দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

মধুপুরে কর্তন করা কলাগাছ বাসন্তী রেমার নয়!

শাহরিয়ার সিফাত, টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলের মধুপুর ও পার্শ্ববর্তী মুক্তাগাছা উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে প্রায় ৬২ হাজার একর এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে মধুপুর গড় বা বনাঞ্চল। বৃহৎ এ বনাঞ্চলের ৪৫ হাজার ৫৬৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ২০ হাজার একর জমিই রয়েছে স্থানীয় বাঙালি ও আদিবাসীদের অবৈধ দখলে।

মোট বনাঞ্চলের ২০ হাজার ৮৩৭ একর জমি নিয়ে ১৯৬৫ সালে গঠন করা হয় মধুপুর জাতীয় উদ্যান। সেই উদ্যানেরও একটি বড় অংশ বেদখল হয়ে আছে স্থানীয় ও আদিবাসীদের হাতে। গত এক বছরে প্রায় ১৫৭ একর জমি উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। তারই অংশ হিসেবে গত ১৪ সেপ্টেম্বর উপজেলার দোখলা রেঞ্জের অন্তর্গত শোলাকুড়ি ইউনিয়নের পেগামাড়িতে বাসন্তী রেমা নামের এক আদিবাসী নারীর দখলে থাকা জমিতে অভিযান চালায় বন বিভাগ। এ সময় ৪০ শতাংশ জমিতে থাকা পাঁচ শতাধিক কলাগাছ কেটে ফেলা হয়।

তবে এ বিষয়ে শেয়ার বিজের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। বাসন্তী রেমা ও তার স্বামী গিটিশ নিজেদের জমিতে ৫০০ কলাগাছ রোপণ এবং তাতে বন বিভাগের অভিযান চালিয়ে গাছ কেটে ফেলায় লক্ষাধিক টাকা ক্ষতির দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে ওই জমিতে কলাগাছ রোপণই করেননি তারা। গত ২৯ এপ্রিল নিজেদের ভোগ দখলে থাকা জমিটি ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামের শহিদ নামের এক ব্যক্তিকে লিজ দিয়েছিলেন বাসন্তী রেমা। ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে বাসন্তীর স্বাক্ষরিত তিন বছরের জন্য লিজ দেওয়া সেই চুক্তিপত্রের কপি সংরক্ষিত আছে শেয়ার বিজের কাছে। আর গত ১৪ সেপ্টেম্বর বন বিভাগের অভিযানে আদিবাসী নারী বাসন্তী রেমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলা হলেও, প্রকৃতপক্ষে এই জমিতে কলা আবাদ ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন শহিদ নামের লিজ নেওয়া সেই ব্যক্তি। ফলে বন বিভাগের অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত নয়, বরং বনের সরকারি জমি লিজ দিয়ে ২৫ হাজার টাকা আয় করেছেন বাসন্তী!

চুক্তিপত্র সূত্রে জানা যায়, উপজেলার শোলাকুড়ি ফকিরাকুলি গ্রামের মৃত আছর আলীর ছেলে মো. শহিদ আলীকে গত ২৯ এপ্রিল ২৫ হাজার টাকায় তিন বছরের নামে লিজ দেন বাসন্তী। যার মেয়াদ চলতি বছরের ১৫ মে থেকে ২০২৩ সালের ১৫ মে পর্যন্ত। এ তিন বছরের সময়ের মধ্যে শহিদ আলী নিজের খরচে ও ইচ্ছেমতো যে কোনো ফসল আবাদ করতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে বাসন্তী রেমা বা তার ওয়ারিশরা কেউ জমির বা ফসলের দাবি করতে পারবেন না বলেও লেখা রয়েছে সেই চুক্তিপত্রে।

এদিকে চুক্তি করার পরও নিজের জমি ও ফলনের ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিপূরণ দাবি করা বাসন্তী রেমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে লিজ নেওয়া শহিদ আলী শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমি বাসন্তীর কাছ থেকে তিন বছরের জন্য ২৫ হাজার টাকা দিয়ে ৪০ শতাংশ এই জমিটি লিজ নিই। তারপর এখানে কলার আবাদ করি। যেদিন বন বিভাগ থেকে গাছ কাটা হয়, তখন আমি সেখানে ছিলাম না। পরে খবর পেয়ে গিয়ে দেখি আমার ৫০০ গাছই কেটে ফেলা হয়েছে। এ গাছের পেছনে ইতোমধ্যে এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’

এ সময় শহিদ আলী আরও বলেন, ‘জমি লিজ নেওয়ার সময় বাসন্তী রেমা আমাকে বলেছিলেন, এই জমি গত ১০০ বছর ধরে তাদের ভোগদখলে আছে। বন বিভাগ তাদের কাছ থেকে নিতে পারেনি। সেদিন বন বিভাগ থেকে গাছ কেটে ফেলার পর বাসন্তী এসে আমাকে লিজ নেওয়ার বিষয়টি গোপন রাখতে বলেন। তিনি জানান, আমি যেন বলি এটি বাসন্তীর জমি। সে আবাদ করেছে। তখন আমি তাকে বলি, জমি আমি লিজ নিয়ে আবাদ করেছি। গাছ কেটে ফেলায় ক্ষতি হয়েছে আমার। কিন্তু নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আপনার আবাদের কথা বলব কেন? তখন বাসন্তী বলেন, ‘আমরা আদিবাসীরা না থাকলে আরও অনেক ক্ষতি হতো। জমি নিয়ে যেত। এমন আরও অনেক কিছু বুঝিয়ে তিনি আমাকে সেখান থেকে পাঠিয়ে দেন।’

স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যুগ যুগ ধরে বনের জমিতে তারা বসবাস করে আসছে। বংশপরম্পরায় তারা এসব জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। যদিও বন বিভাগ এই জমিগুলোকে সরকারি ভূমি বলে দাবি করে। কিন্তু আদিবাসীরা উত্তরাধিকার বা রেজিস্ট্রেশন বিহীন বা বাংলা দলিলের মাধ্যমে এই জমিগুলো নিজেদের দাবি করে। এ বিষয়ে দোখলা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা আবদুল আহাদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বাসন্তী রেমা নামের এক আদিবাসী নারী দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের জমি দখল করে চাষাবাদ করছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি শহিদ নামের এক ব্যক্তির কাছে সেই জমি লিজ দেন। শহিদ সেখানে কলার আবাদ করেন। গত ১৪ তারিখ বন বিভাগের লোকজন সেই জমিটি উদ্ধার করতে যায়। তখন আমরা জমি উদ্ধারের অংশ হিসেবে কলা গাছ কেটে ফেলি। এ সময় বাসন্তী রেমা ও অন্যান্য আদিবাসীরা আমাদের ওপরে চড়াও হন। এ সময় তারা আমার অফিস ও সরকারি বাসভবনে হামলা করে ভাঙচুর করে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..