প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মানসিক স্বাস্থ্যে অকুপেশনাল থেরাপি

আমিনা রুপা: মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি এখনও অবহেলিত। বিশ্বের অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, কুসংস্কার ও অসচেতনতার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো তেমনভাবে স্বীকৃতি পায় না।

মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু তথ্য বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেÑ

বাংলাদেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (ডব্লিউএইচও ২০০৭) প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, ১৬.১ শতাংশ বয়স্ক জনগোষ্ঠী (১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী) মানসিক রোগে ভুগছে।

#      ১৮ ও তদূর্ধ্ব বছরের প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষের মধ্যে প্রায় ১৬.৮ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগছেন বিষন্নতা রোগে ভুগছেন ৬.৭ শতাংশ উদ্বিগ্ন জনিত রোগে ভুগছেন ৪.৫ শতাংশ

#      স্বাস্থ্য খাতে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ৩১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য খাত মূল বাজেটের ৫.১ শতাংশ

#      সারাবিশ্বে মানসিক রোগে রোগীর সংখ্যা এক বিলিয়ন।  ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাত জনে একজনের মানসিক রোগের রোগ আছে। ৫০ শতাংশ  মানসিক রোগ ১৪ বছরের মধ্যে শুরু হয়।

অকুপেশনাল থেরাপি কী?

অকুপেশনাল থেরাপি একটি স্বতন্ত্র স্বাস্থ্যসেবামূলক পেশা, যা একজন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক সামাজিক ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতাকে দূরীকরণের মাধ্যমে তাকে দৈনন্দিন কাজে যথাসম্ভব স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে চিকিৎসা প্রদান করে থাকে।

মানসিক স্বাস্থ্য কী?

মানসিক স্বাস্থ্য সার্বিকভাবে ভালো থাকার একটি প্রতিরূপ, যার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব সক্ষমতা অনুধাবন করেন, দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক চাপ মোকাবিলা করতে পারেন। ফলপ্রসূতে সফলভাবে কাজ করতে সমাজে অবদান রাখেন। (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪)

মানসিক অসুস্থতাগুলো হলো:

#      মনোরোগবিষয়ক ব্যাধি (Psychotic Disorder)

#      সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)

#      বাইপোলার ডিসঅর্ডার (Bipolar Mood Disorder)

* অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (Obsessive Compulsive Disorder)

* বিষন্নতা (Depression)

* উদ্বিগ্নতাবিষয়ক ব্যাধি (Anxiety Disorder)

* ব্যক্তিত্ববিষয়ক ব্যাধি (personality Disorder)

* আহারবিষয়ক ব্যাধি (Eating Disorder)

* আঘাত/ট্রমাবিষয়ক ব্যাধি। (Post-Traumatic Disorder)

* মাদক দ্রব্যের অপব্যবহার (Substances Abuse Disorder)

মানসিক স্বাস্থ্যে অকুপেশনাল থেরাপির ভূমিকা:

অকুপেশনাল থেরাপির মূল লক্ষ্য হচ্ছে একজন ব্যক্তির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাকে দৈনন্দিন কার্যকালাপের সব দিকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করা। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতাজনিত রোগীদের মূল সমস্যা হলো এই রোগীরা নিজের যতœ নেয় না এবং কোনো আয়মূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে চায় না অর্থাৎ কর্মে অনীহা। এছাড়াও আরও অনেক অসুবিধা রয়েছে। 

১।      অকুপেশনাল থেরাপিস্ট মানসিক রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে অন্যান্য হেলথ প্রফেশনালদের সঙ্গে (multi disciplinary) ক্ষেত্রে কাজ করে থাকেন।

২।      সমাজে পুনরায় ফিরে যেতে বেং সঠিকভাবে পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে থাকেন।

৩।     পেশাগত ও বিনোদনমূলক কাজকর্মে রোগীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তাদের মাঝে আক্রমণাত্মক আচরণ দূর করতে সাহায্য করেন।

৪।      একজন মানুষ যখন মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম, যেমন  নিজের খাওয়া, গোসল করা, জামা কাপড় পরা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, খেলাধুলা প্রভৃতি করার মতো আগ্রহ থাকে না। তখন সেই কাজটিকে অনেক কঠিন মনে হতে পারে কিংবা করতে সে ভয় পেতে পারে। সেক্ষেত্রে একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট পারে তার কাজটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করার মাধ্যমে কাজটিকে আনন্দময় করে তুলতে।

৫।     রোগীর মানসিক সমস্যার কারণে যেমন অমনোযোগী, সমস্যার সমাধান, গুছিয়ে কাজ করার দক্ষতা বেং সামাজিক দক্ষতার সমস্যা থাকে। তাদের বিভিন্ন গ্রুপ এক্টিভিটিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানো হয়।

৬।     একজন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রোগীদের একটি রুটিন তৈরির মাধ্যমে দৈনন্দিন কাজকর্মে অংশগ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করে।

এছাড়া অকুপেশনাল থেরাপিস্টরা রোগীর উপসর্গগুলোকে কমিয়ে আনার জন্য নিন্মোক্ত কার্যাবলি করে থাকেন:

#      নিজের যত্ন নেয়ার প্রশিক্ষণ

(self-care group)

#      আয়মূলক কাজের প্রশিক্ষণ (রোগী কল্যাণ সমিতি ও সোশ্যাল ওয়ার্কের আর্থিক সহযোগিতায়)

#      সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর প্রশিক্ষণ

#      মনোযোগ বাড়ানোর প্রশিক্ষণ

#      বিনোদনমূলক কাজে অংশগ্রহণ

#      সেন্সরি ইন্টারভেন্সন ফর মেন্টাল হেলথ

(sensory modulation)

#      কগনেটিভ বিহ্যাবিওর থেরাপি

#      স্ট্রেস ম্যনেজমেন্ট

#      অন্যান্য গ্রুপ থেরাপি (Physical Exercise group, Nutrition group, Caregiver sharing group, Art &craft group etc)

মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের বর্তমান অবস্থা: মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে একজন ক্লিনিক্যাল অকুপেশনাল থেরাপিস্ট (২০১৪-২০২২) সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন ও প্রতি বছর দুজন ইন্টার্ন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট পক্ষাগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) উদ্যোগে ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের তত্তাবধানে সিআরপিতে ‘মেন্টাল হেলথ ডে-কেয়ার’ সেন্টার (গনকবাড়ী, শ্রীপুর, আশুলিয়া) ঢাকাতে চালু হয়েছে। এখানে তিনজন ক্লিনিক্যাল অকুপেশনাল থেরাপিস্ট কাজ করছেন। এই ডে-কেয়ার সেন্টারের মূল উদ্দেশ্য হলো মানসিক সমস্যা-সংক্রান্ত রোগীদের বিজ্ঞান সম্মত পুনর্বাসন সেবা প্রদান।

শিক্ষার্থী, অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগ

বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট (বিএইচপিআই)

সিআরপি, সাভার, ঢাকা