Print Date & Time : 27 September 2021 Monday 9:34 am

মানবপাচার রোধে প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ

প্রকাশ: June 21, 2021 সময়- 11:52 pm

সাদিয়া ইসলাম সম্পা : বর্তমানে যে কয়টি ঘৃণ্য মানবাধিকারবিরোধী কাজ রয়েছে, তার মধ্যে মানবপাচার একটি। মানবপাচার হলো একটি নিকৃষ্টতম জঘন্য অপরাধ। মানবপাচার বলতে বোঝায় বল প্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ, যা মানুষের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারকে ক্ষুন্ন করে। বর্তমানে বিশ্বে এটি একটি জঘন্যতম অপরাধ। মানবপাচার স্বাধীনভাবে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকে লঙ্ঘন করে। মানবপাচার বলতে মূলত নারী ও শিশুদের পাচার করা বোঝায়। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ তাদের মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। প্রতিনিয়ত যে হারে মানবপাচারের খবর গণমাধ্যমে আসে, তার কয়েকগুণ বেশি মানবপাচার হয় বিভিন্ন দেশে। বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবপাচারের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মানবপাচার বর্তমানে একটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। শুধু বর্তমানে নয়, মানবপাচার অতীতেও ছিল। অতীতের দাসপ্রথার আধুনিক রূপই হলো মানবপাচার। মানবপাচারের মতো জঘন্যতম অপরাধের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত কত অসহায় ও নিরীহ মানুষের জীবন যে বিপন্ন হচ্ছে, তা হিসাবের বাইরে। প্রতিদিন সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় মানবপাচারের যে খবর চোখের সামনে আসে, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি মানবপাচারের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। অর্থ উপার্জনের সহজ মাধ্যম হিসেবে কিছু লোক মানবপাচারের মতো জঘন্যতম  অপরাধকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে। অন্যায়ভাবে হাজার হাজার মানুষকে প্রতিনিয়ত বিদেশে পাচার করে এসব অপরাধীরা অর্থ উপার্জন করছে।

দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা ও বেকারত্বের কারণে অসহায় কর্মহীন নারী-পুরুষরা মানবপাচারকারীদের কবলে পড়ে। মূলত মানবপাচারের শিকার হয় নারী শিশুরা। পারিবারিক অসচ্ছলতা ও দারিদ্র্যের দরুন কাজের প্রয়োজনে অনেক নারী ও শিশু কাজ খুঁজতে গিয়ে মানবপাচারের শিকার হয়। পাচারকারীরা সাধারণত অসহায় নারী, পুরুষ ও শিশুদের অনেক অর্থের বিনিময়ে দেশে-বিদেশে কাজ জোগাড় করে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে। আর সেই ফাঁদে যারা ফেঁসে যায়, তারাই পাচারের শিকার হয়। পাচারের শিকার হওয়া মানুষগুলোর কোনো স্বাধীনতা থাকে না। পাচারের শিকার হওয়া মানুষগুলোকে দিয়ে পাচারকারীরা সাধারণত যেসব কাজ করায়, তা ঘৃণ্য ও সমাজবিরোধী অপরাধমূলক কাজ।

পাচার হওয়া নারী ও মেয়েশিশুদের দিয়ে সাধারণত পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি, গৃহস্থালির কাজ, বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও উটের জকির কাজ করানো ছাড়াও অঙ্গহানি করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা হয়। আর পুরুষদের বিভিন্ন অন্যায় ও অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করা হয়ে থাকে। এসবের মধ্যে রয়েছে মাদক ও অস্ত্রচালান, চোরাচালান, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই প্রভৃতি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য মানবপাচার এখন একটি ভয়াবহ সমস্যা। তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা মোটেও দেশের জন্য স্বস্তিকর নয়।

মানবপাচারে অন্যতম টার্গেট হলো নারী ও মেয়েশিশু। নারীর তুলনায় পুরুষের পাচার হওয়ার সংখ্যা কম। নারীদের সাধারণত পাচারের মূল টার্গেট করা হয়। যেসব পরিবারে আর্থিক অসচ্ছলতা ও অভাব-অনটন থাকে, সেসব পরিবারের মেয়েরা অর্থ উপার্জন করে পরিবারকে সহায়তা করার জন্য কাজের খোঁজে গিয়ে অনেক সময় পাচারকারীদের কবলে পড়ে। পাচারকারীরা ভালো কাজ ও অধিক অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের যেখানে কাজ দেয়ার কথা বলে, সেখানে কাজ না দিয়ে কাজের নামে বিদেশে পাচার করে দেয় অর্থের বিনিময়ে। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের বিদেশে যে কাজের জন্য বলা হয়, সে কাজ না দিয়ে অন্য কাজে অর্থাৎ বিভিন্ন ধরনের ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট কাজে বাধ্য করা হয়ে থাকে। এসব পাচারকারী অনেক সময়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখায়, যাতে অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে স্বেচ্ছায় তাদের হাতে তুলে দেয়, কিন্তু সে সন্তান আর ফিরে আসে না। এভাবেই পাচারকারীরা মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার পাশাপাশি তাদের বিশ্বাসের চরম অবমাননা ও অবমূল্যায়ন করে থাকে। বেশিরভাগ মানবপাচার শারীরিক ও মানসিক বল প্রয়োগের চেয়ে প্রতারণার মাধ্যমে হয়ে থাকে, যেমনÑবিদেশে ভালো বেতনের চাকরি দেয়ার প্রলোভন, বিয়ে করে উন্নতমানের জীবনযাপনের আশ্বাস প্রভৃতি। এ থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ অপরাধ ঘটে দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও অপরাধ সম্পর্কে অসচেতনতার জন্য। পাচারের শিকার যারা হয় তারা মূলত কায়িক শ্রমিক। ন্যূনতম পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্যই তারা ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কাজের খোঁজে। আর পাচারকারীরা এসব হতাশাগ্রস্ত ও বিপদাপন্ন মানুষকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচারের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।

