দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

মানহীন জ্বালানি বিক্রি করে হাজার কোটি টাকা লুট

কনডেনসেট থেকে উপজাত

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: দেশে স্থানীয় উৎস থেকে প্রাপ্ত কনডেনসেট থেকে বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর মাধ্যমে পরিশোধন করে উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল। এর মধ্যে ১২টি বেসরকারি রিফাইনারি জ্বালানি পণ্যের মান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নির্ধারিত মানের চেয়ে অনেক কম। আর এসব মানহীন জ্বালানি পণ্যের প্রধান ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ছিল জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ১২টি বেসরকারি রিফাইনারি থেকে ভেজাল তেল না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিসি। যদিও এর আগেই অবৈধভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকা আয় করে অভিযুক্ত ১২টি বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট কোম্পানিগুলো।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বেসরকারি ১৪টি এবং সরকারি সাতটি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট থেকে সরবরাহকৃত কনডেনসেটের বিপরীতে অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল ও কেরোসিন কিনত বিপিসি। দেশের চাহিদার সব পেট্রোল সংগ্রহ করা হতো এই ২১ প্লান্ট থেকেই। প্রথম থেকে ৮০ মানের পেট্রোল সরবরাহ করে এলেও ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল বিএসটিআই পেট্রোলের আরওএন (রিচার্স অকটেন নাম্বার) ৮৭ নির্ধারণ করে। কিন্তু শুরু থেকে আরওএন আশি’র ওপরে নিতে পারেনি প্লান্টগুলো।

এরপরও দেশীয় গ্যাস ফিল্ডের উপজাত হিসেবে প্রাপ্ত কনডেনসেটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্লান্টগুলো থেকে ন্যূনতম মান ৮০ হিসেবে বিবেচিত করে অপেক্ষাকৃত কম মানের (আরওএন ৭৭ পর্যন্ত) পেট্রোলকে অফ-স্পেক (ন্যূনতম মানবহির্ভূত) হিসেবে গ্রহণ করে আসছিল বিপিসি। তাতে তিন শতাংশ ডিসকাউন্টে বিল পরিশোধ করা হতো প্লান্টগুলোকে। কিন্তু চলতি বছর ১৭ ফেব্রুয়ারি পেট্রোলের মান ৮৯ নির্ধারণ করে বিএসটিআই। আর কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টগুলো থেকে বিএসটিআই’র মান অনুযায়ী জ্বালানি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে সভায় পেট্রোল উৎপাদনকারী ১২ প্লান্টকে কনডেনসেট বরাদ্দ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

সে আলোকে গত ১ জুলাই থেকে সেই ১২ প্লান্টকে কনডেনসেট বরাদ্দ বন্ধ করে দেয় বিপিসি। এগুলো হলো সুপার রিফাইনারি লিমিটেড, অ্যাকোয়া মিনারেল টারপেনটাইন অ্যান্ড সলভেন্টস প্লান্ট লিমিটেড, পিএইচপি পেট্রো রিফাইনারি, চৌধুরী রিফাইনারি, গোল্ডেন কনডেনসেট অয়েল রিফাইনারি, জেবি রিফাইনারি, ইউনিভার্সেল রিফাইনারি, লার্ক পেট্রোলিয়াম, সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল, সিনথেটিক রেজিন প্রোডাক্টস, রূপসা ট্যাংক টার্মিনাল ও কার্বন হোল্ডিং লিমিটেড। অপরদিকে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল (প্রা.) লি. এবং পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি লিমিটেড থেকে বিএসটিআই মানের (আরওএন ৯৫) অকটেন পাওয়া যাওয়ায় এই দুই প্রতিষ্ঠানে কনডেনসেট সরবরাহ অব্যাহত রাখে বিপিসি।

চলতি বছরের ১১ মার্চ বিপিসি চেয়ারম্যান মো. সামছুর রহমান স্বাক্ষরিত পত্রে দেখা যায়, ‘২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে পেট্রোলের শতভাগ এবং অকটেনের ৬৬ শতাংশ চাহিদা স্থানীয় উৎসের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টগুলো থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯৬ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন ডিজেল পাওয়া গেছে, যা দেশের মোট চাহিদার দুই দশমিক ১০ শতাংশ। ফলে প্লান্টগুলো থেকে প্রাপ্ত ডিজেল আমদানিকৃত ডিজেলের সঙ্গে ব্লেন্ডিং করে বিপণন করায় ডিজেলের বিএসটিআই মান সবসময় যথাযথ পাওয়া গেছে। কিন্তু পেট্রোলের মান সব অবস্থায় আশি’র কাছাকাছি পাওয়া যাচ্ছে। প্লান্টগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কনডেনসেটের ধরনের কারণে পেট্রোল উৎপাদনকারী প্লান্টগুলোর পক্ষে এ মুহূর্তে বিএসটিআই মানের পেট্রোল উৎপাদনের সুযোগ সীমিত বলে উল্লেখ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে পত্র দেয় বিপিসি।

