প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মধ্যবিত্তের চিকিৎসার শহর

ভারতের বিভিন্ন শহরে তুলনামূলক কম খরচেই চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়। সেবাও বিশ্বমানের। এখানে চিকিৎসার আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন মনিরুল ইসলাম মিলন

কেন ভেলোরে চিকিৎসা নেবেন?

ভেলোরে রয়েছে ভারতের বিখ্যাত সিএমসি হাসপাতাল। এখানের মান ও সেবা বিশ্বমানের। সে তুলনায় চিকিৎসা খরচ অনেক কম। এটি খ্রিস্টান মিশনারি পরিচালিত অলাভজনক হাসপাতাল। বাংলাদেশে একটি ভালো মানের প্রাইভেট হাসপাতালে জটিল অপারেশন করতে যে খরচ হয়, তা দিয়ে ভেলোরে ট্রান্সপোর্ট, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসার কাজ পুরোটা সেরে ফেলা যাবে। এখানের প্রায় ২৫ ভাগ রোগী বাংলাদেশি।

ভৌগোলিক অবস্থানঃ

দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাডু। রাজ‌্যের রজধানী চেন্নাই। চেন্নাইয়ে রয়েছে দুটি বিখ্যাত হাসপাতাল। চেন্নাই অ্যাপোলো এবং রামচন্দ্র হাসপাতাল। ভেলোর চেন্নাই থেকে ১৩৩ কিলোমিটার দূরে। এখানেও রয়েছে বিখ্যাত দুটি হাসপাতাল। সিএমসি হাসপাতাল এবং নারায়ণী হাসপাতাল।

তামিলনাডুর কোন হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন?

সিএমসি, নারায়ণী, চেন্নাই এ্যাপোলো এবং রামচন্দ্র এই চারটি বিখ্যাত হাসপাতাল রয়েছে তামিলনাড়– রাজ্যে। আর চোখের জন্য শঙ্কর নেত্রালয়ও রয়েছে, যা চেন্নাই শহরেই অবস্থিত। সময় ও ধৈর্য যাদের রয়েছে, সিএমসি তাদের জন্য ভালো। সিএমসিতে চিকিৎসা বিশ্বমানের। রোগীর আধিক্যের কারণে সবকিছুতে একটু সময় বেশি নেবে। লাইনে দাঁড়াতে হয়, দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয় ওয়েটিং রুমে। এরপর ক্রমঅনুযায়ী চেন্নাই এ্যাপোলো, শ্রীরামচন্দ্র বা নারায়ণী হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেন।

কীভাবে যাবেন?

১। ঢাকা-চেন্নাই : ঢাকা হতে সরাসরি বিমানে চেন্নাই যেতে পারেন। ভাড়া জনপ্রতি ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।

২। ঢাকা-কলকাতা : বাস (এসি) ১৮০০-১৯০০ টাকা, বাস (ননএসি) ১০০০ টাকা। ট্রেন : ১১৬০, ১৬৩৩, ২৩৮৬ টাকা। বিমান : রিজেন্ট- ৭০০০ টাকা, বাংলাদেশ বিমান ৭০০০ টাকা, জেট এয়ার ৭১০০ টাকা, এয়ার ইন্ডিয়া ৭১০০ টাকা (কম-বেশি হতে পারে)।

৩। কলকাতা-চেন্নাই ট্রেন : জেনারেল টিকিট ভাড়া থ্রি টায়ার এসি- ২৫০০ টাকা, ননএসি ১২০০ টাকা। ২৭-৩০ ঘণ্টা ভ্রমণ। বিমান : ৫৫০০-৭০০০ টাকা (কম-বেশি হতে পারে)। প্রায় ২:৩০ ঘণ্টার ভ্রমণ।

৪। চেন্নাই-ভেলোর : ট্যাক্সিক্যাব রিজার্ভ ননএসি ১৫০০-১৮০০ রুপি, এসি ২২০০-২৫০০ রুপি, রেল ভাড়া ২০০ রুপি, বাস ভাড়া ১৫০-২০০ রুপি।

কোথায় থাকবেন?

চেন্নাই এ্যাপোলোতে চিকিৎসার জন্য গেলে হাসপাতালের আশপাশে থাউজেন্ড লাইটস এরিয়াতে খুব কম খরচেই (৫০০-১৫০০ রুপির মধ্যে) হোটেল-মোটেল আর লজ পাবেন।

ভেলোর সিএমসির আশপাশে অসংখ্য হোটেল, লজ পাবেন। লজগুলোয় রান্নার সুবিধার পাশাপাশি ভাড়াও তুলনামূলক কম। ননএসি ১৫০ হতে ৪০০ রুপি। কমপক্ষে তিন দিনের জন্য রুম ভাড়া নিতে হয়।

