প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মাদক থেকে নিজে বাঁচুন দেশকে বাঁচান

 

মাদক ও মাদকাসক্তির হার কমাতে সরকার আন্তরিক। এ কাজে তাকে সহায়তা করছে জাতিসংঘ। এর পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। মাদকের অপকারিতা ও এর সর্বনাশ গ্রাস থেকে উত্তরণের উপায় বর্ণনা করেছেন বীকন পয়েন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট (অপারেশন) মোহাম্মদ হানিফ। তার মতামতের শেষ কিস্তি ছাপা হলো আজ

 

শাহানাজ সুলতানা

 

মাদকাসক্ত ব্যক্তির সুস্থতা ও চিকিৎসা সহায়তা

আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি অসুস্থ। সে মানসিকভাবে অসহায়; তবে পাগল নয়। শুধুই অসুস্থ। সঠিক ভালোবাসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে তাকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাকে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে রেখে সঠিক পরামর্শ ও সহায়তার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে নয়, মাদককে ঘৃণা করতে হবে।

 

মাদকাসক্তের চিকিৎসা শেষে অভিভাবকের ভূমিকা

মাদকের কারণে পরিবার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মাদকাসক্তরা। তাদের সঙ্গে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের গড়ে ওঠে অস্বস্তির এক দেয়াল। এমনকি চিকিৎসা শেষে সে চাইলেও তার একার পক্ষে চট করে এ দেয়াল ভাঙা সম্ভব হয় না। তাই অভিভাবকসহ পরিবারের সব সদস্যকে এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। মনে রাখা দরকার, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নদের পক্ষে একা একা মাদকের মতো ভয়ঙ্কর সমস্যা মোকাবিলা করা সহজ নয়। পরিবারের যৌথ প্রচেষ্টায় একজন রিকভারি মাদকবিহীন নতুন জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। এখানে পরিবারের বন্ধুত্বপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ অভিভাবক ও অন্যান্য সদস্য কীভাবে গড়ে তুলতে পারেন, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

 

বন্ধুত্বপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তুলুন, নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখুন

আপনার পরিবারের সদ্য নেশামুক্ত সদস্য কেমন আছে, তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি-না আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করুন। তার অনুভূতি জানতে চান। এটি নিয়মিতভাবে করুন। শুরুতে সে খানিকটা অস্বস্তি বোধ করতে পারে, তবে আপনার অকৃত্রিম আগ্রহে এক সময় সহজ হয়ে উঠবে। দীর্ঘদিনের অনভ্যস্ততার দরুন অনেক অভিভাবক এরকম উদ্যোগের ক্ষেত্রে নিজেরাই আড়ষ্ট বোধ করেন। এ আড়ষ্টতার দেয়াল ভেঙে ফেলুন। আপনার এ উদ্যোগে সে তার জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে উৎসাহী হয়ে উঠবে, আর বাড়িতে বইবে স্বস্তির সুবাতাস।

বলে রাখা ভালো, কোনো কোনো অভিভাবক খোঁজ-খবরে এতটাই উৎসাহী হয়ে ওঠেন যে, সার্বক্ষণিক গোয়েন্দার মতো পেছন লেগে থাকেন। এ তৎপরতা রিকভারিকে হতাশ করে তুলবে সন্দেহ নেই।

 

গড়ে তুলুন আলাপচারিতার পরিবেশ

আপনার পরিবারে মাদকনির্ভর সদস্যটি চিকিৎসা শেষে এখন নেশামুক্ত। তাকে ঘিরে বিপর্যস্ত হয়ে পড়া গোটা পরিবারের স্বাভাবিক আবহকে ফিরিয়ে আনার জন্য আরেকটি উদ্যোগ নিন, পরিবারে গড়ে তুলুন আলাপ-গল্প, হাসি-ঠাট্টার সহজ ও আনন্দঘন পরিবেশ। দূর করে দিন অস্বস্তিকর, গুমোট-আড়ষ্ট আবহ।

 

মতামতের সুযোগ দিন

শুধু তার নিজের বিষয়ে নয়, পরিবারের যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় তাকে ডাকার কথা ভাবছেন? ডেকেই ফেলুন। আশা করি আপনি নিরাশ হবেন না। আশ্চর্য হয়ে দেখবেন, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত দিতে সেও কম নয়। পরিবারে নিজেকে গুরুত্ব¡পূর্ণ ভাবতে শুরু করবে সে। মাদকনির্ভরশীল ব্যক্তির পুনর্বাসনের জন্য এটা খুবই দরকার।

