মত-বিশ্লেষণ

মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন

উম্মে ফারুয়া: সুস্থতা হলো শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকতার ভারসাম্যপূর্ণ মেলবন্ধন। শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক সুস্থতাকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন অতি গুরুত্বের সঙ্গে। কিছু অসুখ যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রের রোগ এগুলোর পেছনে কখনও কখনও অবসাদ, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ প্রভৃতিকে কারণ হিসেবে ধরা হয়। মানসিক উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা থেকে হতে পারে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগ। এসব বিষয়ে চিকিৎসকরা বলেন, সার্বিক সুস্থতার জন্য শারীরিক ও মানসিক রোগের সমন্বিত চিকিৎসা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শরীরের পাশাপাশি মনকে গুরুত্ব দিয়ে মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘ঝঁরপরফব চৎবাবহঃরড়হ’ (আত্মহত্যা প্রতিরোধ)।

বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, প্রিয়জন হারানোসহ নানা ক্ষতির কারণে বিভিন্ন সময় মানুষ মানসিক কষ্টে ভোগে। বিভিন্ন কারণে মনের কষ্ট ও দুশ্চিন্তার ফলে অনেক সময় নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ব্যক্তি আর পারিবারিক জীবনকে দাঁড় করাচ্ছে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এসবের জন্য দায়ী মনের রোগ সম্পর্কে অজ্ঞতা। আর এভাবেই মানসিক সমস্যার সূত্রপাত হয়।

১৪ বছরে পা দিয়েছে শুভ। অনেক দিন থেকেই তার ঘুমে সমস্যা হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকছে। বাসায় কেউ কিছু বলতে গেলেই রেগে যাচ্ছে। সামনে পরীক্ষার টেনশন, অথচ পড়ায় কিছুতেই মন বসাতে পারছে না। নিজের কাজগুলোও ঠিকঠাক করা হচ্ছে না। এটি অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এক কিশোরের কথা।

তানিয়ার বয়স ২৫। সে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। মা-বাবার একমাত্র সন্তান। মা-বাবার একটাই কথা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতেই হবে। কিন্তু তানিয়া সব সময়ই টেনশনে থাকত সে ভালো রেজাল্ট করতে পারবে তো? তার মধ্যে হতাশা আর দুশ্চিন্তা। একদিন সে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। বিশ্বে প্রতি পাঁচ জনে একজন তরুণ মানসিক অসুস্থতায় ভুগছে। ৮৩ শতাংশ তরুণ মনে করে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য-মশকরা তাদের আত্মমর্যাদার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মানসিক রোগের ভয়াবহতা আত্মহত্যার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। ওপরের দুটি গল্প থেকেই বোঝা যায় এর মূল কারণ হচ্ছে মানসিক সমস্যা। 

আমরা সবাই চাই সুস্বাস্থ্য বজায় থাকুক। শারীরিক অসুস্থতায় আমরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, কিন্তু মানসিক সমস্যাকে আমরা আমলে নিই না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৬ দশমিক আট শতাংশ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। অন্যদিকে ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক রোগে আক্রান্তের হার ১৭ দশমিক আট শতাংশ। মনোরোগ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ফেসবুকসহ সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ৯০ শতাংশই ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ, যাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর মূল কারণ হলো বিশ্বায়নের প্রভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রযুক্তি সবখানেই অতিমাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ছোঁয়ায় তরুণরা বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। আর প্রযুক্তিতে মগ্ন থাকার এই প্রবণতা এক ধরনের আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে। তরুণ প্রজšে§র মধ্যে প্রযুক্তির মাত্রারিক্ত আসক্তির কারণে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ডাব্লিউএইচও চারটি বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে এক নম্বর হলোÑসাইবার বুলিং অর্থাৎ ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাউকে বিরক্ত করা, ক্ষতিগ্রস্ত করা, ট্রমাটাইজ করা, কারও কোনো খারাপ ছবি প্রকাশ করা বা ব্যঙ্গবিদ্রুপ করা। শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে আমাদের মাঝে একটা স্পষ্ট ধারণা কাজ করে। কিন্তু, যখন দেখা যায়, আমাদের স্বাভাবিক কাজগুলোও ব্যাহত হচ্ছে, তখনই মানসিক অসুস্থতার প্রসঙ্গ আসে।

মানসিক সমস্যা নানা ধরনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই সুস্বাস্থ্য। তিন ধরনের সমস্যার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা, মানসিক সমস্যা এবং মাদকাসক্তি। মন খারাপ, উদ্বেগ, ভয়Ñএগুলো স্বাভাবিক আবেগীয় প্রকাশ। দুঃখ বা ব্যর্থতায় যে কারও মন খারাপ হতে পারে।

