প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

মারণাস্ত্রের মহড়ার নামে বিশ্ব হিরোশিমা নাগাসাকির প্রতিচ্ছবি দেখতে চায় না

মো. জিল্লুর রহমান: প্রায় আট দশক ধরে দুঃস্বপ্নের স্মৃতি বইছে হিরোশিমা-নাগাসাকি, এখনও দগদগে পরমাণু হামলার ক্ষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক মর্মান্তিক পরিসমাপ্তির নাম- হিরোসিমা এবং নাগাসাকি। জাপানের এই দুই শহরের ওপর যে আঘাত নেমে এসেছিল সেই ক্ষত আজও দগদগে। ৬ এবং ৯ আগস্ট এই দু’দিন প্রতি বছর এলেই সেই স্মৃতিই ঘুরে ফিরে আসে। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকালে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর লিটলবয় নামের নিউক্লীয় বোমা ফেলে এবং এর তিন দিন পর ৯ আগস্ট নাগাসাকি শহরের ওপর ফ্যাটম্যান নামের আরেকটি নিউক্লীয় বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ধারণা করা হয় ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার লোক ও নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২ লাখ ১৪ হাজার জন। শুধু তা-ই নয়, এর পরবর্তী বেশ কয়েক প্রজন্মে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও ভোগ করছে। তবে অবাক করার বিষয় হচ্ছে দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ।

সামরিক খাতে নতুন অস্ত্র যোগ করা এবং নিজেকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এখন বিশ্বের অনেক দেশের প্রবণতা। তবে শক্তিধর দেশগুলো মারাত্মক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। প্রত্যেকেই যে যার মতো নিজের সুরক্ষায় ব্যস্ত। এক্ষেত্রে কোনো দেশ পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। অবশ্য প্রতিটি দেশেরই বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে। সেই অধিকার থেকেই তারা নিজেকে সুরক্ষার চেষ্টা করে। দুর্বল বা সবল কোনো দেশ এক্ষেত্রে ছাড় দিতে রাজি নয়। প্রয়োজনে মিত্র দেশের সঙ্গে জোটভুক্ত হয়েও নিজেকে সুরক্ষার কথা তারা চিন্তা করে। দেশগুলো নিজেদের ব্যয়িত অর্থের একটি বড় অংশ এই অস্ত্র প্রতিযোগিতার পেছনে ব্যয় করে। অনেক দেশ আছে যাদের সামরিক খাতে ব্যয় অনেক বেশি।

যদিও যুদ্ধ ও শান্তি পরস্পর বিপরীতমুখী প্রক্রিয়া। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে বর্তমান বিশ্বে দুটো বিষয়ই পাশাপাশি চলছে। এক দিকে একে অনে?্যর প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিচ্ছে, অন?্যদিকে ওই একই মুখে উচ্চারিত হচ্ছে চিরাচরিত শান্তির বুলি! মানুষ আসলে কী চায় তা মনে হয় নিজেও জানে না। যুদ্ধ নাকি শান্তি? অস্ত্র নাকি মানবতা? এসব তো পাশাপাশি চলতে পারে না। এশিয়ায় শক্তিমত্তা বাড়িয়ে চলেছে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া। দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক স্থাপনা নির্মাণ ও টহলের পরিমাণ বাড়িয়ে এরই মধ্যে চীন তাদের সামরিক অগ্রগতির প্রমাণ জানান দিয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনে বৃহৎ সামরিক প্রদর্শনীর খবর গণমাধ্যমে এসেছে। বিষয়টি চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পেশিশক্তি নয় বরং এক্ষেত্রে দায়বদ্ধ চীনকে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সাম্প্র্রতিক এক তথ্যে জানা যায়, বিশ্বে অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে এক নম্বরে আমেরিকা, দ্বিতীয় রাশিয়া ও তৃতীয় ফ্রান্স। বিশ্বে যত অস্ত্র বিক্রি হয়, তার এক- তৃতীয়াংশ হয় আমেরিকা থেকে। আর আমেরিকা যে অস্ত্র বিক্রি করে, তার অর্ধেক কেনে মধ্যপ্রাচ্য। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) এর এক তথ্যে দেখা যায়, আমেরিকা ২০০১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে যা অস্ত্র বিক্রি করত, এখন তার তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি করে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট যত অস্ত্র বিক্রি হয়েছে, তার ৩৭ শতাংশ করেছে আমেরিকা। তারা মোট ৯৬টি দেশকে অস্ত্র বিক্রি করেছে। আর তাদের অস্ত্রের সব চেয়ে বড় ক্রেতা হলো মধ্যপ্রাচ্য। আমেরিকার অর্ধেক অস্ত্রই যায় সেখানে। আর মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র কেনে সৌদি আরব এবং সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব সেই অস্ত্র ইমেয়েনে আগ্রাসন চালাতে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। বস্তুত তারাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্রের ক্রেতা।

