প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি ও জনজীবনের অসহায়ত্ব

মো. জিল্লুর রহমান: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবন এমনিতেই ওষ্ঠাগত। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় দফায় দফায় মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস, পেঁয়াজ ও শাকসবজি থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই, যার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে, মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতি ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে পারছে না। বাজারে অগ্নিমূল্যে ভোক্তারা নির্বিকার, বিশেষভাবে নিন্মআয়ের মানুষ যা আয় করছে, তার পুরোটাই জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা প্রভৃতির জন্য ব্যয় করার মতো অর্থ তাদের হাতে আর থাকছে না। সরকারের টিসিবির ট্রাকের সামনে ভোক্তাদের দীর্ঘ লাইনই বলে দেয় তারা দ্রব্যমূল্যের কাছে কতটা অসহায়! তারা না পারে বলতে, না পারে সইতে।

মাথাপিছু আয় যে হারে বেড়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য। কারণ একটাই, তা হচ্ছে বাজারের ওপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই বাজার মনিটরিং, তদারকি এবং সে অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সব থেকে বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে পড়ে নিন্মবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত সৎ সরকারি কর্মচারী, প্রবীণ জনগোষ্ঠী ও নিন্মআয়ের প্রান্তিক মানুষ। সবচেয়ে বেশি কষ্টকর পরিস্থিতিতে রয়েছেন অধিকাংশ প্রবীণ। তারা না ঘরের মড়া, না ঘাটের মড়া। যেসব চাকরিজীবী সৎভাবে চাকরিজীবন কাটিয়েছে, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। কারণ চাকরিজীবনে তাদের সঞ্চয় পেনশন বা গ্র্যাচুইটির টাকাই একমাত্র সম্বল। জীবনের শেষ সম্বল এ সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে তারা সঞ্চয়পত্র কিনেছে। এ সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা দিয়ে তাদের সংসার ও জীবনযাত্রা সম্পূর্ণভাবে নির্বাহ করতে হয়। যেন নুন আনতে পানতে ফুরায় অবস্থা, কিংবা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা!

অনেকের বিশেষ করে হতদরিদ্র মনিুষের অভিযোগ, সরকার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে একদম নির্বিকার। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিপাকে ফেলছে। একবার যে পণ্যের দাম বাড়ে, তা আর কমে না। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা এ ব্যাপারে কাজ করলেও তা তেমন কার্যকর ভূমিকা না রাখায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর কার্যক্রমও প্রত্যাশিত মানের নয়। ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে তারা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণে কী  ভূমিকা রাখছেন, তা সর্বসাধারণের বিচার্য।

অর্থনীতিবিদরা মুদ্রাস্ফীতিকে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে গণ্য করেন। কারণ মুদ্রাস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, মধ্য ও নিন্মবিত্ত আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে দেয় এবং ভোক্তাদের জীবনমানকে দুর্বিষহ করে তোলে। মানুষ একসময় হতাশায় নিমজ্জিত হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতির অস্থিরতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের ভোজ্যতেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য কেজিপ্রতি দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছেছে। সম্প্রতি সয়াবিন তেল নিয়ে ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও লুকোচুরি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

কভিড মহামারির পর এমনিতেই সব মানুষের আয়-রোজগার কম। অনেকে চাকরি ও কর্ম হারিয়ে দিশাহারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। কৃষকও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এর মধ্যে লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও সিন্ডিকেট চক্র। তাদের দৌরাত্ম্য এত বেশি যে, তাদের হাতে জিম্মি খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাসাধারণ। সরকার যতই বলুক তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে, আসলে মনে হয় সিন্ডিকেট চক্র সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার যা করছে, তা পুরোটাই লোকদেখানো নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে দ্রব্যমূল্যের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কৃষকরা পেঁয়াজসহ অন্যান্য শস্য উৎপাদন করে ন্যায্য মূল্য পায় না, ফলে তারা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে।

