প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মানা হচ্ছে না নীতিমালা: যৌথ প্রযোজনা সিনেমার নামে যৌথ লগ্নি

 

হামিদুর রহমান: যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণে অর্ধেক শিল্পী হতে হবে বাংলাদেশের। আবার শুটিংয়ের পুরো অর্ধেক ধারণ করতে হবে এ দেশে। নায়ক-নায়িকার যে কোনো একজন হতে হবে বাংলাদেশের। আর পোস্টারে দুই দেশের প্রযোজনা সংস্থার নামই উল্লেখ থাকতে হবেÑএমন সব শর্তই রয়েছে নীতিমালায়। তবে না মেনে শুধু কিছু অর্থ লগ্নি করেই কয়েক বছর ধরে একের পর এক নির্মাণ হচ্ছে যৌথ প্রযোজনার ছবি। তাই যৌথ প্রযোজনা পরিণত হয়েছে যৌথ লগ্নিতে।

এমন অভিযোগে সম্প্রতি এক জোট হয়েছেন দেশি শিল্পীরা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে যৌথ প্রযোজনার সিনেমা স্থগিত করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যৌথ প্রযোজনার মানে নির্মিত সিনেমায় নীতিমালা না মেনে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিদেশি শিল্পীদের অংশগ্রহণ। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশি শিল্পীগোষ্ঠী। অন্যদিকে যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা ও বিজ্ঞাপনে বৈধ পথে বিপুল অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশে। আর এভাবে চলতে থাকলে দেশের চলচ্চিত্রের বাজার পুরোপুরি কলকাতার দখলে যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়বে।

তাদের মতে, যৌথ পরিচালনায় ছবি নির্মাণ মানে হচ্ছে সিমেনার শুটিং, গান, অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে সব কিছু সমানভাবে করা। যার কোনো কিছুই মানা হচ্ছে না। কিছু চক্র নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য দেশে ক্ষতি করছে। যৌথ পরিচালনার নামে এ দেশের শিল্পীদের সঙ্গে অনেক অবিচার করা হচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।

যদিও এর সঙ্গে একমত নন যৌথ প্রযোজনায় কয়েকটি সিনেমা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, আমাদের দেখতে হবে দর্শক কী চায়? দর্শক ছাড়া তো হল চলবে না। যৌথ প্রযোজনায় মাধ্যমে সিনেমা তৈরি করলে ভালো বাজেট পাওয়া যায়। আর বাজেট ছাড়া ভালো সিনেমা নির্মাণ করা যায় না। আমাদের দর্শক এখন সিনেমার মান বুঝে। আর সিনেমার মান ভালো না করতে পারলে দর্শক হলে গিয়ে ছবি দেখবে না।

আব্দুল আজিজ বলেন, দর্শক যা চায় তা বুঝতে হবে, না হলে দেশের প্রেক্ষাগৃহ টেকানো কঠিন হবে। যৌথ প্রযোজনায় মাধ্যমে আমাদের দেশের শিল্পীদের এখন কলকাতায় অনেক মানুষ চেনে। এটাও একটা অর্জন।

উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে জাজ মাল্টিমিডিয়ায় একক ছবি নির্মাণ হয়েছে ১৯টি। আর যৌথ প্রযোজনায় নির্মাণ হয়েছে ১৩টি।

গত ঈদুল ফিতরে জাজ মাল্টিমিডিয়ার যৌথভাবে দুটি ছবি মুক্তির আবেদন করে। ‘নবাব’ ও ‘বস-২’ নিয়ে আপত্তি তোলে প্রিভিউ কমিটি। তবে জাজ মাল্টিমিডিয়ার তদবিরে ছবি দুটি ঈদে মুক্তি পায়। ভালো মানের গল্প না হলেও জাজের জোরেই অনেক হলে মুক্তি পায় ছবি দুটি। আর এ দুই ছবির চাপে ঈদে মুক্তি পাওয়া অপর সিনেমা ‘রাজনীতি’ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অথচ ‘রাজনীতি’র গল্প বেশ শক্তিশালী বলে পরে মত দেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।

এদিকে রাজধানীর কয়েকটি সিনেমা হলে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানায়, তারা বাংলা সিনেমা খুব একটা দেখেন না। তবে বর্তমান সময়ে বাংলা সিনেমার দৃশ্য অনেকটায় বদলে গেছে। আয়নাবাজি সিনেমা সবার মন জয় করেছে। তবে আমাদের দেশের পরিচালকরা এখন ভালো কাজ করছেন। আয়নাবাজি সিমেনার পর থেকে অনেক দর্শক হলমুখী হয়েছে।

