পাঠকের চিঠি

মনুষ্যত্বসম্পন্ন জাতি পারবে দুর্নীতিকে রুখতে

পাঠকের চিঠি

দেশমাতৃকার সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা? সেই ব্যথা হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু সোনার মানুষ কি আমরা পেলাম!

দুর্নীতিবাজরা দেশ ও জাতির শত্রু। দুর্নীতিবাজদের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে না কেউ। এসি, ডিসি, ভিসি থেকে শুরু করে বাদ যাননি সচিবরাও। মুক্তিযুদ্ধের সনদ পর্যন্ত চুরি করে নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা বসাতেও এই জাতির সামান্য বুক কাঁপে না। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার নামও শোনা যায় মন্ত্রী-এমপিদের।

দেখা যায়, সরকারি সেবাধর্মী খাতে দুর্নীতি বেশি হয়ে থাকে। সেবা খাতে দুর্নীতি হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাদ যায়নি দুর্নীতি দমন কমিশনও যার উচ্চপর্যায়সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্ত জনগণের হতাশাকে ঘনীভূত করেছে। বড় বড় উন্নয়ন যেমন দৃশ্যমান হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে দুর্নীতির চিত্র।

কভিড বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতের আসল চেহারাও জনসাধারণের সামনে এনেছে। দেখিয়ে দিয়েছে এই খাতটি কতটা দুর্বল। দুর্নীতিতে জড়িয়ে আছেন অনেক স্বনামধন্য ডাক্তার ও নার্স। ভুয়া করোনা রিপোর্ট দেয়া থেকে শুরু করে ব্যবহƒত মাস্ক-গ্লাভস আবারও ধুয়ে বিক্রি করার চিত্র সবকিছুকেই হার মানায়। অনেক ভুয়া চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসার কারণে কত প্রাণ যে ঝরে যাচ্ছে, তার হিসেব কে রাখে? বিশ্লেষকেরা বলেছেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বরাদ্দ ৮০ শতাংশই দুর্নীতিবাজদের পেটে চলে যায়।

সমাজে ধর্ষণ, সন্ত্রাস, নির্যাতনসহ হাজারো অপরাধ সংঘটিত হলেও হচ্ছে না সুষ্ঠু শাস্তি, কমছে না অপরাধ। একইভাবে দুর্নীতিবাজরাও রাজনৈতিক দলগুলোকে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের সুরক্ষিত করছেন। ঘটনার তদন্তে দেখা যায়, বড় কোনো দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো না কোনো বড় রাজনৈতিক নেতাকর্মীর যোগসূত্র আছে।

দুর্নীতির ফলে রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অবক্ষয় বা পচন শুরু হয় এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসনসহ কোনো ক্ষেত্রেই সার্বিকভাবে লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে দলনেত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহশীলতা’ নীতি গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল। তবুও কমেনি দুর্নীতি, থেমে নেই দুর্নীতিবাজরা।

দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়দাতা হিসেবে যেন কোনো রাজনৈতিক নেতা না থাকে, তা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সংস্কৃৃতিতে শুদ্ধাচার ব্যতিরেকে দুর্নীতির কার্যকর প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে ক্ষমতাবান ‘গডফাদার’দের বিচারহীনতা বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে দুদক সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান নয়, এই ধারণা সংশ্লিষ্ট অংশবিশেষের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের ভূমিকার স্বীকৃতি কার্যকর করতে হবে। সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো উপযুক্ত শাস্তি। দুর্নীতিবাজ সে যেই হোক তার অপরাধের জন্য তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ করে কেউ রেহাই পাবে নাÑএই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য দরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা। অপরাধীর প্রতি কোনো স্বজনপ্রীতি অনুভব না করে ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধ বেশি কার্যকর। এজন্য দরকার ব্যক্তির নিজ ও পারিবারিক উদ্যোগ। নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সৎ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। নিজের বিবেকের কাছে যেকোনো কাজ করার আগে প্রশ্ন করা উচিত, ভাবা উচিতÑকাজটা কতটুকু নৈতিক। দুর্নীতি রুখতে আত্মোপলব্ধির চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র আর হয় না। নিজের ও সরকারের যৌথ সহায়তায় যেভাবেই হোক দুর্নীতির ছোবল থেকে দেশকে রক্ষা করা একান্ত জরুরি।

সানজানা হোসেন অন্তরা

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..