মত-বিশ্লেষণ

মায়ের দুধেই সুস্থ শিশু

কামরুন নাহার মুকুল: মায়ের দুধ নবজাতকের আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। শিশু ভ‚মিষ্ঠ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের বুকের শালদুধ শিশুকে খাওয়াতে হবে। কলোস্ট্রাম হলুদাভ ঘন তরল দুধ গর্ভাবস্থার শেষদিক থেকেই মায়ের স্তন দিয়ে নিঃসৃত হতে শুরু করে। এটিকে বলে শালদুধ, যা নবজাতকের শ্রেষ্ঠ খাবার। শালদুধই শিশুর জীবনের প্রথম টিকা হিসেবে কাজ করে। শালদুধে রয়েছে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। শিশুর বয়স ছয় মাস পর্যন্ত শুধু মায়ের দুধ খাওয়াতে হবে; শিশুকে পানি, মধুÑকিছুই খাওয়ানো যাবে না। ছয় মাস বয়সের পর থেকে শিশুর ক্ষেত্রে ঘরে তৈরি সুষম খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সুস্থ প্রজš§ গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধের কোনো বিকল্প নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানও মায়ের দুধকে শিশুদের সর্বোৎকৃষ্ট খাবার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। মায়ের দুধ নবজাতক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এবং রোগজীবাণু প্রতিরোধসহ নানা প্রতিক‚লতায় মহৌষধ হিসেবে কাজ করে।

অন্য কোনো খাবার ছাড়াই ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে মা ও শিশু উভয়ই সুস্থ থাকে। আর এজন্য প্রসূতি মাকে খেতে হবে প্রচুর পরিমাণে তরল ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার। গবেষকদের মতে, মায়ের সঙ্গেই শিশুর প্রথম আবেগীয় বন্ধন সৃষ্টি হয়। মায়ের দুধ পানের মধ্য দিয়ে মা ও শিশুর মধ্যে এক মমতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, দুজনের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে। পাশাপাশি শিশুর পরিপূর্ণ বৃদ্ধি-বিকাশের জন্য মাতৃদুগ্ধ হলো সম্পূর্ণ খাদ্য। এ দুধ একাধারে ক্যালোরি, সব ভিটামিন, মিনারেল, প্রোটিন ও পানির প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে। এটি সহজপাচ্য। শিশুর হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশেও মাতৃদুগ্ধ অতুলনীয়। মায়ের দুধে থাকা উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে এবং এটি ভিটামিন ‘ডি’ হরমোন তৈরিতে সহায়ক। এ ছাড়া মায়ের দুধে বিদ্যমান অ্যান্টিবডি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, বিভিন্ন সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করে এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো মারাত্মক রোগ থেকে শিশুকে নিরাপদে রাখে। মায়ের দুধে থাকা ক্যালসিয়াম শিশুর হাড়ের গঠন দৃঢ় ও মজবুত করে। মায়ের দুধপান শিশুমৃত্যুর হার এবং ভবিষ্যৎ জীবনে শিশুর জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত মায়ের দুধ শিশুর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। শিশুর পুষ্টি চাহিদা পূরণে ও শারীরিক গঠন বৃদ্ধিতে যে অ্যামাইনো এসিড, প্রোটিন, শর্করা ও চর্বির সুসমন্বয় দরকার, তা মায়ের দুধেই আছে আর বয়স অনুপাতে এর পরিমাণ মাত্রা পরিবর্তিত হয়। তাই মায়ের দুধই আদর্শ ও সুষম খাবার।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এনএনএস, আইপিএইচের তথ্যানুযায়ী, ‘শিশুর জšে§র পর ছয় মাস পর্যন্ত তাকে শুধু মায়ের দুধ এবং দুই বছর পর্যন্ত মায়ের দুধের পাশাপাশি ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানো হলে গুঁড়োদুধ বা প্যাকেটজাত খাবার খাওয়া শিশুর তুলনায় সে ১০ গুণ বেশি বুদ্ধিমান হয়।

মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল শিশুর প্রথম বছরে ওজন ও বুদ্ধিমত্তা ঠিক থাকে, এটা গবেষণালব্ধ সত্য। তাই বুকের দুধে স্বাস্থ্য হয় না, এই ধারণা ভুল। যখন অন্যান্য খাবার শুরু হয়ে যায়, তখনও বুকের দুধ চালিয়ে যাওয়া উচিত। কারণ নবজাতক ও আরেকটু বড় শিশু, অর্থাৎ এক থেকে দুই বছর বয়সি শিশু এ থেকে উপকার পেয়ে থাকে।

ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশনের তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বে মাতৃদুগ্ধ পান না করানো বা অবহেলার কারণে প্রায় আট লাখ ২৩ হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটে। যে মা নিয়মিত মায়ের দুধ শিশুকে পান করান তার জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়, এমনকি মায়ের উচ্চ রক্তচাপও হ্রাস পায়।

বিশ্বে এখন মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৪০ শতাংশ, কিন্তু বাংলাদেশে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৬৫ শতাংশ। সরকারের প্রচার-প্রচারণা এবং যথাযথ উদ্যোগের ফলে দেশে শিশুর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বৃদ্ধি এবং মা ?ও শিশুপুষ্টি উন্নয়নের কার্যক্রম টেকসই করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। বর্তমানে সরকার গৃহীত চতুর্থ সেক্টর হেলথ, নিউট্রিশন ও পপুলেশন প্রোগ্রাম এবং দ্বিতীয় জাতীয় পুষ্টি কর্মপরিকল্পনার আওতায় মা ও শিশুপুষ্টিসহ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বর্তমানে বাংলাদেশে যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০ সালের ইতালির ফ্লোরেন্সে ইনোসেনটি গবেষণা কেন্দ্রের ঘোষণার সম্মানে প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্ব স্তন্যপান সপ্তাহ পালিত হয়ে থাকে। মায়ের দুধের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি মায়েদের মধ্যে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ’।

বর্তমান  সরকার মাতৃদুগ্ধ পান শতভাগে উন্নীত করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গুঁড়োদুধ ও কৌটাজাত শিশুখাদ্যের ব্যবহারকে সর্বনি¤œ স্তরে নামিয়ে এনে মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি বিপণন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ এবং এর বিধিমালা-২০১৭ প্রণয়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বেতনসহ ছয় মাস করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হচ্ছে। কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে কর্মজীবী মায়েদের ভাতা দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশনকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে জšে§র দুই বছর পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান নিশ্চিত করতে হবে। শিশুকে মায়ের দুধ পান করানোর উপকারিতা এবং গুঁড়োদুধ খাওয়ানোর অপকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন স্তর থেকে প্রচারণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে মা ও পুষ্টি বিষয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন আরও সহজতর হবে।

স্বাস্থ্যকর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রজš§ গড়ে তুলতে মায়ের দুধ পান মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। শিশুর পুষ্টি জোগান দিতে মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই, বিকল্প নেই শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশেও। তাই মায়ের দুধ মানেই সুস্থ শিশু।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..