দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যে নব্য কর্তৃত্ববাদী শাসকের উত্থান

সাইফুল ইসলাম হাফিজ : কয়েক দশক ধরে সৌদি আরব বিশ্বদরবারে মর্যাদার স্থান দখল করে আছে। মসজিদুল হারাম ও ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক (সমাধি) সৌদি আরবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র সৌদি আরব। সৌদি আরবের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান বাদশার ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) ক্রাউন প্রিন্স নির্বাচিত হওয়ার পর ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করে সৌদি আরবের সামাজিক রূপ ও পররাষ্ট্রনৈতিক অবস্থান। তার যুবরাজ নির্বাচিত হওয়ার গল্পটাও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি অংশ নেন ২০০৯ সালে তার বাবার উপদেষ্টা হিসেবে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৭ সালের জুন মাসে বাদশাহ সালমান তাকে ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেন। নির্বাচিত হতে তিনি কিছু কূটকৌশল অবলম্বন করেন। তার পথের সব কাঁটা তিনি সরিয়ে ফেলেন। তার আগে যুবরাজ ছিলেন মোহাম্মদ বিন নায়েফ। নায়েফকে সরালেও যুবরাজ হওয়ার জন্য প্রার্থী ছিলেন প্রায় ডজন খানেক। তাবৎ নিয়ম ও রাজপরিবারের প্রথা ভেঙে অ্যালিজিয়েন্স কাউন্সিলকে তাকে যুবরাজ ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়। নায়েফকে এ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বটা এমবিএসই পেয়ে যান। জুন মাসে দায়িত্ব পাওয়ার পরই বিরোধীদের দমন করতে রাষ্ট্রীয় কাজ থেকে সরিয়ে দিতে দুর্নীতি অভিযানের নামে গ্রেপ্তার শুরু করেন, যাতে রাজপরিবারের ১৫-২০ প্রভাবশালী সদস্যকে বন্দি করা হয়।

যুবরাজের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি সৌদি আরবের অর্থনীতি ও সমাজসংস্কারে মনোযোগ দেন। আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য ২০৩০ সালকে লক্ষ করে সৌদি আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কয়েকটি খাতকে পশ্চিমা সাজে সজ্জিত করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর দরুন দেশ-বিদেশে সমালোচনার পাত্র হয়েছেন এমবিএস। বিশেষ করে ২০১৫ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ইয়েমেনের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। ইয়েমেনে লড়াই করতে তাকে প্ররোচিত করার কারিগর হলেন আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজেড)। ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কশাঘাতে ইয়েমেন সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে প্রচুর অস্ত্র ক্রয় করেন এবং বাড়িয়ে তোলেন তেল ব্যবসা। বাদশাহকে নামসর্বস্ব বসিয়ে রেখে গুরুত্বপূর্ণ সব সিদ্ধান্ত তিনিই নিচ্ছেন। তার আমলে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রনীতিতে বেশ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সিংহভাগ সিদ্ধান্তই মুসলমানদের অনুকূলে যাচ্ছে না। যে দেশটি মুসলমানদের দুর্দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিত, সে দেশটি মুসলমানদের কষ্ট দেখেও মুখ খুলছে না। বহির্বিশ্বের মুসলমানদের সহযোগিতার নীতি থেকেও বেড়িয়ে আসতে শুরু করেছে। সহযোগিতার অর্থ তারা ব্যয় করছে বিলাসবহুল জীবনযাপনে।

