এসএমই

মহাদেবপুরের টুপি রফতানি হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে

একটি বিশেষ কায়দায় সেলাইয়ের পর ভাঁজ করে কাপড় দিয়ে বানানো হচ্ছে টুপি। সবার হাতে সুই-সুতা ও কাপড়। সুইয়ের ফোঁড়ে নান্দনিক নকশা ফুটে উঠছে একেকটা কাপড়ে। এসব টুপি তৈরি করছেন গ্রামীণ নারীরা। আর এ টুপি তৈরির আয় থেকে নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার হাজারো নারীর অভাবের সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা। এসেছে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য। নারীদের বেশিরভাগই প্রত্যন্ত পল্লির দরিদ্র শ্রেণির। তারা এক সময় অসচ্ছল ছিলেন। অতিকষ্টে চলত তাদের সংসার। অন্নের জোগাড় হলেও সন্তানের পড়ালেখার খরচ জুটত না। এরকম কষ্টের মধ্যে থাকা নারীরা আজ টুপি তৈরি ও বিপণন করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।
টুপি তৈরি থেকে পাওয়া টাকায় প্রয়োজন মিটিয়ে এখন তারা সঞ্চয়ও করছেন। সঞ্চয়ের এ টাকা সংসারের আপদকালে গ্রামীণ নারীদের বেশ উপকারে আসছে। মনের বাসনাও পূরণ করছেন সংসারের আসবাব কিনে। আশার কথা, সারা বছরই টুপি তৈরি করা যায় অফ সিজন বলে কিছু নেই। সারা বছরই সিজন। তবে বছরে দুই ঈদ মৌসুমে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়।
জানা গেছে, উপজেলার অনেক নারী আগে সংসারের কাজ সেরে দিনের অনেকটা সময় ঘরে বসে বা পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্পগুজবে কাটাতেন। কিন্তু এখন বিভিন্ন গ্রামের অগণিত নারী ব্যস্ত রয়েছেন টুপি তৈরিতে। তারা টুপি তৈরিতে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে, কারও সঙ্গে কথা বলারও সময় পান না। কারণ তাদের নকশা করা টুপি দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের বাজার দখল করেছে। এ টুপি যাচ্ছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তাদের বদৌলতে দেশে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা।
উপজেলার সুলতানপুর, শিবগঞ্জ, তাতারপুর, ধর্মপুর, উত্তরগ্রাম, শিবরামপুর, ভালাইন, কুঞ্জবন, মধুবন, লক্ষণপুর, চামচন্দ্রপুর, খাজুর, রনাইল, রামরায়পুর, বাগডোব, ডিমজাউন, ফাজিলপুর, চকগোবিন্দ, বিলমোহাম্মদপুর, গোপীনাথপুর ও খোসালপুরসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার পরিবারের নারীরা এ বিশেষ ধরনের টুপি তৈরির কাজের সঙ্গে জড়িত। আগে এসব পরিবারের নারীরা শুধু পুরুষ সদস্যের আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন টুপি তৈরির মাধ্যমে বাড়তি আয় যোগ করে সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা। গৃহবধূসহ স্কুল-কলেজপড়–য়া মেয়েরাও টুপি তৈরির কাজ করেন। আর ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে তাদের চরম ব্যস্ততা বেড়েছে। বাড়ি বাড়ি চলছে টুপি তৈরির কাজ। কেউ বাড়ির উঠানে আবার কেউ দলবদ্ধভাবে টুপি তৈরি করছেন।