মত-বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় নারী শ্রমিক পাঠাতে সতর্কতা জরুরি

আবদুল মকিম চৌধুরী : আমাদের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ নারী। শিক্ষার উন্নতি, নারী শিক্ষার বিস্তারে সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও নারীর ক্ষমতায়নে নারীরা শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে হিসেবে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়নি। নারী উদ্যোক্তাদের বিভিন্নভাবে প্রণোদনা-সহায়তা করা হলেও সবার জন্য কর্মসংস্থান সম্ভবও নয়। এ লক্ষ্যে বিদেশে পুরুষ জনশক্তি রফতানির পাশাপাশি নারী জনশক্তিও পাঠানো হচ্ছে। কেবল সৌদি আরবেই নারী শ্রমিক পাঠানোর জন্য নিবন্ধিত জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৭১টি (১৯ নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত)। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোও (বিএমইটি) রয়েছে। চলতি বছর (৩১ অক্টাবর পর্যন্ত) বিদেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৮৯ হাজার ৭৩৭ জন। এর মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই গেছেন ৫৩ হাজার ৭৬২ জন, এটি মোট সংখ্যার ৫৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্যান্য দেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা যথাক্রমে আরব আমিরাতে দুই হাজার ১৪৩, কুয়েতে ৭১৮, ওমানে ১০ হাজার ৪৯৬, কাতারে দুই হাজার ৩৪১, লেবাননে এক হাজার ৪২৬, জর্দানে ১৬ হাজার ৪৯২, মালয়েশিয়ায় ১৭, সিঙ্গাপুরে ৯২, যুক্তরাজ্যে এক, হংকংয়ে ১৫০, সাইপ্রাসে ২০, ব্রুনেইয়ে ২০, মরিতাসে ৯৭৫ এবং অন্য দেশগুলোয় ১৮৫ জন।

১৯৯১ থেকে গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা আট লাখ ৮৭ হাজার ৪৩২ জন। এর মধ্যে কেবল সৌদি আরবেই গেছেন তিন লাখ ৩২ হাজার ২০৪ জন। অন্যান্য দেশে যাওয়া নারী শ্রমিকের সংখ্যা যথাক্রমে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক লাখ ৩০ হাজার ৫৭১, কুয়েতে ৯ হাজার ১৯, ওমানে ৮৬ হাজার ১৩২, কাতারে ৩২ হাজার ২৫৯, বাহরাইনে চার হাজার ২৯০, লেবাননে এক লাখ ছয় হাজার ৮৪০, জর্দানে এক লাখ ৫৫ হাজার ৪১১, লিবিয়ায় ৫৩১, মালয়েশিয়ায় ছয় হাজার ৬৩৮, সিঙ্গাপুরে এক হাজার ৩৯৭, যুক্তরাজ্যে ১৫৩, ইতালিতে ৪৬৪, হংকংয়ে এক হাজার ৭৭৬, পাকিস্তানে ৪০, সাইপ্রাসে ১৮১, ব্রুনেইয়ে ১৩৬, মৌরিতাসে ১৭ হাজার ৯২৩ এবং অন্য দেশগুলোয় এক হাজার ৪৬৭ জন।

দুঃখের বিষয় শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের মধ্যে সৌদি থেকে ফেরত নারীর সংখ্যাও বেশি। প্রায় প্রতিমাসেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে ফেরত আসছেন বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীরা। তাদের করা নির্যাতনের অভিযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে আসছে। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি। কিন্তু হাস্যকর বিষয় হলো, এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে এসব অভিযোগ সুষ্ঠুভাবে সমাধান করতে বলেছে সৌদি সরকার। তা না হলে নারী গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সৌদি কর্তৃপক্ষ একতরফাভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে, এ কথা বলে দিয়েছে দেশটি। এতৎসত্ত্বেও আমাদের সরকার বলে আসছে, কোনোভাবেই নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করা হবে না এবং দেশটির নিয়োগকর্তারা নারী গৃহকর্মী নিতে আগ্রহী।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, নারী কর্মীদের পাঠানোর আগে আরবি ভাষা শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে না বাংলাদেশ। সেটি হয়তো সত্য। কিন্তু এটিও সত্য, ওই দেশটিতেই আমাদের নারী শ্রমিকরা নিগৃহীত হচ্ছে বেশি। অদক্ষ-অযোগ্য নারী শ্রমিক পাঠিয়ে যদি বাংলাদেশ ভুল করেও থাকে, সেটির জন্য অবলা নারীদের নির্যাতন করা হবে কেন! কেন তাদের সসম্মানে স্বদেশে ফিরিয়ে দেওয়া হবে না?