উইঘুর ইস্যুতে এমবিএস বলেছেন, এটা চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়; তাদের মুক্তির বিষয়ে তিনি কথা বলেননি। কাশ্মীর ইস্যুতেও ভারত সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তিনি দাঁড়িয়েছেন ইসরাইলের পক্ষে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনকে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ঢের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। চেয়েছিলেন তার নেতৃত্বে সৌদি আরবও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। কিন্তু এখানে তার একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো না। যুবরাজ ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলেও বাদশাহ তা করতে নারাজ। এখানে দেখা গেল পিতা-পুত্রের মতের অমিল। এতদিন ভাই ও চাচাতো ভাইদের সঙ্গে বিরোধ ছিল, কিন্তু এখন বাবার সঙ্গেই ঘটল মতপার্থক্য। বাদশাহ দেখছেন ফিলিস্তিনের স্বার্থ, আর তার ছেলে সেই স্বার্থকে উপেক্ষা করে মধ্যপ্রাচ্যে অবাধ বিচরণে ইসরাইলকে সুযোগ করে দিচ্ছেন। আমিরাত-ইসরাইল চুক্তির পর গোটা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও সৌদি আরব ছিল নীরব। বিশ্ব প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে কয়েক দিন পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান ঘোষণা দেন, ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা না হলে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে না রিয়াদ, কিন্তু এমবিএস এতে মুখ খোলেননি। সময়ের দাবি অনুযায়ী, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে সৌদি-ইসরাইলের চুক্তি হওয়া প্রয়োজন। কারণ দাবি আদায়ে সৌদি আরব ইসরাইলের সঙ্গে যে দরকষাকষি করতে পারবে, তা মধ্যপ্রাচ্যের আর কোনো দেশ পারবে না। এমবিএসের এই উদ্যোগ সময়ের দাবিতে ইতিবাচক।

এমবিএস কেন নিয়ম ও প্রথাবিরোধী একতরফা সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন? মোহাম্মদ বিন সালমানের রয়েছে অসীম ক্ষমতার লোভ। রাজনৈতিকভাবে বিশ্লেষণ করলে এমবিএসকে সফল বলা যেতে পারে। পৃথিবীর বড় বড় রাষ্ট্র থেকে সমর্থন আদায় করতে দীর্ঘদিন দিন ধরে চলে আসা তাদের রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার প্রতি কোনো হুমকি যেন সহজেই মোকাবিলা করতে সক্ষম হন, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলসহ বেশ কিছু রাষ্ট্রের সঙ্গে তিনি আঁতাতবদ্ধ হয়েছেন। ২০১৮ সালে জামাল খাসোগি হত্যার ঘটনায় ট্রাম্পের একনিষ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন এবং ভূরাজনৈতিক হুমকি মোকাবেলায়ও তাদের সামরিক সহায়তা পেতেও ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরাইলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। সৌদি আরবকে একটি সেকুলার রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে সমাজসংস্কার করছেন তিনি। সমাজসংস্কার করতে গিয়ে তিনি বাদশাসহ রাজপরিবারের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন। বিশ্বের মুসলমানদের কাছেও হয়েছেন সমালোচনার পাত্র। বাদশার জীবদ্দশায় তার ইচ্ছাগুলো বাস্তবায়ন করার সম্ভাবনা ক্ষীণ থাকলেও মৃত্যুর পর তার পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ঢের। বছরের শুরুতে পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রচার হয়, এমবিএস তার বাবা জীবিত থাকাকালেই বাদশাহ হতে চান! ক্রাউন প্রিন্স হওয়া সত্ত্বেও কর্তৃত্ববাদী শাসকের মতো সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর বাদশাহ নির্বাচিত হলে তার শাসন কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা মোটামুটি আঁচ করা যায়। রাজতন্ত্রের ছত্রছায়ায় সৌদি আরবে কর্তৃত্ববাদের সূচনা করছেন এমবিএস। আর রাজতন্ত্রকে পরিণত করেছেন স্বেচ্ছাচারতন্ত্রে। সৌদি আরবে এই কর্তৃত্ববাদের সূচনা হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতও ঘটতে পারে। আল জাজিরার রাজনীতি বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা সৌদি আরবের প্রভাব-প্রতিপত্তি ধ্বংসের জন্য যুবরাজের বেপরোয়া ভাবধারাকে দায়ী করেন। দুর্নীতি দমন ও তথাকথিত সমাজসংস্কারের নামে কর্তৃত্ববাদী শাসন সবার ওপর চাপিয়ে দিলে তা তার নিজের জন্যও হুমকি হতে পারে। কারণ ইতিহাস বলে, ‘নজদ আমিরাত’ নামে দ্বিতীয় সৌদি আরব ১৮৯১ সালে ধ্বংস হয়েছিল অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিদ্রোহের মাধ্যমে।

শিক্ষার্থী

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..