বিএসইটি সূত্রে জানা গেছে, কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টগুলো থেকে জ্বালানি নেওয়ার ক্ষেত্রে অকটেনের আরওএন মান ন্যূনতম ৯৫, পেট্রোলের আরওএন মান ন্যূনতম ৮৭, ডিজেলের সিটান মান ন্যূনতম ৪৬ ও কেরোসিনের মান ন্যূনতম হবে ৩৫।

অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট সরকারের কাছ থেকে কনডেনসেট কিনে ভেজাল অকটেন ও পেট্রোল উৎপাদন করে বিপিসির কাছে বিক্রি করত। একই সঙ্গে পরিশোধন না করে অকটেন ও পেট্রোলের সঙ্গে মিশিয়ে তা বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে বিক্রি করে দিত। আবার যে পরিমাণে কনডেনসেট পেত, তার চেয়ে অনেক কম জ্বালানি তেল (অকটেন-পেট্রোল) হিসেবে পরিশোধন করে দিত। এক্ষেত্রে যৌক্তিক কোনো হিসাব দিতে পারেনি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট কোম্পানিগুলো।

জ্বালানি তেল ব্যবহারকারীরা বলেন, এমনিতে জ্বালানি খাতে নানা অনিয়ম চলছে। গত কয়েক বছরের মানহীন জ্বালানি সরবরাহ করে বেসরকারি রিফাইনারিগুলো অবৈধভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। এসব অপর্কমের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচিত তদন্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে বেশ কয়েকজন বেসরকারি রিফাইনারির উদ্যোক্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে তেমন বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেননি। শুধু বলেন, এ খাতের রিফাইনারিগুলোয় অনেক বিনিয়োগ। এ বিষয়ে সরকারের সুচিন্তিত মতামতের অপেক্ষায় আছি।     

গত ২৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে পুঁজিবাজারের নিবন্ধিত কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যাল রিফাইনারি লিমিটেডের কোম্পানির সচিব খাজা মঈন উদ্দিন হোসাইন শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমাদের এখন কারখানা বন্ধ। আসলে বাংলাদেশে যে কনডেনসেট পাওয়া যায়, তা দিয়ে বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মানের ডিজেল ও অকটেন হবে না। এটা শুধু আমাদের নয়, সব রিফাইনারিতে এ মানের রিফাইন হবে না। সিলেটে একটি প্রতিবাদ সভায় অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমানের বিপিসি’র সরবরাহকৃত ডিজেল ও অকটেন মানসম্মত নয়। এখন তো ১২টি বেসরকারি রিফাইনারি বন্ধ আছে। তাহলে …। আমরা আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছি। আমা করছি তিনি আমাদের আবেদন সদয় বিবেচনা করবেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছিুক বিএসটিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বেশিরভাগ বেসরকারি রিফাইনারিতে রিফাইনকৃত ডিজেল, পেট্রোল ও অকেটনের মান ভালো নয়। আর এসব মানহীন পেট্রোল ও ডিজেলের কারণে পরিবেশের দূষণ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমরা চিন্তা করতে পারব না। এছাড়া এসব মানহীন জ্বালানি ব্যবহারের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে দেশের পরিবহন খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্লান্টগুলো থেকে প্রাপ্ত ডিজেল আমদানিকৃত ডিজেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা সম্ভব হলেও পেট্রোলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে চাহিদার শতভাগ পেট্রোল উৎপাদিত হয় দেশে। আবার কনডেনসেট থেকে বেশি উৎপাদিত হয় পেট্রোল। ফলে মানসম্মত জ্বালানি বিপণন নিশ্চিতের জন্য কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টগুলোয় কনডেনসেট সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই, অথবা তাদের পুরো প্লান্টের আধুনিকায়ন করতে হবে।

এ বিষয়ে বিপিসির পরিচালক (বিপণন, অপারেশন ও পরিকল্পনা) সৈয়দ মেহদী হাসান শেয়ার বিজকে বলেন,  বন্ধ থাকা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর উৎপাদিত অকটেন ও পেট্রোলের মান ভালো নয়। আর বিএসটিআই নির্দেশিত মানের পেট্রোল সরবরাহ না দেওয়ায় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশে ১২টি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টে জ্বালানি নেওয়া বন্ধ আছে। পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কনডেনসেট বরাদ্দ স্থগিত আছে। আর দেশের চাহিদা পূরণে সরকারি প্লান্টগুলোর যথেষ্ট সক্ষমতা আছে। সুতরাং সমস্যা হবে না। যদিও মান ভালো থাকায় বেসরকারি দুটি রিফাইনারি চালু আছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি ১৩টি ফ্র্যাকশনেশন প্লান্টে কনডেনসেট  থেকে সম্মিলতভাবে বিভিন্ন ধরনের উপজাতের মোট উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৯৪ হাজার মেট্রিক টন। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরের তিন লাখ ২৩ হাজার মেট্রিক টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন লাখ ২২ মেট্রিক টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টন এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এক লাখ ৪২ হাজার মেট্রিক টন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..