প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মন্ত্রণালয়-ইউজিসি বৈঠক শিগগিরই: ভর্তি বন্ধ হতে পারে ৩৯ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে

নাজমুল হুসাইন: বিগত সময়ে পাঁচ দফা সময় পেয়েও স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে ব্যর্থ হয়েছে ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এখন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ নতুন কোর্স কারিকুলাম অনুমোদন না দেওয়া এবং শিক্ষার্থী ভর্তিতে ‘সতর্কতা’ জারির ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে বৈঠকে বসবে মন্ত্রণালয়।সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ প্রতিবেদনসহ এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির মধ্যে একটি সমন্বয় সভা জরুরি। সেটি করতে শিক্ষামন্ত্রী আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।’

এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান শেয়ার বিজকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই এমন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে বৈঠকের দিন এখনও চূড়ান্ত হয়নি।’

বৈঠকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমরা তথ্য দিয়েছি। বৈঠকে আমাদের মতামত জানাবো। তবে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরই।’ প্রসঙ্গত, এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাপারে কয়েক দিন ধরেই সরকার পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের আভাস দিচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গতকাল বুধবারও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনও তাদের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করতে পারেনি। পাঁচ দফা সময় দেওয়ার পরও এভাবে চলতে পারে না। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি, এখনও একাধিক ক্যাম্পাসে পাঠদান করাচ্ছে, তাদের শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ কয়েকটি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই এ ব্যবস্থা দৃশ্যমান হবে।’

জানা গেছে, অবস্থাভেদে অভিযুক্ত ৩৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি তালিকা করা হয়েছে। প্রথম তালিকার থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে যারা এখনও কোনো জমি কেনেনি, সেসব। জমি কিনেছে এবং তাতে ভবন নির্মাণাধীন এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রয়েছে দ্বিতীয় তালিকায়। আর জমি কিনেছে, কিন্তু ভবনের কাজ এখনও শুরু করেনি এগুলো রয়েছে তৃতীয় তালিকায়।

গত বছরের জানুয়ারিতে এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বশেষ সতর্কতা নোটিস দেওয়া হয়। শেষবারের মতো সময় দিয়ে তাদের এক বছরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে না পারলে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের পাশাপাশি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি ছিল তাতে। পঞ্চম দফায় দেওয়া সে সময় শেষ হয়েছে এ বছরের জানুয়ারিতে।

প্রসঙ্গত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সাত বছরের মধ্যে যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাবে, তাদের পাঠদানের স্বীকৃতি বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রথম দফা সময় দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালে, তৃতীয় দফায় ২০১৩ সালে, চতুর্থ দফায় ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময় ছিল। তারপরও সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২৪ জানুয়ারি সময় বাড়ানো হয়।

এদিকে সূত্র বলছে, এসব অভিযুক্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক-কর্তৃপক্ষ আরও সময় চায়। এ জন্য তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ে চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেকে আবার স্থায়ী কাম্পাসের জন্য সরকারের কাছেই জমি চাইছে। তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে তারা শিক্ষামন্ত্রীর সাক্ষাৎ চেয়েও চিঠিও দিয়েছে। কিন্তু তাদের আর সাক্ষাৎ দিতে রাজি নন মন্ত্রী।

ইউজিসির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্সি এবং ইবাইস ইউনিভার্সিটি জমি কেনেনি। এছাড়া ইবাইস, প্রিমিয়ার ও সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মালিকানায় দ্বন্দ্ব রয়েছে। এছাড়া নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণ করছে এমন ক্যাটাগরিতে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো হচ্ছে: আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (এআইইউবি), নর্দান ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, লিডিং ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অব সায়েন্স, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। তবে শেষটির বিরুদ্ধে শিক্ষাবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।

নির্ধারিত পরিমাণ জমি কিনে ক্যাম্পাস নির্মাণ করছে, কিন্তু কার্যক্রম চালু করেনি, এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, আশা ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি ও প্রাইম ইউনিভার্সিটি। এর মধ্যে প্রাইম এবং সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম জমিতে ক্যাম্পাস করছে।

অপরদিকে জমি কিনেছে কিন্তু কাজ শুরু হয়নি, অগ্রগতিও সন্তোষজনক নয়, এমন ১০ বিশ্ববিদ্যালয় হলো: স্টেট ইউনিভার্সিটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া ও স্টামফোর্ড অন্যতম। এ ক্যাটাগরিতে ব্র্যাক, শান্ত-মারিয়াম এবং সাউথইস্ট ও মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি আছে বলেও জানান মন্ত্রণালয় কর্মকর্তারা।

এর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া কেন বন্ধ করা হবে না মর্মে শোকজ নোটিস দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এছাড়া গত বছর দেওয়া আলটিমেটামের সময় সাউথইস্ট ও মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির ফাউন্ডেশনের নামে জমি ছিল। এক বছর পরও ফাউন্ডেশনের নামের জমিতেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে স্থানান্তর করেনি। এ দুই বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।