সুস্বাস্থ্য

মনোব্যাধি সিজোফ্রেনিয়া…

সিজোফ্রেনিয়া একধরনের মস্তিষ্কজনিত সমস্যা। নারী-পুরুষ সবাই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে এ রোগ ১৫ থেকে ৩০ বছরের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারে না তার কি সমস্যা হয়েছে, কেন ওষুধ খাচ্ছে, কেন ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে। আসলেই সিজোফ্রেনিয়ার একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, সহজে বোঝা যায় না যে, তিনি আক্রান্ত হয়েছেন কি না। তাই এ রোগটি সম্পর্কে জেনে রাখতে পারেন।

কী এই সিজোফ্রেনিয়া

মনোচিকিৎসকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের কর্মপদ্ধতি, বোধশক্তি ও বাস্তবতাকে চিন্তাশক্তির সঙ্গে মিল রাখতে না পারলে অসুখটি শুরু হয়। একে স্মৃতিভ্রষ্টও বলা যায়। সহজ কথায়, রোগাক্রান্ত ব্যক্তি কিছু মনে রাখতে পারে না। এটি একটি মনোব্যাধিÑমানুষ বুঝতে পারে না, কোনটা সত্যি, কোনটা কল্পনা। তাই অনেক সময় রোগী বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তাদের কাছে এ সময় যে কোনো চিন্তা, দৃশ্য, শব্দ প্রভৃতি বিভ্রান্তিকর মনে হয়।

কারণ

সিজোফ্রেনিয়ার জন্য বেশিরভাগ জিন গঠিত বিষয় বা ক্রোমোজোমকে দায়ী করা হয়। মানুষের মস্তিষ্কে নিউরন বা স্নায়ুকোষ অনির্দিষ্ট পরিমাণে থাকে। এসব স্নায়ু বা নিউরনের শেষাংশ বা টার্মিনাল থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। কিন্তু কোনো কারণে যদি অতিরিক্ত নিঃসৃত হয়, তাহলে একজন সুস্থ মানুষের সঠিক বোঝার উপলব্ধি নষ্ট হয়ে যায়। এ সময় স্নায়ুকোষ উল্টোপাল্টা অনুভূতি প্রেরণ করতে থাকে। ঠিক তখনই একজন মানুষ নিজের অজান্তে যা করে, তা-ই সিজোফ্রেনিয়া। তবে বংশগত, পরিবেশ, পুষ্টিজনিত, নানা ধরনের ওষুধ বা অতিরিক্ত ড্রাগসের কারণে এ রোগটি হতে পারে।

লক্ষণ

সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হলে সহজে বোঝা যায় না। তবে মনোচিকিৎসকরা কিছু লক্ষণ তুলে ধরেছেন। সাধারণত তিন ধরনের লক্ষণে বোঝা যাবে সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে কি না।

চিন্তাধারায় গোলযোগ

চিন্তাভাবনা অসংলগ্ন হতে পারে।

# অহেতুক সন্দেহ করা এর অন্যতম কারণ। যেমন, রাস্তা দিয়ে মানুষ যাচ্ছে। মনে হচ্ছে তার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে কেউ তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে হাসছে। সমালোচনা করছে। সর্বক্ষণ এমন অহেতুক সন্দেহ করতে থাকা এর লক্ষণ

# ভ্রান্ত বিশ্বাস করা এ রোগীর লক্ষণ। তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রকাশভঙ্গি নানাভাবে প্রকাশ পেতে পারে। এটা রোগীর বয়স, ধর্মীয় চেতনাবোধ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। যেমন, আশেপাশের লোকজন তার খাবার ও পানিতে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যা করবেÑএমন ভ্রান্ত বিশ্বাস জাগে

# রোগী মনের গোপন কথা কাউকে বলছে না; কিন্তু সে মনে করে আশেপাশের লোকজন তার মনের কথা কোনো অজানা যন্ত্রের মাধ্যমে জেনে যাচ্ছে। এমনটা ভাবতে থাকে

# রোগী মনে করে, তার কাজকর্ম, চিন্তা-চেতনা এগুলো তার নিজের, না বাইরে থেকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে

# মঙ্গল গ্রহ থেকে কেউ যেন তার সঙ্গে কথা বলছে। এমন উদ্ভট চিন্তা তার মনে কাজ করে

# সে স্বপ্নে বিশেষ ক্ষমতা লাভ করেছে। আর তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানুষের সেবা করার জন্য। তার কাছে মনে হয়, সে বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী

# অনেক রোগী মনে করে, তার সঙ্গে পরীর যোগাযোগ রয়েছে। ফলে সে ভাবে তার কাজগুলো নিজে করছে না, সেসব পরীই করিয়ে দিচ্ছে।

আচরণে সমস্যা

# এই হাসছে। আবার কোনো কারণ ছাড়াই কাঁদছে

# হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া। কাউকে আঘাত করতে উদ্যত হওয়া

# কারণ ছাড়াই বকাবকি ও গালিগালাজ করা

# বাথরুমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা

# মানুষের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া

# একা ঘরের মধ্যে বদ্ধ জীবনযাপন করা

# হঠাৎ কাপড় বা অন্য কিছুতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া

# অতিরিক্ত ঘুরে বেড়ানো

# হারিয়ে যাওয়া। যেমন ব্রিজের নিচে, মাজারে কিংবা গোপন জায়গায় কারণ ছাড়াই লুকিয়ে থাকা

# আত্মহত্যার চেষ্টা করা

# উল্টোপাল্টা আচরণ করা

# যুক্তিহীন কথা বলা

# গায়ের কাপড় সবার সামনে খুলে ফেলা

# খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও শরীরের প্রতি খেয়াল না রাখা।

অনুভূতিজনিত সমস্যা

# রোগীর অনুভূতিতেও সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। যেমন, আশেপাশে কোনো লোকজন নেই অথচ রোগীরা কথা শুনতে পায়। কেউ কেউ একদম স্পষ্ট কথা শুনতে পায়

# আবার কখনও ফিসফিস আওয়াজ কিংবা পাখির ডাকের মতো শব্দ শুনতে পায়। এ কথা শোনার কারণে অনেকে কানে তুলা বা আঙুল দিয়ে বসে থাকে

# বিশেষ কিছুর গন্ধ পাওয়া

# চামড়ার নিচে কী যেন হাঁটছে এরকম অনুভূত হওয়া।

উপরোক্ত লক্ষণগুলোর কারণে কারও যদি শিক্ষাজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনে ব্যাঘাত ঘটে এবং লক্ষণগুলো যদি ছয় মাসের অধিক স্থায়ী হয়, তাহলে বুঝতে হবে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এ সময় সঠিক চিকিৎসা ও পরিবারের আন্তরিকতায় রোগীরা ফিরে পেতে পারে তার স্বাভাবিক কর্মজীবন ও সংসারজীবন।

সর্বশেষ..