মানবপাচারের মতো অপরাধের শিকার পুরুষের তুলনায় নারী ও মেয়েশিশু বেশি হচ্ছে। নারী ও মেয়েশিশুকে সহজেই পাচারের টার্গেট বানায় অপরাধীরা। বলতে গেলে মানবপাচারের মূল টার্গেটই হলো নারী। কারণ নারীকে দিয়ে যে কারণে মানবপাচার করা হয়, সেসব কাজই করা হয়। পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি, বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, ভিক্ষাবৃত্তি কী না করানো হয় নারীকে দিয়ে। অথচ নারীর কি এসব জঘন্য ও নোংরা কাজ করার কথা! নারী তো পুরুষের পাশাপাশি সমাজ গড়ার কারিগর। তাদেরও অধিকার আছে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে সমাজে স্বাধীনভাবে বাঁচার। পাচারের শিকার যারা হয়, তারা মূলত কায়িক শ্রমিক। ন্যূনতম পারিশ্রমিক পাওয়ার জন্যই তারা ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কাজের খোঁজে। আর পাচারকারীরা এসব হতাশাগ্রস্ত, বিপদাপন্ন মানুষকে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে মানবপাচারের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে তারও রয়েছে স্বাধীনভাবে কাজ করে স্বাবলম্বী হয়ে রাষ্ট্রের যোগ্য নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করা। কিন্তু এসব নারীর অনেকেই তা পারছে না। যেসব নারী পাচারের শিকার হয়ে নিজ দেশ, পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও আপনজনদের ছেড়ে পাচারকারীদের কবলে পড়ে বিদেশে দিনের পর দিন বসবাস করছে, তারা অনেক চেষ্টা করেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না, ফিরে আসতে পারছে না পরিবারের কাছে। এতে একদিকে নারী নিজে যেমন দুঃখ-দুর্দশার শিকার হয়, তেমনি তার পরিবারেও সৃষ্টি হয় দুঃখ-কষ্ট। আবার এসব নারীর মধ্যে যারা বিবাহিত, তাদের স্বামী-সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় পাচারের মতো অপরাধ। এর ফলে নারীটির সংসার নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় তার সন্তানের ভবিষ্যৎ। কেননা এসব সন্তান তার মা ছাড়া বড় হয়। তারা আর নিজের মাকে ফিরে পায় না বললেই চলে। নারীর পাশাপাশি মেয়েশিশুরাও পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়। পাচারকারীদের হাত থেকে রেহাই পায় না পাঁচ-ছয় বছরের শিশুরাও। যে বয়সে এসব শিশুর বাবা-মায়ের আদরে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে পাচারের শিকার হয়ে তাদের পাড়ি জমাতে হয় বিদেশে। সেখানে তাদের দিয়ে যেসব কাজ করানো হয়, তা তাদের শৈশবকে ধ্বংস করে দেয়। শুধু শৈশব কেন, তাদের জীবনটাকেই নষ্ট করে দেয়। আর এদিকে নিজের আদরের সন্তাকে হারিয়ে বাবা-মায়ের অবস্থা হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এ অপরাধীরা শিশুদের সঙ্গে খেলার ছলে মিশে তাদের বিভিন্ন খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে যায় এবং পাচার করে দেয় অর্থের বিনিময়ে।

পাচার একটি মানবতাবিরোধী কাজ। পাচারের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অগণিত মানুষের জীবন, বিশেষ করে নারী ও শিশুর জীবন। আমাদের সমাজে কিছু স্বার্থসিদ্ধ মানুষের জন্য মানবপাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। সরকার পাচার বন্ধের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পরও বন্ধ হচ্ছে না পাচার। পাচার একদিকে যেমন পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিটিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে, অন্যদিকে তার পরিবারকেও বিপন্ন করে দিচ্ছে। আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও ক্ষতি করছে। রাষ্ট্র যোগ্য নাগরিকের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের সম্মান ক্ষুন্ন হচ্ছে। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পাচারকৃত নাগরিকদের উদ্ধার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের সম্মান নষ্ট করছে। তাই দেশের স্বার্থে এ দেশের মানুষের ভবিষ্যৎকে সুনিশ্চিত করতে অবিলম্বে মানবপাচার বন্ধ করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। পাচারের সঙ্গে জড়িত যারা তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে এবং শাস্তি যাতে কার্যকর হয়, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ আর পাচারের মতো জঘন্য অপরাধ না করতে পারে। আর পাচার বন্ধে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো সচেতনতা সৃষ্টি। কাজের খোঁজে যারা বের হয়, তাদের অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে। যে কারও কাজের প্রস্তাব যাচাই না করে রাজি হওয়া যাবে না। আর শিশুদের অবশ্যই নিরাপদে ও সাবধানে রাখতে হবে। অপরিচিত কারও সঙ্গে মিশতে দেয়া যাবে না। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি নিজেদের অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে এবং পাচারকারীর সন্ধান পাওয়া গেলে তাদের অবশ্যই আইনের কাছে সোপর্দ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা যোগ্য শাস্তি পেয়ে ভবিষ্যতে আর পাচার করার মতো অপরাধের সাহস না পায়। তাহলেই মানবপাচার অনেকটা কমে যাবে বলে আশা করা যায়।

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়