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, দেশে ফিরে নারী কর্মীরা যেসব অভিযোগ করেন, সেগুলো যেমন সত্য, তেমনই নারী কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থাপনায় ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত সময়ের নোটিসে একাধিকবার তলবও নাকি করেছে সৌদি আরবের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলে আসছে, নারী কর্মীদের পাঠানোর আগে আরবি ভাষা শিক্ষাসহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে না বাংলাদেশ। আবার দেশে ফিরে তারা নানা অভিযোগ করছেন। অথচ ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ অন্য দেশের নারী কর্মীরা এ রকম অভিযোগ করেন না। তারা সৌদি আরবের পরিবেশ ও কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন, এমন দাবিও করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

তবে সৌদি আরব সরকারের ওই দাবি সত্য নয়। সচেতন অনেকের আছে, নির্যাতনের অভিযোগে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করে দিলে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে সৌদি আরব। ওই বছর ২০ হাজার ৯৫২, ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার ২৮৬, ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪, ২০১৮ সালে ৭৩ হাজার এবং চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩ হাজার ৭৬২ জন, অর্থাৎ মোট তিন লাখ ৬৭ নারী কর্মী গেছেন দেশটিতে।

দুই বছরের চুক্তিতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা মাসে বেতন পান সৌদি মুদ্রায় ৮০০ রিয়াল (প্রায় ১৭ হাজার টাকা)। গৃহকর্মীরা বিনা খরচে সৌদি আরবে যেতে পারেন। অবশ্য নিয়মিত বেতন না পাওয়া, নির্যাতনের শিকার হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে সর্বমোট কতজন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন, সেটির পরিসংখ্যান কোথাও নেই। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, এ সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশের নারী শ্রমিকরা সৌদি আরবের পরিবেশ ও কাজের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেনÑসেটির কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা তা কেন পারছেন না, সেটি কি কখনও খতিয়ে দেখেছে আমাদের দূতাবাস।

কয়েক দিন আগে সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলেছেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মী নির্যাতনের খবর সর্বাংশে সত্য নয়।

রাষ্ট্রদূত না জানলেও সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা আমাদের নারী শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কাহিনি সবার জানা। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে নিয়োগকর্তার বাসার দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এক নারী শ্রমিক। চেষ্টা সফল হয়নি, উল্টো হাত-পা ভেঙে দুই মাস ভর্তি ছিলেন রিয়াদের এক হাসপাতালে। এরপর তার ঠাঁই হয় বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফহোমে (নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র)। সেখান ছিলেন চার মাস। দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরেছেন ওই নারী। দূতাবাসের আশ্রয়কেন্দ্রে কেন শত শত নারী শ্রমিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হন, সেটি কি দূতাবাস কর্মকর্তাদের ভাবায় না? রাজধানীর শাহজালাল বিমানবন্দরে সৌদি থেকে ফেরত নারী কর্মীদের অভিব্যক্তিতে আতঙ্ক ও হতাশার ছাপ। শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। কে তাদের নির্যাতন করল, কে দেবে এর জবাব।

বিদেশের বিমানবন্দরে নারী কর্মীদের পৌঁছিয়ে দেওয়াই যেন নিবন্ধিত জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ। সৌদি আরবের নিয়োগকর্তার লোকজন বিমানবন্দর থেকে কর্মীদের নিয়ে যান। সৌদি আরবে নারী শ্রমিকদের যেসব বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, সে বিষয়ে জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো ধারণা দেয় না, দূতাবাসও পাশে থাকে না। বিদেশ-বিভুঁইয়ে নারী শ্রমিকদের কোনো অভিভাবক নেই।

আমাদের যেসব নারী কর্মী সৌদি আরবে যাচ্ছেন, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই, নেই দেশটির পরিস্থিতি সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা। পবিত্র মক্কা-মদিনা থাকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে দেশটির আলাদা সম্মান ও মর্যাদা আছে। অনেকে মনে করেন, সুযোগ পেলেই হজ পালন করা যাবে। কিন্তু দুই স্থানের অধিকর্তারা আমাদের ধর্মপ্রাণ নারীদের এ অনুভূতির প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল?

সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে আরও নারী কর্মী নিতে চায়। এটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু যে সমস্যাগুলো ঘুরেফিরে সামনে আসছে, সেগুলোর সমাধানে দেশটি কী ভূমিকা রাখছে? আমাদের দূতাবাসই বা কী করছে?

জনশক্তি রফতানিকারকরদের দাবি, সামান্য সমস্যা হলেই আমাদের নারী কর্মীরা দেশে ফিরে আসেন। তারা শুধু ব্যবসাই বোঝেন। অসাধু এসব ব্যবসায়ী জানেন না, আমাদের নারী কর্মীরা শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশ যান, সম্ভ্রম বিকানোর জন্য নয়। নির্যাতন প্রতিরোধে এ ব্যবসায়ীরা কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন?

আমরা চাই, নিঃস্ব হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসী নারীদের সহায়তা দিতে বাধ্য করতে হবে ওইসব প্রতিষ্ঠানকে। সেসব প্রতিষ্ঠান ওই নারীদের নানাভাবে প্রলোভন দিয়ে বিদেশ পাঠিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দায়ী এজেন্সির কাছ থেকে কেবল ক্ষতিপূরণ আদায়ই যথেষ্ট নয়, ব্যবসার অনুমোদন বাতিলসহ তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের জরিমানা আদায় করার বিধানও রাখতে হবে। 

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..