দুঃসংবাদ, উৎকণ্ঠা ও অনেকের ক্ষেত্রে কোনো প্রাণী, উচ্চতা বা অন্ধকারের প্রতি ভীতিবোধ প্রভৃতিও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন তা স্বাভাবিক মাত্রাকে অতিক্রম করে ব্যক্তিজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখনই একে রোগ হিসেবে ধরা হয়। মানসিক রোগকে দুভাগে ভাগ করা যায়। একটি নিউরোসিস, অন্যটি সাইকোসিস। মূলত বিষণœতা, উদ্বেগাধিক্য, অহেতুক ভীতি প্রভৃতি নিউরোসিসের উদাহরণ। অন্যদিকে সাইকোসিস রোগীদের আচার-আচরণ ও ব্যবহার-কথাবার্তায় বিশৃঙ্খলতা দেখা যায়। বাস্তবের সঙ্গে তাদের সংযোগ থাকে না। অনেকের মাঝে অযৌক্তিক, ভিত্তিহীন কিন্তু দৃঢ় সন্দেহ দেখা দেয়। তারা সাধারণত নিজেরা বুঝতে পারে না যে তারা রোগাক্রান্ত। আশপাশের মানুষের কাছে তাদের অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে ৪৫০ মিলিয়ন লোক কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।

মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিষণœতা। সারাবিশ্বে ৩০ কোটির বেশি মানুষ বিষণœতায় ভোগে। আমাদের দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বিষণœতায় আক্রান্ত রোগী রয়েছে, যার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কোনো ব্যক্তিজীবনের যেকোনো সময় এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। গবেষকরা বলেন, বিষণœতার কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকে। একটি পরিসংখ্যানমতে, প্রতিবছর পৃথিবীতে আট লাখ ৭৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা গুরুতর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর (১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব) শতকরা প্রায় ১৬ দশমিক আট শতাংশ যেকোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। এই জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উন্নয়নশীল দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দকৃত বাজেট কমপক্ষে শতকরা পাঁচ ভাগ হওয়া উচিত। এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে সরকার মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মডেল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। বর্তমান সরকার মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির অধিকার ও সুযোগের সমতা বিধানে বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট অনুযায়ী প্রায় ১৩ হাজার ৭৪৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। এখানে মানসিক সমস্যায় কাউন্সেলিং করা হয়। এছাড়া প্রতিটি জেলা সদরে হাসপাতাল ও বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ বিদ্যমান। এগুলোর বেশিরভাগেই মানসিক রোগ চিকিৎসার জন্য অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ রয়েছে। সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ অসংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে অকালমৃত্যু তিন ভাগের এক ভাগ কমিয়ে আনা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন ও কল্যাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সুস্থ, স্বাভাবিক ও সম্ভাবনাময় জীবন পেতে হলে প্রত্যেক মানুষের কিছু নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন। সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত থেকে নিয়মানুবর্তী জীবনযাপন ব্যক্তিকে নতুন আশায় উজ্জীবিত রাখে, সুখী হতে সাহায্য করে। প্রতিদিন গোসল, নিয়মিত দাঁত ব্রাশ, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে সুষম খাবার ও পুষ্টিকর খাবার এবং নিয়মিত ব্যায়াম সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। অনিয়মিত খাবার গ্রহণ যেমন গ্যাসট্রিক-আলসারসহ শারীরিক অসুস্থতার কারণ, তেমনি তা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায়। আবার রাতজাগা ও দিনে ঘুমানো মস্তিষ্কের বায়োলজিক্যাল ক্লক এলোমেলো করে দেয়। ফলে উদ্যমের অভাবে জড়তা এসে ভর করে এবং কোনো কিছুই ভালো লাগে না। ক্ষুধা ও ঘুম অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এভাবেই মানুষ অবসাদে ভোগে। এজন্য মনের রোগ সম্পর্কে সচেতন থাকাটা খুব দরকার। পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহ, সন্দেহপ্রবণতা, মিথ্যা বলা, অহেতুক হিংসা, কুটিলতা, অন্যায়ভাবে অন্যের ওপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা, পেশাগত জীবনে অনৈতিকতার চর্চা, অধিক বিলাসী জীবনের প্রতি মোহ মনের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এটা এক ধরনের ব্যাধি, যা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। মনের অজান্তে মানুষ আরও গুরুতর পাপ কাজের দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির অমোঘ নিয়মে প্রকৃতির অভিশাপ মানুষকে ধ্বংসের দিকে টানে। নিজের ক্ষতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবার-সমাজের ক্ষতিও যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা খুবই জরুরি। আর মানসিক সুস্বাস্থ্য শারীরিক ও সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পিআইডি নিবন্ধ

সর্বশেষ..