নিজেকে সুরক্ষিত রাখা বা অন্যকে ভয় দেখানো যদি আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হয় তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। পৃথিবীর অস্তিত্ব যদি হুমকির সম্মুখীন হয় তাহলে নিজেকে সুরক্ষিত করার কোনো অর্থ হয় না। আজকের যে আক্রমণাত্মক প্রবণতা তা অতীতেও ছিল। তখন রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতো, উলুখাগড়ার প্রাণ যেত। তারাও তাদের শক্তি জানান দিতে অন্যদেশ আক্রমণ করত। যুদ্ধের নতুন নতুন কৌশল বের করত। নতুন নতুন অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করত। সে সময়ও ছোট ছোট রাজ্যগুলো একজোট হয়ে বড় রাজ্যকে প্রতিহত করত। সেই কৌশলের আজও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে শুধু অস্ত্রের। যুক্ত হয়েছে আরও বেশি মরণঘাতী অস্ত্র। মানুষের এ হঠকারী কাজ পৃথিবীর কতটুকু উপকারে আসছে সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। যে শ্রম, অর্থ কাজে লাগিয়ে মানুষ বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন করেছে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তা অবিশ্বাস্য। এজন্য মানবতা পায়ে দলতেও তারা কুণ্ঠিত হয়নি। আজ বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রূপ দেখা দিয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যদি আর কোনো বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় তাহলে এই পৃথিবী নামক গ্রহ টিকবে কি না সন্দেহ। অস্ত্র প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্যই হলো স্থল, আকাশ ও নৌপথে নিজের দেশকে সবার চেয়ে এগিয়ে রাখা। নিজের প্রভাব বৃদ্ধি করা। অন্য দেশের ওপর খবরদারি করা। এসব মানব জাতির জন্য হুমকি হলেও সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। কেউ ভাবছেন না অস্ত্র প্রতিযোগিতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। নিজেকে রক্ষার এই কৌশল একদিন বুমেরাং হবে।

পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার ও সুবিধা থেকে এসব মানুষ বঞ্চিত। অথচ মানব জাতিকে ধ্বংসের জন্য উন্নত দেশগুলো মরণাস্ত্র তৈরির পেছনে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। এসব না করে উন্নত দেশের নেতারা আজ যদি তাদের সময়, শ্রম এবং অর্থকে বিশ্বব্যাপী বিরাজমান দারিদ্র্য, অশিক্ষা, মরণব্যাধি এইডস, জলবায়ুর উষ্ণতা রোধ এবং করোনা মহামারি নির্মূলের জন্য ব্যয় করত তাহলেই বরং বিশ্ববাসী উপকৃত হতো এবং শান্তি পেত। মরণাস্ত্র তৈরির জন্য যেই বাজেট ব্যয় হচ্ছে, সেই বাজেটের সিকি ভাগও যদি আজ মানব জাতির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য ব্যয় হতো তাহলে পৃথিবী আজ অনাহার এবং দরিদ্রতামুক্ত হতো। আর এটাই হতো সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র চর্চা।

ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মধ্যে পারমাণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমার কথা বলা হয়। প্রতিটি অস্ত্রই মানব সভ্যতাকে ধ্বংস করতে যথেষ্ট। যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিজেদের ভেতর জিইয়ে রেখে আমরা যে মারাত্মক বোকামি করছি তা এই মুহূর্তে বুঝতে পারছি না। এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে মাহাথির মোহাম্মদ বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে বলেন, অস্ত্রের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া। একটা স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ করতে হবে। যে পৃথিবীতে কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা বসবাস করছি। অস্ত্র উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যদি মানুষ হত্যার (অস্ত্র কেনা) বাজেট হ্রাস করি তবেই গবেষণা ও প্রস্তুতির জন্য তহবিল থাকবে। এত চমৎকার একটা সত্য বিশ্ব নেতাদের সামনে তুলে ধরার পরেও তাদের  মনোভাব পরিবর্তন হয়েছে কি? হয়ত না। কারণ যুগ যুগ ধরে চলে আসা ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব এত তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হবে না। ফলে খুব তাড়াতাড়ি বিশ্ব হুমকিমুক্ত হবে এটাও আশা করা ঠিক হবে না। তাহলে বিশ্বের পরিণতি কী? আমরা কি নিজেদের রক্ষা করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলব? এটা আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে শক্তিধর দেশগুলোর অস্ত্র প্রতিযোগিতা কোনো ক্রমেই নিরাপদ বিশ্বের জন্য সহায়ক নয়।

এ বছর শুরুর দিকে রাশিয়া ইউক্রেনে আগ্রাসন চালিয়ে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে করে দিয়েছে। ইউক্রেনকে রক্ষার নামে আমেরিকা ও এর মিত্ররা যৌথভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। আমেরিকা ও রাশিয়ার পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের খাদ্য ও জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বেড়েছে মুদ্রাস্ফীতি এবং মানুষের জীবন জীবিকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে অতি সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে চীন ও আমেরিকার মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। চীন ইতোমধ্যে তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক মহড়া শুরু করেছে এবং আমেরিকাও তাইওয়ানকে রক্ষার নামে হুমকি-ধামকি দিয়ে এ অঞ্চলে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করছে। এটা নিরাপদ বিশ্বের কোনো ক্রমেই কাম্য ও গ্রহণযোগ্য নয়।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে বর্তমান বিশ্বে শক্তিধর দেশগুলো মারাত্মক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। হিরোশিমা-নাগাসাকি পৃথিবীর মানুষের কাছে নৃশংসতম বর্বরতার একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে বছরের পর বছর ধরে চিত্রিত হয়ে আসছে। হিরোশিমা-নাগাসাকির নাম শুনলেই ভয়ে আতঙ্কে ওঠে শান্তিপ্রিয় মানুষের মন। অথচ এর চির অবসান হওয়া দরকার। এজন্য প্রয়োজন সব দেশের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল মজুত গড়ে তুলবে, পৃথিবীকে তটস্ত রাখবে আর কেউ এর অধিকারীও হতে পারবে না, তা তো কোনো আইন হতে পারে না। এজন্য বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিধর দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব পরিহার করতে হবে। সুতরাং সংঘাত নয়, যুদ্ধ নয়, অশান্তি নয়, দেশে দেশে শান্তি বিরাজ করুক, একইসঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতার নামে বিশ্ব হিরোশিমা নাগাসাকির প্রতিচ্ছবি আর দেখতে চায় না।

ব্যাংক কর্মকর্তা ও মুক্ত লেখক

[email protected]