প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে জিম্মি করে নির্যাতন, চিত্রনায়ক সহ উদ্ধার ২৮ ভুক্তভোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক: নিখোঁজের প্রায় ৯ মাস পর এক চলচ্চিত্র নায়ককে গাজীপুরের একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব। মঙ্গলবার গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ওই চিত্রনায়কসহ ২৮ জনকে উদ্ধার করা হয়। এসময় মাদক নিরাময় কেন্দ্রের আড়ালে মাদক ব্যবসা, রোগীদের শারীরিক নির্যাতন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় ভর্তি রেখে অর্থ আদায় এবং অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রের মালিক নাজনীন ফিরোজা বাধনসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর বসিলা র‌্যাব-২ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গত ১ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সমিতির’ পক্ষ থেকে র‍্যাব-২ এর কাছে অভিযোগ করা হয় যে, একজন চিত্রনায়ক দীর্ঘদিন তাদের কার্যক্রমে অনুপস্থিত রয়েছেন। ওই চিত্রনায়ককে গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে আটক রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে।

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে র‍্যাব সদর দফতর ও র‍্যাব-২ এর গোয়েন্দা দল অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য গাজীপুর সদরের ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে থাকে।

অভিযোগের সত্যতা ও নিরাময় কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়মের সম্পর্কে জানতে পেরে গতকাল (৪ জানুয়ারি) বিকেলে র‍্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখা ও র‍্যাব-২ এর একটি দল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রতিনিধিসহ ভাওয়াল মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে আটকে রাখা চিত্রনায়কসহ ২৮ জনকে উদ্ধার করা হয়।

অভিযানকালে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের আড়ালে রোগীদের নির্যাতন ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে মালিক ফিরোজা নাজনিন ওরফে বাঁধন (৩৫), তার স্বামী মনোয়ার হোসেন ওরফে সিপন (৩১), কর্মচারী রায়হান খান (২০), দিপংকর শাহ ওরফে দিপু (৪৪) ও জাকির হোসেন আনন্দকে (২৭) আটক করা হয়। এসময় ওই কেন্দ্রে তল্লাশীকালে ৪২০ পিস ইয়াবা, নির্যাতনে ব্যবহৃত লাঠি, স্টিলের পাইপ, হাতকড়া, রশি, গামছা, খেলনা পিস্তল ও কথিত সাংবাদিকের পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়।

তিনি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া ওই নায়ক করোনাকালীন সময়ে পাঁচটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। যার কোনোটিই মুক্তি পায়নি। এরমধ্যে তার তিনটি রেস্টুরেন্টও ছিল। সেখানে ব্যবসাতেও লোকসান করে হতাশা-বিষাদে ভেঙে পড়েন। অর্ধকোটি টাকা ঋণে জর্জরিত হয়ে হতাশায় তিনি নিয়মিত ঘুমের ওষুধ সেবন শুরু করলে তার আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। পরে ২০২১ সালের মার্চ মাসে তার মা চিকিৎসার জন্য তাকে ভাওয়াল মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তবে ডোপ টেস্টে তাকে মাদকাসক্ত পাওয়া না হলেও তিন লাখ টাকা ভর্তি ফি ও ৫০ হাজার টাকা মাসিক খরচায় চিকিৎসার জন্য তাকে সেখানে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে তিন মাস পরপর ভিকটিম নায়ককে অসুস্থ দেখা যেতো। মূলত চিকিৎসার নামে তাকে আটকে রেখে প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা আদায় করাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য।

গ্রেপ্তার ফিরোজা নাজনিন বাঁধনকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত কমান্ডার মঈন বলেন, তিনি ২০০৯ সালে ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রটি অনুমোদনহীনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৩-১৪ সালে সাময়িক অনুমোদন পায়। প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি নিজেই। কর্মী সংখ্যা ৪ জন এবং রোগীর সংখ্যা বর্তমানে ২৮ জন। তিনি যে ভবনটিতে থাকতেন সেটির ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে ৪০ হাজার টাকা বাড়ির মালিককে পরিশোধ করতেন।