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বিদেশি ব্যবসায়ীদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নকশার ছাপ দেওয়া সাদা রঙের টুপির কাপড় ও সুতা এসব কারিগরদের কাছে পৌঁছে দেন। এসব কাপড়ে সুই-সুতা দিয়ে সুন্দর নকশা ফুটিয়ে তোলেন নারীরা। নকশা তৈরিতে সময় ও শ্রমের ওপর ভিত্তি করে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। টুপিতে নকশা তৈরির কাজে একজন নারীর মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা আয় হয়। বেশিরভাগ বোতাম ও চেইন সেলাই টুপি তৈরি করা হয়। বোতাম সেলাই টুপির পরিশ্রম একটু বেশি। পারিশ্রমিক ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকা। তৈরিতে সময় লাগে সাত থেকে ১০ দিন। চেইন সেলাই টুপি সহজ। সময় কম লাগে। কাজও দ্রুত হয়। এর পারিশ্রমিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক খুবই কম।
উপজেলার মধুবন গ্রামের গৃহবধূ সাজেদা খাতুন। টুপির প্রাথমিক কাজটি করেন তিনি। তিনি বলেন, এক থান কাপড় থেকে প্রকারভেদে ৯০ থেকে ১০০টি টুপি তৈরি হয়। পলিথিনের কাগজে সুই দিয়ে বিভিন্ন ফুলের ডিজাইন করা হয়। এরপর সাইজ করা টুপির কাপড়ে ডিজাইন পলিথিন রেখে তেল ও ব্লু (নীল রং) দিয়ে ছাপ দেওয়া হয়। ছাপ দেওয়া ফুলের ওপর সিঙ্গার মেশিন দিয়ে সেলাই করা হয়। এ কাজটি করতে এক থেকে দুই দিন লাগে। মজুরি ৭০০ টাকা। এরপর এ টুপিটি বিভিন্ন কারিগরদের কাছে হাতের কাজ করতে দেওয়া হয়।
খোসালপুর গ্রামের রাবেয়া খাতুন বলেন, অভাবের সংসারে কোনো দিন খাই তো কোনো দিন খাই না। তাই এক প্রতিবেশীর উৎসাহে টুপিতে নকশা তোলার কাজ শুরু করি। স্বামী ও নিজের আয় দিয়ে এখন সংসার চলছে স্বচ্ছন্দে। নিজেদের উপার্জিত টাকা দিয়ে তিন শতক জমি কিনে সেখানে ইটের বাড়িও তুলেছি। শুধু রাবেয়াই নন, জোসনা খাতুন, মারিয়া আক্তার, মুক্তা বানু, মাসুদা রহমান, নাছিমা বেগম ও মোসাম্মৎ মাবিয়াসহ হাজার হাজার নারী টুপি তৈরি করে প্রতি মাসে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন।
কলেজছাত্রী রিক্তা খাতুন বলেন, পড়ালেখার পাশাপাশি টুপি তৈরি করে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করা যায়। এতে কলেজে যাওয়া-আসার খরচসহ আনুষঙ্গিক কাজে ব্যয় করি। পরিবারের প্রয়োজনেও পাশে থাকতে পারি। তবে পরিশ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিকটা একটু কম বলে মনে করেন তিনি।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুলতানা আক্তার বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি টুপি তৈরির কাজ করি। এ থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে কাগজ-কলম ও হাতখরচসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় করি।
টুপি ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম বলেন, আগে শুধু এক ডিজাইনের টুপি তৈরি হতো। এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টুপিরও বাহারি নাম ও ডিজাইন দেওয়া হয়েছে। যেমন নব্বইফুল, কলারফুল, বকুলফুল, তালাচাবি, স্টার, গুটি, বিস্কুট, আনারস, মৌচাক ও মাকড়সার জাল। সবচেয়ে বেশি দাম নব্বইফুল ও আনারসের। এসব টুপি ঢাকার চকবাজার, বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটসহ রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে পাঠানো হয়। সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। তিনি আরও বলেন, কাপড় ও নকশাভেদে এসব টুপি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সারা বছরই আমরা কারিগরদের টুপির অর্ডার দিয়ে থাকে। তবে ঈদ উপলক্ষে টুপির চাহিদা বেড়ে যায়। এবারের ঈদেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

এ কে সাজু, নওগাঁ

 

 

 

সর্বশেষ..