বর্তমানে চাল, তেল, পেঁয়াজ, মাছ মাংস, শাকসবজি প্রভৃতি নিত্যপণ্যের দাম বেড়েই চলছে। প্রতিটি পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসাবে ব্যবসায়ীরা এক একটি অজুহাত দাঁড় করান এবং সরকারও তাদের সঙ্গে সমস্বরে সুর মেলায়। অথচ কিছু পণ্য আছে সরবরাহে ঘাটতি না থাকার পরও দাম বেড়ে যায়। তাছাড়া অতিরিক্ত টাকা দিলে এমন কোনো পণ্য নেই, যা বাজারে পাওয়া যায় না; অর্থাৎ আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। আর এর মাশুল গুনছে সাধারণ মানুষ। নিত্যদিন তাদের পকেট কাটছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই, ভোক্তারা চরম অসহায়।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃদ্ধি পেয়েছে উৎপাদন খরচ, পরিবহন-ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা খাতের ব্যয়। সরকারি-বেসরকারি সেবার দামও বাড়ছে। যে হারে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে সে হারে মানুষের আয় বাড়ছে না। দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। একটি পরিবার কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে নির্বাহ করবে তা নির্ভর করে তাদের আয়, চাহিদা ও দ্রব্যমূল্যের ওপর। প্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় পর্যায়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সাধারণ মানুষের আর্থিক সংগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে যায়, তখন দরিদ্র এবং অতিদরিদ্র পরিবারে শুরু হয় অশান্তি। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে একদিকে জনজীবনে নেমে আসে কষ্টের কালো ছায়া। অন্যদিকে মুনাফাখোর, কালোবাজারিদের কারণে দেশে বিরাজ করে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।

পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে ন্যায়সংগত মূল্যে কোনো পণ্যই আর পাওয়া যায় না। প্রতিটি পণ্যেই যেন অধিক মূল্যের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। অথচ এক বা দুই দশক আগেও এই অবস্থা ছিল না। মানুষ জীবন কাটাত সাধ্যের মধ্যে ভালো থেকে। শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় আট মণ চালের কথা যেন সময়ের রূপকথা। ব্রিটিশ শাসনামলেও দেশের দ্রব্যমূল্য ছিল নিয়ন্ত্রিত অবস্থায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর দেশের অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন হলেও দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে ছিল। সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে। ইদানীং শোনা যায়, বেঁচে থাকার তাগিদ থেকেও কেউ কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, যা খুবই উদ্বেগজনক চিত্র।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করতে হলে সর্বপ্রথম রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধভাবে দ্রব্য পাচার রোধ ও মজুতদারি রোধ করতে পারলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে না। বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় কৃষির উৎপাদন বাড়াতে এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে কৃষিজমি থেকে সর্বোত্তম ফসল লাভের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, প্রচুর সার ও সেচ ব্যবস্থার সমন্বয় করতে হবে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন বাড়লে দাম এমনিতেই স্থিতিশীল থাকবে। বাজারের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। মুনাফাখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা গুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন শুরুর মাধ্যমে পণ্যের জোগান ঠিক রাখতে হবে।

আমাদের মাথাপিছু আয় ১৯৭২ সালে ছিল প্রায় ১২৯ ডলার, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৮২৪ ডলার এবং গত বছর ছিল দুই হাজার ৫৯১ ডলার। অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় ২২ গুণ বেড়েছে। মজার বিষয় মাথাপিছু আয় বেশি হওয়া মানেই যে কোনো দেশের মানুষ খুব ভালো আছে তা নয়। আমাদের অনেকের ধারণা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মানেই দেশ অনেক উন্নত হয়েছে, কিংবা মানুষের জীবনমানের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি মানেই যে একটি দেশ খুব ভালো আছে, তা কিন্তু নয়। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি সুষমভাবে সম্পদ বণ্টিত হচ্ছে কি না, সেটা মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তি। কারণ ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম। গত কয়েক বছরে দেশে দৃশ্যমান অনেক উন্নতি হয়েছে এবং প্রবৃদ্ধির হিসাবে অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এই মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পায়নি। পেয়েছে গুটিকয়েক মানুষ। এ কারণে মাথাপিছু আয়ের হিসাবটা বরাবরই শুভঙ্করের ফাঁকি। অনেকে দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ে। তাদের গড় সম্পদ বেশি বলে হিসাব করা হয়। এতে হকার, রিকশাচালক, গার্মেন্ট শ্রমিক, বেকার সবাইকে মধ্যবিত্ত দেখানো হয়। আর মাঝখান থেকে দুর্বৃত্তদের ফুলেফেঁপে ওঠার দৃশ্যটা ঢাকা পড়ে যায়।

মোটকথা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধি ছাড়া সাধারণ মানুষের পকেট ভারী করে না। অসহনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও কষ্টের সম্মুখীন হয় স্বল্প আয়ের প্রান্তিক মানুষ। সুতরাং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি নয়, বরং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বাজারের ওপর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ী যাতে যথেচ্ছ পণ্য মূল্য বাড়াতে না পারে, সেজন্য দেশের সাধারণ মানুষকেও সচেতন থাকতে হবে।

ব্যাংক কর্মকর্তা ও মুক্ত লেখক

[email protected]