খন্দকার আল মঈন বলেন, ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে নির্যাতিত ভিকটিমরা জানিয়েছে, বাঁধন প্রতি রোগীর কাছ থেকে মাসিক চার্জ হিসাবে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে আদায় করতেন। নিরাময় কেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক থাকার কথা বললেও কোনো চিকিৎসককে অভিযানকালে পাওয়া যায়নি। সেখানে ২০ জন রোগীর চিকিৎসার অনুমোদন থাকলেও ২৮ জন রোগী পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, যেভাবে নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করার কথা, চিকিৎসা দেওয়ার কথা, রোগীদের সেবা করার কথা তার ব্যাপক অনিয়ম এখানে পাওয়া যায়। নিরাময় কেন্দ্রে রোগীদেরকে চিকিৎসার নামে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি করা হতো। এখানে চিকিৎসার নামে রশির সাহায্যে ঝুলিয়ে শারীরিক নির্যাতন করা হতো।

র‌্যাব জানায়, মালিক এবং কর্মচারীদের তৎক্ষণাৎ র‍্যাপিড ডোপ টেস্টের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া যায় তারা সকলেই মাদকাসক্ত। মূলত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের নামের আড়ালে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করা হতো। এলাকায় মাদকগ্রহীতারা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের নিকট হতে মাদক সংগ্রহ করতো।

গ্রেপ্তার বাঁধন ২০০৯ সালে ভাওয়াল মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করে। তার গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট। তার প্রথম স্বামীর সাথে ডিভোর্স হওয়ার পর মনোয়ার হোসেন ওরফে সিপনের সাথে দ্বিতীয় বিবাহ সম্পন্ন হয় বলে সে জানান। সিপন তার সাথে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে বসবাস করত। তিনি একটি ভুঁইফোড় পত্রিকার সাংবাদিক হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন।

গ্রেপ্তার সিপনের গ্রামের বাড়ি গাজীপুর। বাঁধনের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন সে। সিপন ২০১৬ সালে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মূলত তিনি ও তার গুণ্ডা বাহিনী শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং নিরাময় কেন্দ্রের ঘটনাসমূহ কাউকে না বলার জন্য ভিকটিমদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন ও জখমের ভয়ভীতি প্রদর্শন করতেন।

এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা ভাওয়াল মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় বলেও জানায় র‌্যাব।

এ বিষয়ে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান বলেন ‘আসলে ওই অভিনেতা এত দিন কোথায় ছিল, আমরা জানতাম না। আমরা তাকে অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। ওর সমিতির চাঁদাও বাকি ছিল। গত ১ তারিখ আমি মা-বাবার কবর জিয়ারত করছিলাম। হঠাৎ করে একটি ফোন আসে। আমি সেই ফোন পেয়ে অবাক হয়ে যাই। কারন ওই অভিনেতা ফোন দিয়েছিল। কোথায় থেকে ফোন দিয়েছিল জানি না। শুধু বলেছিল, তাঁকে আটকে রেখে ৯ মাস ধরে যৌন নির্যাতন করে এক নারী। আরো অনেককেই নাকি আটকে রেখে ছিল। পরে বিষয়টি র‌্যাবকে জানাই।’

এদিকে ওই অভিনেতাকে আটকে রেখে যৌন নির্যাতন চালানো হতো- ফেসবুকেও এমনটা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন জায়েদ খান। তিনি পোস্টে বলেন, ‘চিত্রনায়ক অনিক রহমান অভি মাদকাসক্ত না হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ ৯ মাস শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে শারীরিক যৌন নির্যাতন চালাতেন ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক এক নারী। বিষয়টি গোপন সূত্রের ভিত্তিতে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে র‍্যাব অভিযান চালিয়ে সেখানে চিত্রনায়ক অভিসহ আরো ২০ জনকে উদ্ধার করেছে। সেখানে জানানো হয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ অভিযান পরিচালনার সময় মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন!’

চিত্রনায়ক অনিক রহমান অভি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া অভিনেত্রী পপির সঙ্গে অভিনয় করেছেন সাহসী যোদ্ধা চলচ্চিত্রে। এ ছাড়া চটপটি ভালোবাসা, দুষ্টু ছেলে, ভালোবাসা ডটকমসহ একাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।