মত-বিশ্লেষণ

মালিকদের নৈতিকতা ও যাত্রীর সচেতনতায় নিশ্চিত হবে দুর্ঘটনামুক্ত নৌ-চলাচল

মো. জাহাঙ্গীর আলম খান: অসংখ্য নদ-নদীতে পরিবেষ্টিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। নদীমাতৃক এদেশে নদ-নদী ছাড়াও রয়েছে অনেক খালবিল, হাওর-বাঁওড়। এ দেশের জলসম্পদ এ দেশকে একটা বিশেষত্ব দিয়েছে। পৃথিবীতে এত নদ-নদীবেষ্টিত দেশের সংখ্যা খুবই কম।
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র বাহন ছিল কাঠের তৈরি পালতোলা নৌকা অথবা দাঁড়টানা নৌকা। কালের পরিক্রমায় এসব কাঠের নৌকার স্থলে ইস্পাত/লোহার তৈরি নৌযান স্থান করে নিয়েছে। নৌযানে ইঞ্জিন সংযোজনের পর নৌযানের গতি বৃদ্ধি পাওয়ায় লোকজনের চলাচলে সময় কম লাগার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে গতি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বাংলাদেশে এক সময় হাতে তৈরি নকশা ব্যবহার করে কাঠ দ্বারা ছোট নৌযান নির্মাণ করা হতো। ধীরে ধীরে কাঠের তৈরি নৌকার স্থলে লোহার তৈরি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলাচল শুরু করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নৌপথে যাত্রী ও পণ্যদ্রব্য পরিবহনও বৃদ্ধি পায়। যুগের চাহিদার নিরিখে নৌযানের আকার-আকৃতি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বল্পমূল্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নৌযানের কোনো বিকল্প নেই। মানুষের যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে নৌযানের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের অসংখ্য নদীতে চলাচলকারী হাজার হাজার নৌযানে বহনকৃত যাত্রী ও পণ্যের নিরাপদ চলাচলে নৌযান মালিক, শ্রমিক এবং যাত্রীসাধারণের ভূমিকা ও দায়িত্ব অপরিসীম। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই কালবৈশাখি মৌসুমে প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যায়। এ সময়ে নৌপথে চলাচলরত সব নৌযানকে যথাযথ সতর্কতা, নৌ-আইন মেনে নৌযান পরিচালনাসহ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।
ঝড়ের মৌসুমে হঠাৎ করে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই প্রলয়ংকরী ঝড় দেশের যে কোনো স্থানে বয়ে যেতে পারে। এসব ঝড় নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলে চলাচলকারী সব ধরনের নৌযান, বিশেষভাবে যাত্রীবাহী নৌযানের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। এ সময় যাত্রীবাহী নৌযানে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি থাকে। দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নৌপরিবহন অধিদফতর কর্তৃক প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের জন্য সংশ্লিষ্ট যাত্রীবাহী নৌযানের মালিক ও মাস্টারকে অনুরোধ করা হয়, যাতে নির্ধারিতসংখ্যক এবং নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার ও ড্রাইভার দ্বারা নৌযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি নৌযানে মোবাইল ফোন ও রেডিও সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করলে নৌযানের যাত্রা স্থগিত রাখার জন্য মাস্টারকে নির্দেশ দেওয়া হয়। যাত্রীবাহী নৌযানের দু’পাশের ভারী পর্দা ও রশি অপসারণ করা, মাস্টার ব্রিজে যাত্রীসাধারণের অবাধ চলাচল বন্ধ করার জন্য নৌযানের দু’পাশ অস্থায়ীভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়।
তাছাড়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নৌযান নিয়ে বন্দর ত্যাগ করা উচিত। সার্ভে সনদে উল্লিখিত যাত্রীসংখ্যার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা ও ডেকের ওপর যাত্রীদের বসার স্থানে ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন করা ঠিক নয়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য বহন করা যাবে না। হ্যাচের মধ্যে পণ্য রেখে হ্যাচ কভার নাট-বোল্ট দিয়ে পানিরোধকভাবে বন্ধ করার ব্যবস্থা ও নির্দিষ্টসংখ্যক বয়া নৌযানের আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনের সময় যাত্রীরা যাতে সহজে বয়া ব্যবহার করতে পারেন, সেভাবে বয়াগুলো রাখতে হবে। যাত্রার আগে ইঞ্জিন ভালোভাবে কাজ করছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে, নেভিগেশনাল বাতিগুলো সচল আছে কি না, যাত্রার আগে ভালোভাবে দেখে নিতে হবে; পথে ঝড়ের আশঙ্কা দেখা দিলে নৌযানকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বা কিনারায় ভিড়িয়ে রাখতে হবে, নৌযানে মোবাইল ফোন ও রেডিও রাখা এবং নিয়মিত আবহাওয়ার বুলেটিন শোনা জরুরি। আবহাওয়ার অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নৌযান ছাড়ার পূর্বে পরবর্তী বন্দরের পোর্ট অফিসারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে নৌযান ছাড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে; বৈধ কাগজপত্র ও নির্দিষ্টসংখ্যক এবং নির্ধারিত গ্রেডের মাস্টার-ড্রাইভার নৌযানে না থাকলে নৌযান পরিচালনা করা যাবে না; ঝড়ের সময় যাত্রীবাহী নৌযানের দু’পাশের ভারী পর্দা উঠিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখতে হবে, যাতে অবাধে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। যাত্রীরা যাতে নৌযানের ছাদে উঠতে না পারেন, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