রেজিস্ট্রেশন ও অ্যাপয়েন্টমেন্টঃ

সিএমসিতে চিকিৎসার শুরুতেই সব বিদেশি রোগী ও তার অ্যাটেনডেন্টকে আইআর অফিসে (রুম নং ৯০০) রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। তার আগে নতুন রোগীদের পি-রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। বাংলাদেশ হতেই অনলাইনে প্রি-রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন বা আইআর অফিসের আশপাশে সাইবার ক্যাফে/কম্পিউটার দোকান হতে ৫০ রুপির বিনিময়ে এটা করে নিতে পারেন। এ সময় একটি প্রিন্টেড কপি পাওয়া যাবে, যা রোগী ও অ্যাটেনডেন্টের পাসপোর্টের মূল ও ফটোকপি আইআর অফিসে জমা দিতে হবে। এবার অপেক্ষার পালা। রেজিস্ট্রেশন, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সবকিছু এখানে হবে। এখানে একটি আইডি নম্বর দেওয়া হবে। বাংলাদেশে চিকিৎসা করালে তারা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন, ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট দেখতে চাইতে পারেন, তাই সবকিছু সঙ্গে রাখা জরুরি। এ সময় তারা আপনাকে একটি ক্রিশ কার্ড করে দেবে। এরপর অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুসারে ডাক্তার দেখাবেন। ডাক্তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেরিতে পেলে দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য আইএসএস বিল্ডিংয়ের ৪৩২ নম্বর কাউন্টারে যোগাযোগ করুন।

ক্রিশ কার্ডঃ

ক্রিশ কার্ড মূলত সিএমসির ডেবিট কার্ড। টাকা নিয়ে ঘুরতে না চাইলে বা হোটেলে টাকা রাখতে না চাইলে আপনার সব টাকা হাসপাতালের নির্ধারিত কাউন্টারে জমা দিয়ে ক্রিশ কার্ডে ভরে নিন। টাকা ভরার সময় আপনাকে রিসিট দিয়ে দেবে এবং ০.০৫% সার্ভিস চার্জ কেটে নেবে। ডাক্তার ভিজিট, ওষুধ কেনা, হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করে সিএমসিতে আপনার যে কোনো বিল ক্রিশ কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে পারেন। এটি চুরি হলেও অন্য কেউ আপনার বিল ছাড়া অন্য কোনো পেমেন্ট করতে পারবে না। কার্ডের পাসওয়ার্ড গোপন রাখুন। ফেরার সময় সামান্য ব্যালেন্স রেখে বাকি টাকা তুলে নিন। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বসে এই কার্ড দিয়েই অনলাইনে আপনি আপনার পছন্দমতো ডাক্তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে আসতে পারবেন।

পুলিশ রিপোর্টঃ

ভেলোরে পৌঁছে রোগী ও রোগীর অ্যাটেনডেন্টকে পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট করতে হয়। এজন্য প্রথমে অনলাইনে ‘সি’ ফরম পূরণ করতে হবে। হোটেল ম্যানেজার ‘সি’ ফরম পূরণে ব্যবস্থা করে দেবেন। এজন্য পাসপোর্ট ও পাসপোর্ট সাইজের ফটো দিতে হবে। প্রতি ফরম পূরণে ৫০ রুপি করে দিতে হয়। তারপর ‘সি’ ফরমের প্রিন্টেড দুই কপি, হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশন ফরম (যদি থাকে), হোটেল/লজের ভিজিটিং কার্ড, পাসপোর্টের মূল ও ফটোকপিসহ ভেলোর পুলিশ স্টেশনে রিপোর্ট করতে হবে।

ভিসা সংক্রান্তঃ

মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে ভেলোরে চিকিৎসা করতে আসুন। চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার আগে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে আপনার ডাক্তারের রিকমেন্ড লেটার নিয়ে সিএমসির আইআর অফিসে যাবেন। সেখান হতে রিকমন্ড লেটার নিয়ে ভেলোর এসপি অফিসে অতিরিক্ত সময় স্টে করার অনুমতি নিন। মেডিক্যাল ভিসা ছাড়া অন্য ভিসায় আপনি এই সুযোগ পাবেন না। অনুমতি ছাড়া ওভার স্টে করলে আপনাকে কিন্তু বেশ ঝামেলায় পড়তে হবে।

সতর্কতাঃ

*  রোগী হিন্দি/ইংরেজিতে কথা বলতে না জানলে অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে হিন্দি বা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে এমন কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন।

* অপারেশনের দরকার হলে মহিলা অ্যাটেনডেন্ট নিয়ে যাবেন। হাসপাতালে রাতে রোগীর সঙ্গে শুধু মহিলা থাকতে পারবে। মহিলা নিয়ে না গেলে নার্সদের বলে আপনাকে একজন আয়া নিতে হবে। আয়ার চার্জ প্রতিদিন ২০০ রুপি।

* হাসপাতালে ডাক্তারের অফিস, ল্যাব, ফার্মেসি, কোনো বিল্ডিং বা যে কোনো স্থান খুঁজে পেতে সিকিউরিটি গার্ডের সাহায্য নিন। চারদিকে সিকিউরিটি গার্ডের লোকেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং কোনো স্থান খুঁজে পেতে তারা দারুণ সাহায্য করে।