপিজেড বলছে, এ শুল্ককর এইচ কবিরকে পরিশোধ করতে হবে। বন্ড কমিশনারেট এইচ কবিরের কাছে শুল্ককর চাইতে বলেছে। আর এইচ কবির কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিষ্ঠান ২০১৭ সাল থেকে বন্ধ। ২০১৯ সালে কীভাবে পণ্য আমদানি হলো। আদমজী ইপিজেড তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো চিঠি দেয়নি।

এনবিআর সূত্রমতে, দেশের ছয় প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের (প্রিভিলেজ পারসন) জন্য বন্ড সুবিধার আওতায় পণ্য আমদানির অনুমোদন দিয়েছে এনবিআর, যার মধ্যে মেসার্স এইচ কবির অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড একটি। এইচ কবির অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড ইউনিয়ন গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের আদমজী ইপিজেড নিরীক্ষা শেষে ২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর প্রতিবেদন দেয়। যাতে ইপিজেডের ২০১৯ সালের ৩ জুন থেকে ২০২০ সালের ২ জুন পর্যন্ত নিরীক্ষা করা হয়। প্রতিবেদনে এইচ কবির অ্যান্ড কোম্পানির বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বা অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর আদমজী ইপিজেডকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠায় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।

যাতে বলা হয়, আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাকে (আদমজী ইপিজেড) ২০১১ সালের ১২ এপ্রিল বন্ড লাইসেন্স প্রদান করা হয় (কমিশারিয়েট)। আদমজী ইপিজেড কমিশারিয়েট পরিচালনার জন্য ২০১১ সালের ১৮ মে মেসার্স এইচ কবির অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডকে ম্যানেজিং এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয় আদমজী ইপিজেড। বিষয়টি অনুমোদনের জন্য আদমজী ইপিজেড বন্ড কমিশনারেটে আবেদন করলে বন্ড কমিশনারেট থেকে অনুমোদন দেয়া হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, এইচ কবির তাদের মূসক নিবন্ধনের আওতায় ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ১২ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে এক লাখ ৬৭ হাজার ৫৭৬ ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে; যা বন্ড কমিশনারেটের নিরীক্ষায় উঠে এসে এসেছে। আমদানি করা এসব পণ্যের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য এক কোটি ৪৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৪১ টাকা, যাতে শুল্ককর ৮ কোটি ৩৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৬৬ টাকা। বন্ড লাইসেন্সি হিসেবে শুল্ককর পরিশোধের দায়ভার আদমজী ইপিজেডের ওপরই বর্তায়। আদমজী ইপিজেড এ দায়ভার কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কাস্টমস আইনে বন্ড লাইসেন্সের শর্ত, লাইসেন্সিং বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানসমূহ আদমজী ইপিজেড সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী কেন দণ্ডারোপ করা হবে না এবং জড়িত শুল্ককর আদায়যোগ্য হবে না-সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে ১৫ দিনের সময় দিয়ে আদমজী ইপিজেডকে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করে বন্ড কমিশনারেট।

এ বিষয়ে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের একজন কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা আদমজী ইপিজেডকে লাইসেন্স দিয়েছি। ডিমান্ড আদমজী ইপিজেডকে করব। এইচ কবিরকে নিয়োগ দিয়েছে আদমজী ইপিজেড। তাদের উচিত ছিল, এ বিষয়ে মনিটরিং করা। ডিমান্ড করলে আদমজী এইচ কবির থেকে শুল্ককর আদায় করে দেবে।’

এ বিষয়ে আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আহসান কবীর শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বেপজা কোনো আমদানি-রপ্তানি করে না। আমরা এইচ কবিরকে ম্যানেজিং এজেন্ট নিয়োগ করেছি। এ টাকা তারা দেবে। তারা এইচ কবিরের কাছে দাবি করবে। আমরা বন্ড কমিশনারেটকে জবাব দিয়ে দিয়েছি।’

এ বিষয়ে আদমজী ইপিজেডে এইচ কবিরের কমার্শিয়াল ম্যানেজার আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা বন্ড বা ইপিজেড থেকে কোনো চিঠি পাইনি। পেলে জবাব দেব।’ আদমজী বলছে শুল্ককর এইচ কবিরকে পরিশোধ করতে হবে-এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এজেন্ট দিয়েছে ইপিজেড। ইপিজেডের অনুমতি ছাড়া একটা চালান প্রবেশের সুযোগ নেই। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাহলে ২০১৯ ও ২০২০ সালে কীভাবে পণ্য আমদানি হলো? বিল অব এন্ট্রি হয় অনলাইনে। আমার বিন নম্বরে বিল অব এন্ট্রিগুলো আছে কি না-সেটা তো দেখতে হবে। আমাদের একই নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে ঢাকায়। সেটা হিসাব করলে তো তার দায়ভার আমি নেব না।’

তিনি বলেন, ‘আমার নামে পণ্য আমদানি ও মামলা হয়েছে আমাকে চিঠি দেবে না? ইপিজেড আমাকে শোকজ করলে আমি তার জবাব ও ব্যাখ্যা দেব।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ম্যানেজিং এজেন্ট তো ইপিজেড বাতিল করে দিয়েছে। বন্ড লাইসেন্সের অধীনে নারকোটিস লাইসেন্স হয়। বন্ড লাইসেন্সের জন্য নারকোটিস লাইসেন্স হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ। আর যে অভিযোগের কথা বলা হয়েছে, আমি তো মালই আনি নাই। ইপিজেড আমাকে চিঠি দিতে পারছে না, কারণ তারা তো আমাদের এজেন্ট বাতিল করে দিয়েছে।’