অভিনেতা নিরব শেয়ার বিজকে বলেন, যৌথ প্রযোজনা সিনেমা যদি নীতিমালা মেনে করা হয় তাহলে সেটি সবার জন্য ভালো। নীতিমালা আসলে কতটুকু মানা হচ্ছে, সেটিই মূল বিষয়। আমাদের দেশে অনেক ভালো ভালো ডিরেক্টর এসেছে তাদের কাজের মানও খুব ভালো। আমাদের এখন ভালো সিনেমা তৈরি হচ্ছে, যার প্রমাণ মেলে আয়নাবাজিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, যৌথভাবে যদি সিনেমা নির্মাণ করতে হয় তাহলে বাংলাদেশে যারা সিনেমা তৈরি করে, তারা যদি একসঙ্গে হয়ে কাজ করে তাহলেও ভালো সিনেমা নির্মাণ করা সম্ভব। নিজেদের ভেতরে সামঞ্জস্য থাকলে অনেক ভালো ভালো সিনেমা কিছু করা যাবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশে যৌথ উদ্যোগে ছবি নির্মাণ শুরু হয়। প্রখ্যাত নির্মাতা আলমগীর কবিরের পরিচালনায় ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছবিটি ছিল এ উদ্যোগের প্রথম প্রয়াস। একই বছর আশীর্বাদ চলচ্চিত্রের প্রযোজনায় ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মুক্তি পায়। শুধু ভারতের সঙ্গেই নয়, ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও কানাডার সম্মিলিত উদ্যোগে ববিতা অভিনীত ‘দূরদেশ’ মুক্তি পায়। এরপর বিরতি দিয়ে যৌথ উদ্যোগে ছবি নির্মিত হতে থাকে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সরকার যৌথ উদ্যোগের ছবি নির্মাণের ব্যাপারটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি নীতিমালা তৈরি করে। ২০১২ সালে যৌথ প্রযোজনার ছবির ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম করা হয়।

২০১২ সালের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমা নির্মাণের জন্য যে নীতিমালা করা হয়েছে তার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের তথ্যনুযায়ী, যৌথ প্রযোজনার সিনেমার ক্ষেত্রে দুই দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীর সংখ্যানুপাত সাধারণভাবে সমান রাখতে হবে। চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে দুই দেশ সমান প্রাধান্য পাবে। আর এমন নীতিমানা থাকলেও বর্তমান সময়ে যৌথ পরিচালিত ছবি তা মানা হচ্ছে না।

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশে শাকিবের নবাব ও ভারতের জিৎ-এর বস-২ ছবি শুটিং করা হয়েছে দুদিন। আর এ ছবিগুলোর বাকি অংশ করা হয়েছে কলকাতায়।

সাম্প্রতিককালে যৌথ প্রযোজনার নামে যেসব ছবি নির্মিত হচ্ছে, এসবের বেশিরভাগেরই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে অনেক যৌথ প্রযোজনার ছবি নির্মাণ করেছে আশীর্বাদ চলচ্চিত্র। এদের প্রথম যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘অবিচার’। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো কালজয়ী সিনেমাও উপহার দিয়েছে এ প্রতিষ্ঠান। তাদের শেষ ছবিটি ‘শঙ্খচিল’।

প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাবিবুর রহমান বলেন, যৌথ প্রযোজনার নামে যা চলছে, এটাকে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই দেখছেন না। যৌথ প্রযোজনা নয় যেন যৌথ লগ্নি। তিনি বলেন, ‘আমি যদি কারও সঙ্গে কোনো চুক্তি করে তা পালন না করি, তাহলে সেটাকে তো প্রতারণাই বলব।’

বর্তমানে মিডিয়া পাড়ায় আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে যৌথ পরিচালিত সিমেনাগুলো অন্যতম, যা বন্ধের জন্য ইতোমধ্যে দফায় দফায় আন্দোলন করা হলে, চলচ্চিত্র পরিবারের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত আসে নতুন নীতিমালা না হওয়া পর্যন্ত যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র নির্মাণ-সম্পর্কিত কার্যক্রম স্থগিত থাকবে এছাড়া যে সিনেমার অনুমতি দেওয়া আছে সেগুলোর শুটিং চলবে। বাকি যেগুলো শুটিং শেষ হয়েছে সেগুলোর মুক্তিও মিলবে বলে জানায় তথ্যমন্ত্রী।

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনজুরুর রহমান বলেন, এখন যে নীতিমালা আছে তা নিয়ে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। তাই চলচ্চিত্র পরিবারের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়। শিগগিরই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।