নৌযানে ভ্রমণের পূর্বে যাত্রীদেরও কিছু সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। যেমন: নৌযানের ছাদে যাত্রীর ভ্রমণ করা ঠিক নয়, এতে নৌযানের ভারসাম্য নষ্ট হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ভ্রমণ না করাই শ্রেয়। সুশৃঙ্খলভাবে নৌযানে আরোহণ ও অবতরণ করা এবং পথে ঝড়-তুফান দেখা দিলে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে নিজের জায়গায় অবস্থান করা দরকার; জীবনরক্ষাকারী বয়া হাতের নাগালে রাখতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযানের নিচ থেকে ওপরের দিকে এবং ছাদে না যাওয়াই ভালো; সে সঙ্গে নৌযানের চালককে উত্ত্যক্ত বা চাপ প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
ঝড়ের আগমন বোঝার উপায় হলো উত্তর, পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিকে কালো মেঘ দেখা যাবে, হঠাৎ করে ঠাণ্ডা বাতাস বইতে শুরু করবে, বায়ুর চাপ হঠাৎ করে কমে যাবে (ব্যারোমিটারের সাহায্যে নির্ণয় করা যায়)। সংকেতগুলো দেখা গেলে বা অনুভূত হলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নৌযানের ওপর দিয়ে একটি ঝড় বয়ে যাবে, তখন দ্রুত আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিতে হবে।
উল্লিখিত নির্দেশনা মেনে কেবল বৈধ সার্ভে সনদধারী নৌযান উপযুক্ত মাস্টার/ড্রাইভার ও উপযুক্ত নেভিগেশনাল বাতি দ্বারা সজ্জিত হয়ে রাতে চলাচল করবে। সব বালুবাহী, মাটিবাহী, ইটবাহী ট্রলার, ড্রেজার, ইঞ্জিনচালিত নৌযানের রাতে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব নৌযান শুধু দিনে অর্থাৎ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলাচল করবে।
নৌপরিবহন অধিদফতর দুর্ঘটনামুক্ত নৌ-চলাচল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে: নৌযান নির্মাণের লক্ষ্যে হাতে তৈরি নকশার স্থলে আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সফটওয়্যার আমদানি করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নির্ভুলভাবে নৌযানের নকশা তৈরি করা; পুরোনো ডিজাইনের সানকেন ডেকবিশিষ্ট যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ করার লক্ষ্যে ১৪০ ও ২৫০ আসনবিশিষ্ট ক্যাটামেরান ডিজাইনের (দুটি নৌযানের হালের ওপর তৈরিকৃত স্থাপনা) যাত্রীবাহী ও সি-ট্রাক ডিজাইনের নতুন ধরনের দ্রুত গতিসম্পন্ন স্ট্যাবল নৌযান প্রবর্তন। এরই মধ্যে ক্যাটামেরান টাইপের নৌযান সফলভাবে চলাচল করছে; রিভারসিবল গিয়ার সংযোজন করায় দুর্ঘটনা হ্রাস পেয়েছে; ডকইয়ার্ডগুলোয় প্রশিক্ষিত জনবল দিয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে নৌযান নির্মাণ করা হচ্ছে; নৌযান চলাচল দ্রুত ও নিরাপদ করার জন্য নৌযানে সাধারণ স্টিয়ারিংয়ের স্থলে হাইড্রলিক স্টিয়ারিং সংযোজন করা হচ্ছে। হাইড্রলিক স্টিয়ারিংয়ের সাহায্যে বড় নৌযানগুলো সহজে ম্যানুভার করার পাশাপাশি নাবিকের কষ্ট অনেকাংশে লাঘব করেছে; এক জাহাজের সঙ্গে অন্য জাহাজের যোগাযোগ রক্ষায় নৌযানের ভিএইচএফ যন্ত্র স্থাপন নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে; জাহাজে জিপিএস স্থাপন এবং তার সঙ্গে কোর্স সেট করার ফলে ওই রুটে নৌযান পরিচালনা করা সহজ হয়েছে; রাডার সংযোজন করার ফলে অন্ধকার রাতে অথবা কুয়াশার মধ্যে নৌযান চালনার সময় অন্যান্য নৌযানকে সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে; ইকো সাউন্ডারের মাধ্যমে নদীর গভীরতা এবং জাইরো কম্পাসের মাধ্যমে জাহাজের সঠিক নির্দেশনা ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে; ইউনিফ্লো সিস্টেম সুপারচার্জ ইঞ্জিন ব্যবহার করে স্বল্প ফুয়েল দিয়ে ইঞ্জিনের অধিক গতি পাওয়া যাচ্ছে, ফলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে; অটোমেশন ইঞ্জিন ও অটো কন্ট্রোল সিস্টেম মেশিনারি ব্যবহার করে সহজে সেইফটি নিশ্চিত করা যাচ্ছে।
এসব কাজে জাহাজ মালিকদের উৎসাহব্যঞ্জক সহযোগিতা আর যাত্রীর নিরাপত্তা সচেতনতা থাকলে দুর্ঘটনামুক্ত নৌ-চলাচল ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..