 

স্বীকৃতি দিন মন খুলে

ব্যক্তির নেশার ইতিহাস কেবল পিছিয়ে পড়ার ইতিহাস। নেশাই তাকে এতদিন সব ভুলিয়ে রেখেছিল। নেশা ছেড়ে উপলব্ধি করে কত পিছিয়ে পড়েছে সে। কাজেই ভালো দিকগুলোর প্রশংসা করুন। বলুন, সে যে এখন নেশামুক্ত, তাতেই আপনারা খুশি। তাকে সাহস দিন। ধৈর্য ধরে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিন। আপনারা তার সঙ্গে আছেনÑএটা বুঝিয়ে দিন। ক্রমে সে পরিবারের সবার প্রতি গভীর মমত্ববোধ অনুভব করবে।

 

অতীত নিয়ে অনুযোগ নয়

নেশা গ্রহণের সময় পরিবারে তার উৎপাত আর যন্ত্রণা দেওয়া ঘটনাগুলোকে নেশামুক্তির পর কোনো কোনো অভিভাবক বার বার তা সামনে টেনে নিয়ে আসেন। তাদের ধারণা, রিকভারি এতে ঠিক থাকবে। কিন্তু এতে হিতে বিপরীত হওয়ারই সম্ভাবনা। অতীতের উদাহরণ তার সামনে এলে সে হীনম্মন্যতায় ভুগতে পারে।

 

বিনোদন নিয়ে ভাবুন

মানসিক প্রশান্তির জন্য সবারই বিনোদন প্রয়োজন। নেশা ছাড়ার পর নেশাবিহীন বিনোদন অপরিহার্য। বিনোদন ছাড়া একঘেয়েমি জীবন তাকে আবার নেশাকেন্দি ক বিনোদনের দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরিবারের অন্যরা এখানে খুব ভালো ভূমিকা রাখতে পারেন। সবাই মিলে বেড়িয়ে আসুন কাছেধারে কোথাও থেকে। সম্ভব হলে দূরে কোথাও কোনো প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটিয়ে আসুন। অথবা তাকে নিয়ে ঘুরে আসুন অন্য কোনো বিনোদনমূলক স্থানে, যেখানে তার পছন্দ। সবাই একসঙ্গে বসে ঘরে বা বাইরে নতুন নতুন বিনোদনের পরিকল্পনা করতে পারেন। অনেকের নানা ধরনের শখ থাকতে পারে। বিনোদনের খোরাক হিসেবে সেটা মন্দ নয়। আপনার পরিবারের রিকভারি সদস্যের সেরকম শখের কিছু থাকলে যদি সম্ভব হয় তাকে উৎসাহিত করুন।

 

কঠোরতাও প্রয়োজন

অনেক সময় অভিভাবকের কোমল প্রশ্রয় রিকভারির জন্য সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে কঠোর ও দৃঢ় মনোভাবই কাম্য। এরকম কিছু দৃষ্টান্ত নিচে আলোচনা করা হলো।

 

অজস্র প্রাপ্তি

পরিবারের নেশাসক্ত সদস্য চিকিৎসা শেষ করেছে, অনেক অভিভাবক তাতেই এমন অভিভূত হয়ে পড়েন যে, তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন। না চাইতেই এরকম প্রাপ্তি তাকে বেশ আত্মম্ভরী করে তুলতে পারে। কয়েকদিন নেশা বন্ধকে সে চূড়ান্ত সাফল্য ধরে নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হতে পারে।

 

শুরুতেই টাকা

সবেমাত্র চিকিৎসা শেষ হওয়া কোনো রিকভারির জন্য টাকা-পয়সা বহন করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এক্ষেত্রে যথাসম্ভব সতর্ক থাকুন। শুরুতে তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আপনি কিনে দিন। পকেটে টাকা ছাড়া ফাঁকা ফাঁকা লাগছেÑএমন অজুহাতে আমল দেবেন না। আপনার ধৈর্য, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সাহসী ভূমিকা একজন মাদকাসক্তকে তার অপার সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে।